যুক্তরাষ্ট্রে আজকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন না ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতবেন তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী হিলারিকেই এগিয়ে রেখেছে সবগুলো জনমত জরিপ। তবে বিতর্ক তৈরিতে পারঙ্গম রিপাবলিকান প্রার্থীর জয়ের আশা যে একেবারেই নেই তা নয়। কারণ আমেরিকার নির্বাচন পদ্ধতি কিছুটা অন্যরকম। এখানে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় না, হয় ইলেক্টোরাল ভোটে। ফেবারিট হিসাবে হিলারির এখনও উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। সর্বশেষ ই-মেইল বিতর্ক থেকেও এফবিআই তাকে রেহাই দিয়েছে।
সাধারণত যিনি পপুলার ভোট বেশি পান, ইলেক্টোরাল ভোটও তিনি পান। তবে পপুলার ভোট বেশি পেয়ে ইলেক্টোরাল ভোটে হেরে যাওয়ার নজির কিন্তু রয়েছে, যেমনটা হয়েছিল ২০০০ সালে। ওই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী আল গোরকে ইলেক্টোরাল ভোটে হারিয়ে দেন রিপাবলিকান প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশ। আদালতের রায়ে ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হয়েছিল। এবারও যদি সেরকম কিছু হয় তবে আন্ডারডগ হিসেবে ট্রাম্পের জন্য শিকে ছিঁড়তেই পারে। এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১৪ কোটি ৬৩ লাখ। এর মধ্যে ৩ কোটি ৭০ লাখ লোক আগাম ভোট দিয়ে ফেলেছেন। এতে হিলারি স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে অভিবাসী বিরোধী বক্ত্যবের জন্য সঙ্গত কারণেই হিসপানিক ও ল্যাটিনো ভোটগুলো হাতছাড়া হয়েছে ট্রাম্পের । নারী, অভিবাসী ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে পুরো ক্যাম্পেইনের সময়টিতে তিনি মিডিয়ার মনোযোগের কেন্দ্রে থাকেন। হিলারির যেমন রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে ট্রাম্পের সেটি নেই। নিউইয়র্কের এই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী অতীতে ক্ষণে ক্ষণে দল পাল্টিয়েছেন, গড়েছিলেন নতুন দল রিফর্ম পার্টি। ২০০০ সালে তিনি ওই দল থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দঁড়িয়েছিলন। ২০১২ সালে তিনি শেষবারের মতো রিপাবলিকান দলে যোগ দেন।
এবারের নির্বাচনে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের অনুপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। প্রার্থীরা একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির অভিযোগ নিয়ে যেভাবে কাদা ছোড়াছুড়ি করেছেন তা আমেরিকার আধুনিক কালের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। এক্ষেত্রে হিলারির চেয়ে এগিয়ে ছিলেন ট্রাম্প। নিউইয়র্কের ধনকুবের ও সাবেক রিয়ালিটি তারকা ট্রাম্প নির্বাচনী সাধারণ নিয়ম কানুনকে যেন পাত্তাই দিতে চাননি। নারী ইস্যুতে তিনি বেশ অশ্লীল মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের বিতর্কিত বক্তব্য ভোটের মাঠে হিলারির অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে। বলা যায় ট্রাম্পের দুর্বলতাকে পুঁজি করে অনেকটা এগিয়ে গেছেন দেশটির ২৪০ বছরের ইতিহাসে বড় একটি থেকে মনোনয়ন পাওয়া প্রথম নারী প্রাথী হিলারি। প্রচারণার পুরো সময়কাল জুড়ে ট্রাম্প এতই বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন যে রিপাবলিকান দলের অনেক সিনিয়র নেতাও তাকে ভোট দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে রেখেছেন।
অন্যদিকে আমরা যদি হিলারির অবস্থান পর্যালোচনা করি তবে দেখতে পাব যে আমেরিকার মানুষ খুব একটা ভাল নেই। যে পরিবর্তনের শ্লোগান দিয়ে বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসেন তা তিনি করে যেতে পারেননি। তার শাসনামলে দেশটির মধ্যবিত্তের অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি। গড়পড়তা একটি পরিবারের আয় বছরে ১ হাজার ৬৫০ ডলার কমে গেছে। শ্রমিক শ্রেণীর মজুরি কমেছে অন্যদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছুর দাম বেড়ে গেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে হাউজিং, স্বাস্থ্যসেবা বীমা এবং শিক্ষা খরচ। জ্বালানি তেলের দাম অবশ্য সহনীয় মাত্রায় আছে। যাহোক পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ওবামার প্রশাসনের রেকর্ড ভালই বলতে হবে। তিনি ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ থেকে সরে এসেছেন। তার আমলে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরির সংখ্যাও কমেছে। তাই তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি হোয়াইট হাউসের স্বপ্ন দেখতেই পারেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে আরেকটি বিষয় বেশ কৌতুকপ্রদ। আমেরিকানরা নেতার পদটিতে দীর্ঘকায়দের দেখতে আগ্রহী । গত ৩৬ বছরে ৬ ফুটের নিচে কেউ দেশটির প্রেসিডেন্ট হননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের গড় উচ্চতা ৫ফুট ১০ ইঞ্চি। ট্রাম্পের উচ্চতা ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি। ৫ফুট সাড়ে ৪ ইঞ্চি উচ্চতা নিয়ে হিলারি এ ব্যাপারে কতটুকু সুবিধা করতে পারবেন তা এখনই বলা কঠিন। তবে বিতর্ক সৃষ্টিকারী ট্রাম্প যে এক্ষেত্রে সুবিধাজনক স্থানে আছেন তা বলাই বাহুল্য।
নির্বাচনী প্রচারের সময় হিলারি-ট্রাম্প উভয়ই-উভয়কে বেকায়দায় ফেলার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। যে যখনই অন্যজনের ফাঁকফোকর পেয়েছেন সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেছেন। সম্প্রতি প্রচারে গিয়ে এফবিআই অধিকর্তাকে উদ্দেশ্য করে হিলারি বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগ সম্পর্কে আপনি যা যা জানেন, আপনার উচিত সেগুলো সবার সামনে আনা। যেভাবে আমার ই-মেইল নিয়ে তদন্তের কথা ফলাও করে সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে, একই ভাবে ট্রাম্পের কথাও বলা হোক।’ মার্কিন এই তদন্তকারী সংস্থার বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও ধারালো করে হিলারির ক্যাম্পেন ম্যানেজার রবি ম্যুক বলেন, ‘দু’জন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর ক্ষেত্রে দু’ধরনের নিয়ম কী করে হতে পারে!’
অন্যদিকে, এসব কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে উইসকনসিনে প্রচারে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘গত কয়েক দিনে অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে। হিলারিকে আগাম ভোট দিয়ে ফেলে এখন হয়তো আপনি আফসোস করছেন। চাইলে আপনি আপনার পছন্দ বদলাতেও পারেন।’ উইসকনসিন সেই সমস্ত স্টেটগুলির একটি, যেখানে আগে ভোট দিয়ে পরে সেই ভোট বদলের সুযোগ রয়েছে। আপনারা মত বদলে ফেলুন। প্রচার যুদ্ধের শেষ পর্বে একে অপরের বিরুদ্ধে কার্যত ‘কার্পেট বম্বিং’ শুরু করে দুই শিবির। চলে একে অপরকে তুলোধুনা।
প্রচার -যুদ্ধে একটি বিষয়ে অন্তত ট্রাম্পের থেকে এগিয়ে ছিলেন হিলারি। একদিকে যখন ট্রাম্পকে এখনও ‘নিজেদের লোক’ বলে ভেবে উঠতে পারেননি বহু রিপাবলিকানই, তখন শুরু থেকেই হিলারির পাশে ডেমোক্র্যাটদের সব থেকে বড় ‘আইডল ’ বারাক ওবামা। তিনি হিলারির ভূয়সী প্রশংসা তার সাথেই ছিলেন সবসময়। ‘উত্তরসূরি’র পথ প্রশস্ত করার সব চেষ্টাই করেছেন তিনি। তবে সময়ই বলে দেবে শেষ পর্যন্ত কি হয়, এই লড়াইয়ে ফেবারিট হিলারি শেষ হাসি হাসবেন নাকি ‘আন্ডারডগ’ হয়ে নির্বাচনে লড়তে যাওয়া ট্রাম্পই শেষ পর্যন্ত তাকে পরাজিত করবেন।
‘ভাঙা দেশ’ জুড়তে আমিই শেষ সুযোগ: ট্রাম্প
মঙ্গলবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই প্রার্থী শেষ প্রচারণাগুলোতেও দেশ নিয়ে তাদের ভিন্ন ভিন্ন মত তুলে ধরেন, কিন্তু তাদের কথা শুনতে জড়ো হওয়া মানুষদের কাছ থেকে একই রকমভাবে একই ধরনের প্রতিক্রিয়ার আহবান জানান। আইওয়াতে ট্রাম্প বলেন, অভিবাসন এবং বাণিজ্য ঠিক করতে তিনি ‘শেষ সুযোগ’। তিনি বলেন, সোমালি শরণার্থী জনগোষ্ঠী একটি ‘বিপর্যয়’। ট্রাম্পের ওই নির্বাচনী সভায় উপস্থিত সমর্থককরা সংগীতকার ব্রুস স্প্রিংসটিনের গানের সঙ্গে গলা মেলান। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আরো কয়েকটি স্থানে ট্রাম্পের সমর্থনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গায়ক ও শিল্পীরা গান গেয়ে সমর্থকদের চাঙ্গা করেন।
পাওনা মেটানোর সময় এসেছে: হিলারি
অপরদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের রবিবারের প্রচারণা ফিলাডেলফিয়ার একটি কৃষ্ণাঙ্গ চার্চ থেকে শুরু হয়ে নিউ হ্যাম্পশায়ারে একটি নির্বাচনী র্যালির মাধ্যমে শেষ হয়। উভয় স্থানেই লোকশিল্পী জেমস টেইলরের ‘আমেরিকা দ্য বিউটিফুল’ গানটির সঙ্গে গলা মেলান হিলারি। ফিলাডেলফিয়ার নির্বাচনী সভায় হিলারি নিহত মার্কিন মুসলমান সৈনিকের বাবা খিজির গানকে সাথে নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। ওই সভায় হিলারি মঙ্গলবারের নির্বাচনকে ‘পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার’ একটি উপলক্ষ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকান হিসেবে আমাদের মৌলিক মূল্যবোধগুলো পরীক্ষিত হচ্ছে।’
ইত্তেফাক/এএন
