নিম্নমানের ও ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ পান করে ২৮ শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ওষুধ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিকসহ সব আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত। এ সংক্রান্ত রায়ে আদালত বলেছে, মামলার বাদী ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলামের অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণেই রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ সঠিক নিয়ম না মেনেই বাদী জব্দ তালিকা প্রস্তুত করেছেন। এমনকি পরীক্ষার প্রতিবেদন সঠিকভাবে দাখিল করেননি। এছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তেও গাফিলতি ছিল বলে আদালত উল্লেখ করেছে। আদালত বলেছে, মামলা দায়েরের সময় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত্ ছিল, তা তিনি নেননি। এতে তার অযোগ?্যতা ও অদক্ষতা প্রমাণিত হয়। এ কারণে আসামিদের খালাস দেওয়া হলো। গতকাল সোমবার ঢাকার ড্রাগ আদালতের বিচারক এম আতোয়ার রহমান এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন রিড ফার্মার মালিক মিজানুর রহমান, তাঁর স্ত্রী পরিচালক শিউলি রহমান, পরিচালক আবদুল গণি, ফার্মাসিস্ট মাহবুবুল ইসলাম ও এনামুল হক। পাঁচজনের মধ্যে তিনজন পলাতক রয়েছেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন মিজানুর ও শিউলি রহমান।
২০০৯ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে রিড ফার্মার বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ পানে কিডনি নষ্ট হয়ে ২৮ শিশু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। কারখানায় ভেজাল ও নিম্নমানের প্যারাসিটামল তৈরির অভিযোগ এনে ২০০৯ সালের ১০ আগস্ট ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, রিড ফার্মার টেমসেট সিরাপ (প্যারাসিটামল) এবং নিডাপ্লেক্স সিরাপ (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স) খেয়ে কিডনি অকেজ হয়ে শিশু মারা গেছে মর্মে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই কয়েকটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর জনস্বার্থে ওই ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। শিশু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক এম আর খান (সম্প্রতি প্রয়াত) এবং এইচ এস কে আলম ওই দুটি সিরাপের নমুনা সংগ্রহ করে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করান। ২৯ জুলাই ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার রিপোর্টে বলেন, এগুলোতে ক্ষতিকর ডাই ইথাইল গ্লাইকল মেশানো হয়েছে। যা মূলত প্লাস্টিক বা চামরার রঙের থিনার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এগুলো মানুষের দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই প্যারাসিটামল পান করে শিশু মারাও গেছে। মামলা করার পর আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। মিজানুর রহমান ওই বছরের ১২ অক্টোবর আত্মসমর্পণ করলে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়। শিউলি হাইকোর্টে জামিন পান।
ঘটনার পর মামলার এজাহারের সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যে গড়মিল পরিলক্ষিত হয়। এজাহারে বলা হয়েছিল, রিড ফার্মার প্যারাসিটামলে বিষাক্ত উপাদানের কারণে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলেন, ওই প্যারাসিটামলে ডাই ইথানল গ্লাইকল পাওয়া যায়নি। তবে ওই ওষুধ ছিল নিম্নমানের। বিচার চলাকালে আলোচিত এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক এইচএসকে আলম, ওষুধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন, একই অধিদপ্তরের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবের সহকারি বিশ্লেষক মো. আবু বকর সিদ্দিক।
গতকাল ঘোষিত রায়ে বলা হয়, ওষুধের নমুনাকে চারভাগে ভাগ করে এক ভাগ আদালতে, এক ভাগ বিশ্লেষককে (এনালিস্ট), এক ভাগ আসামিকে এবং আরেক ভাগ মামলা দায়েরকারী কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রাখতে হয়। কিন্তু এ মামলায় উদ্ধার করা রিড ফার্মার প্যারাসিটামলে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এবং উদ্ধার করা এ ওষুধ রিড ফার্মার কি না, সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। এ কারণে আসামিদের খালাস দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
রায়ের বিষয়ে ড্রাগ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি নাদিম মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, মামলার আলামত জব্দ করা হয়েছে ঢাকার শিশু হাসপাতাল থেকে। হাসপাতাল থেকে যে ওষুধ জব্দ করা হয়েছে তা রিড ফার্মার বলে প্রমাণিত হয়নি। আমরা যেটুকু বুঝেছি, মামলার আলামত হিসেবে ওষুধ যদি কারখানা থেকে করা জব্দ করা হতো, তাহলে হয়তো সঠিক হতো। এছাড়া শিশু হাসপাতাল কিভাবে এই সিরাপ ব্যবহারের অনুমতি পেল কিভাবে তার কোন ইনভয়েস আদালতে উপস্থাপন করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। তিনি বলেন, যদি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর রাজি হয়, তবে আমরা আপিলে যাব।
আসামি পক্ষের আইনজীবী আনোয়ার জাহিদ ভূইয়া বলেন, মামলায় প্যারাসিটামলে যে বিষাক্ত পদার্থের কথা বলা হয়েছিল, তা পাওয়া যায়নি। এছাড়া ওষুধের যে নমুনা তখন ঢাকা শিশু হাসপাতালের একজন উপ-পরিচালক উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন, তাও ১৯৪০ সালের ওষুধ আইনের নিয়ম মেনে করা হয়নি বলে আসামিদের খালাস দিয়েছেন বিচারক।
রিড ফার্মার মালিক মিজানুর মামলাটিকে হয়রানিমূলক দাবি করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ন?্যায়বিচার পেয়েছি। এই মামলার জন?্য আমার ব?্যবসায় ধস নেমেছে। এজন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলাও করতে পারি।’
প্রসঙ্গত ভেজাল প্যারাসিটামল তৈরির দায়ে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যালসের অন্যতম মালিক, ব্যবস্থাপকসহ তিনজনকে ১০ বছর কারাদণ্ড দিয়েছিলো এই আদালত। ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে ১৯৯২ সালে ৭৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ওষুধ আইনে করা আরেকটি মামলায় বিসিআই ফার্মার ছয় কর্তাব্যক্তিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত।
ইত্তেফাক/এএন