১৫ আগস্টের পথ ধরেই ৩ নভেম্বর

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০১৬, ০১:১০
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি ধ্বংস করতেই চার নেতাকে হত্যা করা হয় : তোফায়েল
 
জিয়া ও মোশতাকের সম্মিলিত সিদ্ধান্তেই জেল হত্যা :মতিয়া
 
বঙ্গবন্ধুর আজীবনের চার সহচর মরণেও তাঁর সহচর হয়েছেন :নাসিম
 
বিশ্বাস, আদর্শ ও প্রত্যয় থাকলেই কেবল এমন আত্মত্যাগ সম্ভব :আনোয়ার হোসেন মঞ্জু
 
চার নেতা ছিলেন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক : মেনন
 
১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের খুনিদের রক্ষার নীতি নেন জিয়া :ইনু
 
জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় আওয়ামীলীগসহ ১৪ দলের কয়েক শীর্ষ নেতা-মন্ত্রীরা বলেছেন, ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পথ ধরেই ৩ নভেম্বর কারাগারে বন্দি থাকাবস্থায় জাতীয় চার নেতাকে নৃশংস-নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আওয়ামীলীগের রাজনীতি ধ্বংস করার নীলনকশা থেকেই ইতিহাসের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড। তবে ক্ষমতা ও মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে কীভাবে মৃত্যুকে মেনে নিতে হয়-চার নেতা ঐতিহাসিক ও রাজনীতিতে শিক্ষণীয় সেই দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
 
‘শহীদ এম মনসুর আলী স্মৃতি সংসদ’-এর উদ্যোগে গতকাল বুধবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ-আইডিইবি মিলনায়তনে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও শহীদ মনসুর আলীর সন্তান মোহাম্মদ নাসিম।
 
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আওয়ামীলীগের রাজনীতি ধ্বংস করতেই চার নেতাকে হত্যা: তোফায়েল আহমেদ
 
আলোচনা সভায় আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু চার নেতাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধসহ সকল আন্দোলনের পরিকল্পনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে চার নেতার নেতৃত্বেই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করি। খুনিরা মনে করেছিল, চার নেতাকে শেষ করতে পারলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আওয়ামীলীগের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের সেই খায়েস পূরণ হয়নি। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু     কন্যা শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে এই দেশে আজ বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার আদর্শ বাস্তবায়ন হচ্ছে।
 
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনেক সূচকে আমরা আজ পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা ভারতের চেয়েও এগিয়ে আছি। এই অগ্রযাত্রাকে বানচাল করতে এখনও ষড়যন্ত্র চলছে। দেশ সঠিক পথে এগিয়ে চলছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই চার নেতার আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
 
জিয়া-মোশতাকের সম্মিলিত সিদ্ধান্তেই জেল হত্যা : মতিয়া চৌধুরী
 
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, ৩ নভেম্বর ছিল ১৫ আগস্টের এক্সটেনশন। কারণ খুনিরা জানত, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে এই চার নেতাই তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও জনগণকে আবার সংগঠিত করতে পারতেন। সেজন্য এই হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। তিনি বলেন, এখানে জিয়াউর রহমানের নাম যেমন আসছে, তেমনি খুনি মোশতাকের নামও আসে। এই দুজনের সম্মিলিত সিদ্ধান্তেই চার নেতাকে হত্যা করা হয়। খুনিরা কী পরিমাণ নির্মম, নিষ্ঠুর ও মনুষ্যত্বহীন ছিল তা তাদের কাজ দেখেই বোঝা যায়।
 
বঙ্গবন্ধুর আজীবনের চার সহচর মরণেও তার সহচর হয়েছেন : মোহাম্মদ নাসিম
 
সভাপতির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও শহীদ মনসুর আলীর সন্তান মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সহচর ছিলেন যে চার নেতা তারা মরণেও তার সহচর হয়েছিলেন। তারা জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন সবাই মোশতাক বা জিয়া নয়, সব বাঙালি বেইমান নয়।
 
নাসিম বলেন, আজকে অনেকে রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করে, ভয়ের কাছে সারেন্ডার করে। কিন্তু সেদিন মৃত্যু অবধারিত জেনেও একবিন্দুও টলেননি চার নেতা। বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে তারা বেইমানি করেননি। তাদের অনুসরণ করে আজ আমাদের নিজেদের তৈরি করতে হবে। চার নেতার পরিবার ও এই বাঙালি জাতি শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ, কারণ তিনি না থাকলে বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যার বিচার হতো না।
 
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের এই সদস্য আরও বলেন, শেখ হাসিনা আমাদের লড়াই-প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছেন। তিনি কারো সঙ্গে আপস করেননি। খালেদা জিয়া অন্ধ, তিনি এদেশের উন্নয়ন ও জঙ্গী দমন চোখে দেখেন না, কারণ তিনি খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা (১৪ দল) ঐক্যবদ্ধ আছি। সামনে লক্ষ্য একটাই— খুনি চক্রকে এদেশের রাজনীতিতে একেবারে নিঃশেষ করে দিতে হবে।
 
বিশ্বাস, আদর্শ ও প্রত্যয় থাকলেই কেবল এমন আত্মত্যাগ সম্ভব: আনোয়ার হোসেন মঞ্জু
 
আলোচনা সভায় জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, চার নেতার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা করতে নয়, এখানে এসেছি প্রাণের টানে। তাদের যেই রাজনীতি, কালের বিবর্তনে আজ সেই রাজনীতিতে অনেক বিবর্তন ঘটেছে। আদর্শ, বিশ্বাস ও নীতি-নৈতিকতার রাজনীতি করতেন বলেই তাদের দশকের পর দশক ধরে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত হতে হয়েছিল। তিনি বলেন, ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর মতো একজন ব্যক্তি রাজনীতিতে থাকতে পারেন এটা অচিন্তনীয়। কারণ তার-ই রাজনৈতিক সহকর্মী তাকে ক্ষমতার লোভ দেখান। শুনেছি সেই লোভ প্রত্যাখ্যান করে মনসুর আলী সেদিন বলেছিলেন-যারা হাতির পিঠে চড়ে তারা কখনো গাধার পিঠে চড়তে জানে না। এ জন্যই সেদিন তাকে জীবন দিতে হয়েছিল। রাজনীতি করতে হলে একটা বিশ্বাস, আদর্শ ও প্রত্যয় থাকতে হয়। এটা থাকলেই কেবল এভাবে জীবন বিসর্জন দেওয়া সম্ভব হয়।
 
জেপি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবসময় ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক বিবর্তন ঘটেনি। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্যও বিবর্তন হয়েছে। কিন্তু চার নেতা কখনো আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। এই কারণেই বঙ্গবন্ধু ও চার নেতা ইতিহাসে বারেবারে আসেন। যতদিন এই বাংলাদেশ ও বাঙালি থাকবে, ততদিন তারাও অমর হয়ে থাকবেন।
 
চার নেতা ছিলেন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক: মেনন
 
ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, চার নেতার মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। এটা একটি বিশ্বাস, আদর্শ ও নেতার প্রতি আনুগত্যের মৃত্যু। তারা ছিলেন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক।
 
১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের খুনিদের রক্ষার নীতি নেন জিয়া: ইনু
 
জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, জিয়াউর রহমান ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের খুনিদের রক্ষার নীতি গ্রহণ করেন। সেজন্য একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। সঙ্গে প্রতিপক্ষকে জানে মারার রাজনীতিও শুরু করেন। সেজন্য হাজার হাজার সৈন্য ও মানুষকে জিয়া হত্যা করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সামরিক শাসনের জঞ্জাল ও আরো অনেক আবর্জনা পরিষ্কার করতে বাংলাদেশকে আরেক ধাপ সামনে এগোতে হবে। যেই ধাপে সরকার অদল-বদল হলেও জঙ্গিবাদী ও রাজাকাররা সরকারে আসবে না।
 
অন্যরা যা বললেন
 
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে এদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু হয়। যার মহীরূহ আজকের জঙ্গিবাদ। আলোচনা সভায় জাসদ একাংশের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, ৩ নভেম্বরের ঘটনা সমগ্র বিশ্ব ও রাজনীতির কাছে একটা শিক্ষা। ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, বন্দুকধারীরা জঙ্গিবাদী কায়দায় আবার তত্পর। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডু ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান।
 
ইত্তেফাক/এএন