‘যারা ওই জমিতে নিয়ে বসাল তারাই আগুন দিল, গুলি করল’

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০৭

‘আমাদের ঘরে যখন আগুন দেয়, সেই আগুনে অনেকে পুড়ে মরেছে। লাশগুলো আমরা নেওয়ার সুযোগ পাই নাই। প্রাণ ভয়ে সবাই পালিয়েছি। ওই জমিতে সেইদিন থেকেই ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করছে মিলের লোকেরা। আমাদের ওই দিকে যেতে দিচ্ছে না, এখন ওই এলাকা পুরোটাই কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেছে। অনেক মা-বোন-ভাইয়ের জীবন গেছে। কিন্তু সেই জীবনের বিনিময়ে হলেও আমরা আমাদের বাপ-দাদার জমি ফেরত চাই। ভূমি আমাদের ফেরত দিতেই হবে’— এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করে জমি আদায়ের দাবি জানান সাঁওতাল নারী বারণা বাস ও অ্যামেলি সরেন।

 
গত রবিবার দুপুরে সরেজমিনে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীতে গেলে সাঁওতাল নারীরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা অভিযোগ করে বলেন, গত জুন মাসে সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহম্মেদ বুলবুল ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ওই জমিতে আমাদের বসিয়েছেন। বুলবুল আমাদের ভূমি রক্ষা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তারাই আবার আমাদের ঘরে আগুন দিয়ে, গুলি করে উচ্ছেদ করেছে। এ সব তাদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
 
রমিলা কিসকু এবং রুনা সরেন বলেন, সাহেবগঞ্জের হরিণমারি, কুয়ামারা, মাদারপুরে  ১ হাজার ঘরবাড়ি ছিল। আমরা চার বছর ধরে জমির জন্য আন্দোলন করে আসছি। আগে আমাদের দাবি দাওয়া পূরণ করেন, বাপ-দাদার জমি ফিরিয়ে দিন। পরে অন্য কথা। 
 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নারীরা বলেন, ঘরের মধ্যে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে যখন, তখন ওই ঘরে গর্ভবতী নারীও ছিল, সেও মারা গেছে, সন্তান মারা গেছে, এ সব লাশ একটি কালো গাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে। তারা বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতেই চেয়ারম্যান ও এমপির লোকেরা গুলি করেছেন।    
 
বাগদা ফার্ম প্রাথমিক স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র হূদয় বলেন, এখন স্কুল হয় না। কেন হয় না জানতে চাইলে বলে, ওইদিন হামলার পর থেকে কেউ আর স্কুলে যায় না।
 
শিশুদের চোখে মুখে আতঙ্ক, কোল থেকে কোনো শিশুই নামতে চাইছে না বলে জানান মায়েরা। শিশু সন্তানদের নিয়ে না খেয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন নারীরা। বিরূপ পরিস্থিতির কারণে কাজ নেই, সে কারণে হাতে নগদ টাকা নেই। কোনো কিছু যে কিনে খাবে সেই অবস্থাও নেই। সেদিন সাঁওতাল পল্লীতে কথা বলার জন্য কোনো পুরুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। জানা যায়, এলাকার পুরুষদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামালা দেওয়ায় তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। তবে ওইদিন মাদারপুর ক্যাথলিক চার্চ প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের সমাবেশ শেষে যখন মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক প্রতিনিধিদের সমাবেশ শুরু হয় তখন আশপাশ থেকে দলে দলে আসতে থকে সাঁওতালরা। তখন খুব একটা ভয় কাজ করছিল না তাদের।
 
সখী সরেন বলেন, আমার মা ফুলমনি মুরমুরের গুলি লাগে চার জায়গায়। হাতে, পেটে গুলি লেগেছে। কিন্তু হাসপাতালে গেলে তাদের হাতকড়া পরানো হচ্ছে বলে আমরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিনি। তিনি পীরগাছায় একজন চিকিত্সকের তত্ত্বাবধানে আছেন।
 
এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. আবদুস সামাদ বলেন, ভূমির সমাধান আইনগতভাবেই হবে। সাঁওতালরা মামলা করুক, দেশের আইনে যদি ওই জমি সাঁওতালদের হয়ে থাকে, তাহলে তারা তা ফেরত পাবে।
 
কথা হয় সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কের সঙ্গে। তিনি বেশ ক’দিন ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানান। বাড়ি ছেড়েছেন গত তিন মাস আগে। কারণ মাথার উপর একাধিক মিথ্যে মামলা ঝুলে আছেন।
 
গত ৬ নভেম্বর মাদারপুর ও জয়পুর সংলগ্ন বাগদা ফার্মে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে সাঁওতালদের হাজারখানেক ঘরবাড়ি। হিন্দু-মুসলমান মিলিয়ে বাঙালিদেরও ছিল ৫০০ ঘর-বাড়ি। যার কোনো চিহ্ন এখন সেখানে নেই। পরিণত হয়েছে চাষের জমিতে। সাঁওতালদের দাবি, আরো বেশি মানুষ মারা গেছে, তাদের লাশ লুকিয়ে ফেলা হয়েছে।
 
ওই এলাকা ঘুরে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে, সেখানে ক’দিন আগেও এতগুলো বসতবাড়ি ছিল। এলাকাবাসী জানান, ৬ তারিখের পর থেকে প্রতিদিন ক্রমাগত ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করা হচ্ছে ওই জমি। সাঁওতালদের অভিযোগ, ওখানে আরো অনেক লাশ ছিল বলেই তারা সেই জায়গায় চাষ করে ওসব লাশ গুম করে ফেলেছে। এখন ওই এলাকায় ১০ ফিট উঁচু করে ৮ ফিট অন্তর কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে ফার্ম কর্তৃপক্ষ। সেখানে এখন জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ।
 
গাইবান্ধা জেলার পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠিক নয়। পুলিশের উচ্ছেদের জন্য সেখানে যায়নি। পুলিশ সেখানে গিয়েছিল সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। 
 
জমি ফিরে পাওয়ার দাবিতে ভূমি উদ্ধার কমিটির ব্যানারে কমপক্ষে ২ বছর আগে থেকে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছিল সাঁওতালরা। প্রথম দিকে এ আন্দোলন কর্মসূচিতে সরকারি দলের অনেক নেতাকর্মীর মদদ ছিল। তাদের সহযোগিতায় গত জুলাইয়ে ওই ইক্ষু খামারের ১৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমির মধ্যে থেকে ১২০০ একর জমি দখল নিয়ে প্রায় এক হাজার ঘরবাড়ি তোলা হয়।
 
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, সাঁওতাল পল্লীতে ত্রাণের প্রয়োজন থাকলেও ক্ষোভে গত সোমবার প্রশাসনের দেয়া কোনো ধরনের ত্রাণ তারা গ্রহণ করেনি। তবে বেসরকারি ত্রাণ নিতে গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কোনো আপত্তি নেই বলে তারা জানিয়েছেন। সে সূত্র ধরে যুব ইউনিয়ন ও কৃষক সমিতি গাইবান্ধা জেলা শাখা গতকাল মঙ্গলবার ইক্ষু খামারের উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত দুইশ’ সাঁওতাল পরিবারের মাঝে হাঁড়ি, পাতিল, থালা, গ্লাস চামচ বিতরণ করেছে। মাদারপুর চার্চ প্রাঙ্গণে যুব ইউনিয়ন ও কৃষক সমিতির ত্রাণসামগ্রী নিতে আসা জ্যোত্স্না মুরমু ও রোজিনা সরেন বলেন, সরকার এবং এমপি ছাড়া অন্য সবার সাহায্য আমরা নেব।
 

ইত্তেফাক/এএন