অনিয়ম ধরা পড়ার পর ভ্যাট দাবি করলেই মামলা করে আটকে রাখছে বছরের পর বছর। ১১ মামলায় গ্রামীণ ফোনের কাছে আটকা ১ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার ভ্যাট।
যে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট বিভাগ রাজস্ব দাবি করলে আপিল করার সুযোগ রয়েছে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের। এ সুযোগ নিয়ে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর বড় অঙ্কের রাজস্ব ঝুলিয়ে রাখছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এক দশক আগের কার্যকালের অনিয়মের ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) দাবির মামলাও রয়েছে এসব তালিকায়। ফলে সরকার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এনবিআরের হিসেবে গ্রামীণ ফোনের কাছেই ১১ মামলায় আটকে আছে ১ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার ভ্যাট। বাংলালিংকের কাছে ১১ মামলায় ৯৮৬ কোটি টাকা, রবি অজিয়াটার কাছে ৬ মামলায় ৯৫৮ কোটি টাকা, এয়ারটেলের কাছে ১০ মামলায় ৩৪০ কোটি টাকা, সরকারি টেলিটকের কাছেও ৪ মামলায় আটকে আছে ৯১ কোটি টাকার ভ্যাট। এর বাইরে আরো কয়েক শ’ কোটি টাকার ভ্যাট দাবি তৈরি করছে এনবিআরের বৃহত্ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-ভ্যাট)।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। এটি এনবিআরের নজরে আসলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে ভ্যাট দাবি করা হয়। ভ্যাট দাবি করা হলেই আপিলের সুযোগ নিয়ে তারা উচ্চ আদালত কিংবা এনবিআরে আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল করে। এসব আপিলের শুনানি শেষে রায় কোম্পানির বিপক্ষে গেলে তারা ফের অপিল করে। এ প্রক্রিয়ায় চলে যায় বছরের পর বছর।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো মোটা অঙ্কের ব্যবসা করলেও সরকারের প্রযোজ্য রাজস্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম করছে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও লোকবলের অভাবে সব অনিয়ম ধরাও যাচ্ছে না। বছরের পর বছর ধরে তারা সুকৌশলে কাজটি করে যাচ্ছে। কিন্তু যতটুকু ধরা হচ্ছে, তাও মামলায় আটকে রাখার কৌশল নিচ্ছে তারা।
গ্রামীণ ফোনের ১১ মামলা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গ্রামীণ ফোনের ১১টি মামলার মধ্যে বর্তমানে ৪টি এনবিআরের আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ও ৭টি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন। এর মধ্যে মোবাইল ফোনের সিম পরিবর্তনের নামে নতুন সিম বিক্রির অভিযোগে এনবিআরের দাবি করা ১ হাজার ২৯৯ কোটি টাকার বহুল আলোচিত মামলাটিও রয়েছে। এছাড়া সরবরাহকৃত সিম কার্ডের উপর ৩৪৮ কোটি টাকার ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক নির্ধারিত সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া সংক্রান্ত একটি মামলাও রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে ওই অর্থ পরিশোধ না করায় এনবিআর তাদের কাছে ২ শতাংশ সুদসহ ৪৫৩ কোটি টাকা দাবি করলে তারা আপিল করে। বর্তমানে এটি আপিলাত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।
২০০৬ সালের আগস্ট থেকে ২০০৭ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের বিক্রীত সিমের উপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ না করায় এনবিআর ওই অর্থ দাবি করেছিল। গ্রামীণ ফোন ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহূত স্থান ও স্থাপনার ভাড়ার বিপরীতে ভ্যাট না দেওয়ার অভিযোগে ১৯ কোটি টাকা দাবি করা হলে সেটি নিয়েও তারা আপিল করে।
রেলওয়ের কাছ থেকে অপটিক্যাল ফাইবার লিজ বিধি বহির্ভূতভাবে রেয়াত গ্রহণের অভিযোগে তাদের কাছে ৩০ কোটি টাকা ভ্যাট দাবি করা হয়। বিষয়টিকে তর্কিত করে হাইকোর্টে ২০১৩ সালে কোম্পানিটি রিট করে। আইন বহির্ভূতভাবে গৃহীত রেয়াত পরিশোধ সংক্রান্ত এবিআরের ২৯ কোটি টাকার ভ্যাট দাবিকে তর্কিত করে মামলা করা হয়।
গ্রামীণ ফোন ও রেলওয়ের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী অপটিক্যাল ফাইবার লিজ গ্রহণের বিপরীতে ভ্যাট না দেওয়া সংক্রান্ত আরেকটি মামলায় আটকে আছে ১৮ কোটি টাকা। এছাড়া উেস ভ্যাট প্রদান না করা সংক্রান্ত আরেকটি মামলায় ১৭ কোটি টাকা। ২০০১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সময়ে পরিদর্শন পরিদপ্তরের নিরীক্ষায় বিধি বহির্ভূতভাবে রেয়াত গ্রহণ করায় ৪ কোটি টাকা জরিমানার দাবিনামা জারি করা হলে সেটিও এখন বিচারাধীন।
এছাড়া গ্রামীণ ফোনের ২০১২ মেয়াদে বিধি বহির্ভূতভাবে রেয়াত গ্রহণ সংক্রান্ত একাধিক মামলা এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহূত নির্দিষ্ট সীমার উপর স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার বিপরীতে ভ্যাট না দেওয়া সংক্রান্ত দাবিনামা বিষয়ে মামলায়ও আটকে আছে মোটা অঙ্কের ভ্যাট।
বাংলালিংকের ১১ মামলা
৯৮৬ কোটি টাকার ১১টি মামলা ২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যকার। এর মধ্যে সিমকার্ড ও স্ক্র্যাচ কার্ডের তথ্য নিয়ে একটি মামলায় আটকে আছে ৪৯ কোটি টাকা। মামলাটি ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।
এনবিআরের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি কম্পিউটারে ধারণকৃত প্রকৃত সিমকার্ড ও স্ক্র্যাচ কার্ড সরবরাহের তুলনায় এনবিআরে কম দেখানোর মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এই অভিযোগে এনবিআর ৪৯ কোটি টাকা ভ্যাট দাবি করলে কোম্পানি মামলা দায়ের করে।
২০০৬ সালের আগস্ট থেকে ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত সিমকার্ডের উপর পরিশোধযোগ্য ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক যথাসময়ে পরিশোধ না করায় অতিরিক্ত ২২৮ কোটি টাকা দাবি সংক্রান্ত একটি মামলা রয়েছে। স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার উপর প্রযোজ্য ৩৪ কোটি টাকা ভ্যাটের বিষয়ে এনবিআরের দাবির বিপরীতে কোম্পানি মামলা করেছে। তবে সবচেয়ে বড় অঙ্কের ভ্যাটের মামলা হচ্ছে সিম রিপ্লেসমেন্টের নামে নতুন সিম বিক্রির ৬১৩ কোটি টাকা ভ্যাট। এ বিষয়ে এনবিআরের চূড়ান্ত দাবিনামাকে তর্কিত করে করা মামলাও বিচারাধীন।
এর বাইরে আইন বহির্ভূতভাবে রেয়াত দাবি করায় ৩২ কোটি টাকা ভ্যাট দাবিও মামলায় গড়িয়েছে। স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের আপত্তি সংক্রান্ত মামলায় আটকা ২৫ কোটি টাকা, উেস ভ্যাট জমা না দেওয়া সংক্রান্ত মামলা এক কোটি টাকার বেশি, ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে নেওয়া রেয়াত সমন্বয়ের জন্য জারিকৃত এলটিইউ’র দাবিকে তর্কিত করে মামলায় ৭৮ লাখ টাকা, বিধি বহির্ভূতভাবে নেওয়া রেয়াত কর্তন করার আদেশকে তর্কিত করে মামলায় ৪৮ লাখ টাকা ছাড়াও একাধিক মামলা রয়েছে।
রবির ৬ মামলা
রবি অজিয়াটা’র সঙ্গেও ৬ মামলায় আটকে আছে ৯৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে চারটি এনবিআরের আপিলাত ট্রাইব্যুনালে এবং দুটি হাইকোর্টে বিচারাধীন। আইন বহির্ভূতভাবে রেয়াত নেওয়ায় এলটিইউ ৮৩ কোটি টাকা ভ্যাট দাবি করলে প্রতিষ্ঠানটি মামলা করে। তবে বড় অঙ্কের অর্থ আটকে আছে সিম পরিবর্তনের নামে নতুন সিম বিক্রি করার মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে। এনবিআর ৫৯৪ কোটি টাকা দাবি করলে প্রতিষ্ঠানটি মামলায় যায়। বহুল আলোচিত এ মামলা এখন আপিলাত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এছাড়া ২০০৬ সালের আগস্ট হতে ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত সিম কার্ডের উপর পরিশোধযোগ্য ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক যথাসময়ে পরিশোধ না করায় ২৬৬ কোটি টাকা দাবি করলে সেটিও মামলায় গড়িয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার বিপরীতে ভ্যাট না দেওয়া সংক্রান্ত দুটি মামলায় ১৫ কোটি টাকার বেশি আটকে আছে।
এয়ারটেলের ১০ মামলা
১০ মামলার মধ্যে ৬টি আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ও ৪টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। এর মধ্যে এরিকসনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ কাজে উেস ভ্যাট কর্তন না করায় এনবিআর ১১৭ কোটি টাকা দাবি করলে কোম্পানি মামলা করে। সিম ও স্ক্র্যাচ কার্ডের প্রকৃত তথ্য না দেওয়ার অভিযোগে ৮৬ কোটি টাকার ভ্যাট দাবি করা হলেও সেটি মামলায় গড়িয়েছে।
এছাড়া সিম রিপ্লেসমেন্ট সংক্রান্ত মামলায় ৭৯ কোটি টাকা, বাণিজ্যিকভাবে স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার বিপরীতে ভ্যাট প্রদান না করা সংক্রান্ত মামলায় ১৭ কোটি টাকা, মটোরোলার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে সেবা মূল্যে ভ্যাট পরিশোধ না করা সংক্রান্ত মামলায় ৩২ কোটি টাকা, অতিরিক্ত রেয়াত গ্রহণ করার অভিযোগে ৭ কোটি টাকা ভ্যাট দাবিকে তর্কিত করে মামলাসহ আরো কয়েক কোটি টাকার মামলা রয়েছে।
টেলিটকের ৪ মামলা
সরকারি টেলিটকের সঙ্গেও ৪ মামলায় ৯১ কোটি টাকা আটকে আছে বলে জানা গেছে। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, বছরের পর বছর ধরে এসব মামলা ঝুলে থাকায় সরকারের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়ও কমে যাচ্ছে। মামলায় আটকে থাকা এসব অর্থ দ্রুত উদ্ধার করা গেলে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন যেমন সহজ হতো, তেমনি সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নও সহজ হতো।
