মিল কর্তৃপক্ষ ও সাঁওতালরা নিজ নিজ অবস্থানে অনড়

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৬, ০০:১৪

সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি থেকে সাঁওতাল বসতি উচ্ছেদের ঘটনায় উদ্ভূত সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান ১৬ দিনেও হয়নি। সাঁওতাল, মিল কর্তৃপক্ষ এবং সরকার তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় এ অবস্থা বিরাজ করছে। ফলে উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতাল পরিবারগুলো গতকাল সোমবারও মাদারপুর মিশন গীর্জা সংলগ্ন খোলা মাঠ, গাছ-গাছালির আড়ালে এবং পরিত্যক্ত ঘরের বারান্দায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

 
চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি সাঁওতালদের ফেরত পাবার কোনো সুযোগ নেই। সেসময় সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়েই জমিগুলো অধিগ্রহণ করেছিল। শুধু আদালতের নির্দেশনা পেলেই এর ব্যত্যয় সম্ভব। তারা রাজি হলে কাটাবাড়ি ইউনিয়নের ১৪.২৬ একর জায়গায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীন সাঁওতালদের পুনর্বাসন করা যাবে। গত রবিবার জেলা প্রশাসকের এমন ঘোষণা সাঁওতালদের আরো ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
 
এক প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় আদিবাসী পরিষদ সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, জেলা প্রশাসক আমাদের দাবির প্রতি অবমাননাকর উক্তি করেছেন। আমরা বাপ-দাদার জমি ফেরত পাবার জন্য জীবন দিয়েছি, সেই জমি আমাদের ফেরত দিতে হবে। তিনি বলেন, যেহেতু                 চিনিকল কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণের চুক্তি ভঙ্গ করেছে তাই আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষের জমি ফেরত চাই। তিনি আরো বলেন, জেলা প্রশাসক বলেছেন মাত্র ৩১ জন ভূমিহীন সাঁওতাল আছে। এটিও একটি চরম অসত্য কথা। লুকোচুরির করার কিছুই নাই। এটা আজ সবার জানা কয়টি সাঁওতাল পরিবারকে ওই জমির বসতি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। আর কতজন খোলা আকাশের নীচে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সদস্য ও মাদারপুরের গ্রাম প্রধান বার্নাবাস টুডু বলেন, আমরা জেলা প্রশাসকের করুণা চাই না। আমরা আমাদের বাপ-দাদার জমি ফেরত চাই। আমরা কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্রে যাব না।
 
ধান কাটার প্রস্তাব নিয়ে সাঁওতাল পল্লীতে  ইউএনও-মিল কর্তৃপক্ষ
 
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল হান্নান, রংপুর চিনিকলের এমডি আব্দুল আউয়াল ও ওসি সুব্রত কুমার সরকার গতকাল দুপুরে মাদারপুর গ্রামে গিয়ে সাঁওতাল নেতাদের সাথে সাক্ষাত্ করেন। তারা মিলের জমিতে সাঁওতালদের রোপণকৃত ধান কেটে দেয়ার জন্য তাদের কাছে তালিকা চান। কিন্তু সাঁওতাল নেতারা তাদের জমির ধান তারা নিজেরাই কাটবেন বলে জানান।
 
সাঁওতাল নেতা টাটু-টুডু এবং বার্নাবাস টুডু জানান যেহেতু ওই জমিতে তারা সম্মিলিতভাবে ধান চাষ করেছেন। তাই কিভাবে তারা ধান কাটবেন সে বিষয়ে আগামী মঙ্গল-বুধবারের মধ্যে মিল কর্তৃপক্ষ ও প্রসাশনকে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
 
সাঁওতাল শিশুদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা
 
গোবিন্দগঞ্জের মাদারীপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল শিশুদের জন্য চালু হয়েছে আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যমে পাঠদান ব্যবস্থা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগিতায় গণউন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে) গত রবিবার বিকালে এ ব্যবস্থা চালু করে। 
 
সাঁওতাল পল্লীর শিশুরা ওই বিনোদন কেন্দ্রে গিয়ে খেলাধুলা, পড়াশুনাসহ আনন্দ করছে। কেন্দ্রগুলো সাজানো হয়েছে খেলার নানা উপকরণ দিয়ে। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত শিশুরা তাদের সুবিধামতো সময়ে এসে আনন্দ করছে।
 
খেলতে আসা স্মৃতি মুরমু জানায়, আমাদের খেলাধুলার কোনো সুযোগ ছিল না। এখানে এসে ভালই লাগছে। রেশমা মার্ডি জানায়, আমরা আখ ক্ষেতে খেলতে যেতাম; কিন্তু কাঁটা তারের বেড়া দেয়ায় সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। খেলার সেই আনন্দ পাচ্ছি এখানে এসে। একই ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে এমিলা, মুরমু মার্ডিও।
 
এ প্রসঙ্গে গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের সমন্বয়কারী আফতাব হোসেন জানান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা শিক্ষা ও বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। গত ৬ নভেম্বরের ঘটনায় শিশুরা আতংকিত। একারণেই শিশুদের জন্য বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
 
এদিকে গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ ইক্ষুখামার এলাকায় সাঁওতালদের ওপর হামালা, লুটপাট ও ঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গত রবিবার রাতে আরো চার জনকে আটক করেছে পুলিশ।
 
আটককৃতরা হলেন : উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ গ্রামের মৃত আছমান আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম, তরফ কামাল গ্রামের কপিল মিয়ার ছেলে মোকলেছুর রহমান, কাজেম উদ্দীনের ছেলে সাহেব আলী ও  মাদারপুর গ্রামের দারাজ আলীর ছেলে আব্দুল মান্নান ।
 
ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের পক্ষে মামলা দায়েরের পরপরই থানা পুলিশ অভিযান শুরু করে এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে আটক করেছে।
 
এদিকে গতকাল সোমবার দুপুরে গোবিন্দগঞ্জ পৌর মেয়র আতাউর রহমান সরকারের স্ত্রী সুইটি বেগম ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের মাঝে ৪শ’ পিস কম্বল ও শিশুদের মাঝে ৩শ’ পিস শীতবস্ত্র বিতরণ করেন। এসময় সাপমারা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবেদ হোসেন সরদার উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও সিপিবি’র একটি প্রতিনিধিদল মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া পরিদর্শন করেছেন।
 
ইত্তেফাক/এএন