ঠোঁট কাটা মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে আছমত আলী খান ফাউন্ডেশন

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০৮

মাদারীপুরে আছমত আলী খান ফাউন্ডেশনের প্রচেষ্টায় আফ্রিকা ও আমেরিকা থেকে ২০-২৫ জন ডাক্তার এসে প্রতি বছর বিনামূল্যে অপারেশন করে কয়েকশত ঠোঁটকাটা রোগীর জীবনমান পাল্টে দিয়েছে এবং দিচ্ছে।

 
২৪ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর ২০১৬ পর্যন্ত ভারতের চেন্নাইতে অনুষ্ঠিত হলো ঠোঁট কাটা, তালু কাটা এবং ক্রোনিওফ্যাসিয়াল সার্জারির ওপর ১০তম বিশ্ব কংগ্রেস। পাঁচদিনব্যাপী এই কংগ্রেসে ৭০টির বেশি দেশের ২ হাজার সার্জন অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্লাস্টিক সার্জন ও ম্যাক্রিলোফ্যাসিয়াল চিকিৎসকগণও সেখানে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ওরাল প্যাথলজি ডিপার্টমেন্টের হেড ডাঃ জালাল মাহমুদ বিশ্ব কংগ্রেসে তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশের ঠোঁট কাটা তালু কাটা রোগীদের বর্তমান চিত্র। সারা বিশ্বের নাম করা সার্জনরা ডাঃ জালাল মাহমুদের উপস্থাপনায় জানতে পারেন বাংলাদেশের নাম। তার সঙ্গে জানতে পারে ছোট্ট একটি মফস্বল শহরের সফল ক্যাম্পের কথা। কেমন করে গত দশ বছর ধরে মাদারীপুরে ঠোঁট কাটা মানুষের জীবন বদলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক এ কংগ্রেসে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষ করে ঠোঁট কাটা চিকিৎসায় এমন অবদানের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে আছমত আলী খান ফাউন্ডেশন।
 
মাদারীপুরে ঠোঁটকাটা মানুষের চিকিৎসাসেবায় এই বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির একান্ত পারিবারিক উদ্যোগে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় বলে ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে।
 
ফাউন্ডেশনটির কাজ এবং এর প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে জানতে চাইলে এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. মাহবুবুর রহমান খান বলেন, ‘এই ক্যাম্পের শুরু হয় ২০০৬ সালে। নাইরোবিতে আমি তখন কেনিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব মুসলিম মেডিকেল প্রোফেশনালস-এর একজন বোর্ড অব ডিরেক্টর। কেনিয়ার মুসলিম ডাক্তারগণ বিভিন্ন জায়গায় বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির করে গরীব ও দুঃস্থ রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছিলো। কোনো এক বোর্ড মিটিং-এ আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম- বাংলাদেশে ঠোঁট কাটা, তালু কাটা রোগীদের জন্য একটা ক্যাম্প করব। কেনিয়া থেকে নিয়ে যাবো স্বেচ্ছাসেবক, ডাক্তার ও নার্সদের। সেই বোর্ড মিটিং-এ আরও একজন সদস্য আগা খান ইউনিভার্সিটির সার্জারী বিভাগের হেড প্রফেসর তখন প্রস্তাবটিতে অসম্মতি জানান। যে কারণে তখন প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হয়নি। তবুও আমি ক্ষান্ত হইনি।
 
ডা. মাহবুবুর রহমান খান আরো জানান, তিনি ২০০৭ সালের নভেম্বরে মাদারীপুরে ক্যাম্প করার আগ্রহটি আবার প্রকাশ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ‘প্রথমে আমি আমাদের সবার শ্রদ্ধাভাজন বড় ভাই, বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানকে বিষয়টি জানাই। তিনি তখন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একজন সদস্য ছিলেন। তিনি আমাকে সামরিক শাসনের কারণে নিরুৎসাহিত করলেন। তিনি বললেন, সামরিক শাসনের আওতায় তুমি বড় ধরনের লোক সমাগম করতে পারবে না, ব্যাপকভাবে প্রচারণাও করতে পারবে না, গরীব অসহায় দুঃস্থ রোগীরা যদি তোমার ক্যাম্প সম্পর্কে না জানে তাহলে তুমি ক্যাম্প সফল করতে পারবেনা।
 
শাজাহান খানের পরামর্শ গ্রহণ করেন ডা. মাহবুবুর রহমান খান। তারপর অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নেন, তিনি যোগাযোগ করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে।কারণ, ১৯৯৩-৯৪ সালে সোমালিয়াতে যখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিবাহিনীতে কাজ করতো-তখন তাদের সঙ্গে তিনিও নাইরোবিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতেন। সেই সূত্রে তার সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওই কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তার।
সেনাবাহিনীর ওই কর্মকর্তারা তাকে আশ্বস্ত করেন সহযোগিতা দেওয়ার ব্যপারে। অতঃপর তিনি ২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত মাদারীপুরে প্রথম চারদিনব্যাপী বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করেন। আছমত আলী খান রিসার্স ফাউন্ডেশন সেই ক্যাম্পের আয়োজক ছিল। মাদারীপুরে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা শিবির সেই থেকে শুরু।
আছমত আলী খান ফাউন্ডেশনে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের পৃষ্ঠপোষকতায় ও তাঁর দিক-নির্দেশনায় গত দশ বছরে কয়েক হাজার রোগীর সফল অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে।
 
ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মাহবুবুর রহমান ফাউন্ডেশনটির সফলতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে কেনিয়ার ১৬ সদস্যের মেডিকেল টিম যখন বাংলাদেশ বিমান বন্দরে অবতরণ করে তখন সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছিলো সোমালিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এতগুলো বিদেশী চিকিৎসক নিয়ে আমি কেমন করে দেশে এলাম? তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম, দেশের গরীব অসহায় দুঃস্থ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিবো- এটাই আমার বড় শক্তি।
ডা. মাহবুবুর রহমান তার টিম নিয়ে প্রায় দশটি দেশে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। তিনি সোমালিয়ার মতো গৃহযুদ্ধগ্রস্ত দেশে কাজ করেন। সোমালিয়ার যেসব আল-শাবাবের সদস্য আছে- যাদের সন্তান বা আত্মীয়রা অসুস্থ, তাদের চিকিৎসা দেন তিনি। তাই তিনি বিশ্বাস করেন, ওরা তাদের হত্যা করতে আসবে না!
মাদারীপুরে ঠোঁটকাটা চিকিৎসার ক্যাম্পটি ততটা আধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত নয়। তবে কিভাবে এখানে চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে জানতে চাইলে ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি কখনো চিকিৎসাবিদ্যাকে পেট বাঁচানোর হাতিয়ার হিসেবে নিইনি। আমি ডাক্তার হয়েছি মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যে।
আর একজন চিকিৎসকের অভিজ্ঞতার ভীষণ প্রয়োজন। মাদারীপুর ক্যাম্পের এটাই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। যেখানে হাসপাতালে কোন আধুনিক সরঞ্জামাদি নেই, এক্সরে, প্যাথলজি, আইসিইউ এমনকি ভালো অপারেশন থিয়েটার পর্যন্ত নেই, সেখানে দক্ষতা দিয়ে অনেক বড় বড় টিউমারের অপারেশন করা হয়েছে, অনেক জটিল রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়েছে বিনামূল্যে।
কেন তিনি ঠোঁটকাটা চিকিৎসা ক্যাম্প করলেন মাদারীপুরে এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমার আপন ছোটভাই ঠোঁট কাটা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। আমি নিজে একজন ডাক্তার হিসেবে এবং একজন বড় ভাই হিসেবে তার ব্যথা, তার কষ্ট হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছি। আর এই বাস্তব ঘটনার মধ্য দিয়ে আমি পৃথিবীর কোথাও ঠোঁটকাটা রোগী দেখলে আমার আদরের ছোট ভাইয়ের মুখখানা মনে পড়ে। তাই ঠোঁটকাটা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার জন্য আফ্রিকা ও এশিয়ার নানা দেশে যাই। আর এখন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জেলা মাদারীপুরে আছমত আলী খানের সেই ঠোঁটকাটা সন্তান নিজেই গড়ে তুলেছেন বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মেডিকেল মিশন।
ডা. মাহবুবুর রহমান দেশের সামর্থবান নাগরিকদের প্রতি আহ্বান রেখে বলেন, বিদেশ ভ্রমণ ও ঈদের শপিংয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড না গিয়ে সেই অর্থ গরীব মানুষের সেবার জন্য ব্যবহার করা যায়। আর এ ধরনের পরিকল্পনা থাকলে আমাদের দেশের অসহায় মানুষের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হবে।

ইত্তেফাক/এএন