অবহেলিত, অভাজনদের জনপদ বলে পরিচিত রংপুরের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ এ অঞ্চলের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে বিভাগীয় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জোরালো ভাষায় তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্যদিয়ে যুগ যুগ ধরে চলে আসা বঞ্চনার তিমির থেকে রংপুর বিভাগের ৮ জেলার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। অবকাঠামোর উন্নয়ন, শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত করা আর আর্থসামাজিক অবস্থার বিবর্তন ঘটাতে হবে। তারা প্রায় অভিন্ন কণ্ঠে সরকারের কাছে এই দাবি তুলে ধরেন যে, শিল্প গড়তে ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুত্ দিতে হবে, শুল্কমুক্ত ঋণ প্রদান করতে হবে, অর্থনৈতিক জোন, পৃথক শিল্পনীতি প্রণয়ন আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে উন্নয়নের মাষ্টারপ্লান বাস্তবায়ন করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার রংপুরের স্থানীয় একটি পার্টি সেন্টারে দৈনিক ইত্তেফাকের উদ্যোগে ‘রংপুর বিভাগ, সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে রংপুর বিভাগের শীর্ষ স্থানীয় নাগরিকবৃন্দ এ কথা বলেন। দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু। আলোচনায় অংশ নেন, এফবিসিসিআই’র সাবেক সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ, রংপুর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আবুল কাশেম, শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ ইউসুফ আহমেদ, সাংবাদিক জাভেদ ইকবাল, পরিবেশ আন্দোলন কর্মী এ্যাডভোকেট এমএ বাশার টিপু, উপাধ্যক্ষ রকিবুল হাসান বুলবুল, লালমনিরহাট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান, আইনজীবী কাজী মোহাম্মদ ফারুক, নীলফামারীর ব্যবসায়ী নেতা শফিকুল আলম ডাবলু, দৈনিক অর্জন পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, মানবাধিকার কর্মী এ্যাডভোকেট মুনীর চৌধুরী, ডাঃ সমর্পিতা ঘোষ তানিয়া, কুড়িগ্রামের আইনজীবী এসএম আব্রাহাম লিংকন, নারী উদ্যোক্তা ইরা হক, সাহিত্যিক শহিদুর রহমান বিশু প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন, ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স এর পরিচালক মুহিবুল আহসান শাওন, ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন, রংপুর বিভাগ উন্নয়ন আন্দোলন পরিষদের আহ্বায়ক, দৈনিক ইত্তেফাকের রংপুর অফিস প্রধান ওয়াদুদ আলী।
মেয়র সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বিগত ৪ বছর ধরে অনেক চেষ্টা-তদবীরের পরও রংপুরের এজন্য একটা মাষ্টারপ্লান বের করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ এলাকার আমলারা অবহেলিত রংপুরবাসীকে ভ্রুকুটি করে। তারা আমাদেরকে অবমূল্যায়ন করে। রংপুরের মানুষ সহজ-সরল। এই সুযোগ নিয়ে নদীর ওপারের লোকেরা আমাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে কোষ খাচ্ছে। আমাদেরকে চালাক হতে হবে। ঝন্টু বলেন, শিক্ষার দিক থেকে আমরা রংপুরবাসী পিঁছিয়ে পড়েছি। আমাদের এখন শিক্ষার দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে। আমরা শিক্ষিত না হতে পারলে আমাদেরকে অবজ্ঞার পাত্র হয়ে থাকতে হবে। তিনি বলেন, পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আমাকে একটি প্রজেক্ট দিয়েছেন। কিন্তু আমলারা পদে পদে বাঁধা দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কোন কথা বললে আমলারা নড়েচড়ে বসেন। তাছাড়া কোন মন্ত্রীর কথাও অনেক সময় তারা শুনতে চান না। রংপুরের প্রাণ শ্যামাসুন্দরী খাল কেঁটে ড্রেন বানানো হয়েছে। ঢাকায় বসে আমলারা এইসব অপকর্ম করছে। এর প্রতিকার চাই। মেয়র সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু রংপুরের জিকঞ্চিত যে উন্নয়ন ঘটেছে তার সমস্ত কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের পুত্রবধূ। এ অঞ্চলের যা কিছু হয়েছে সমস্ত অবদান তার। তার কাছে আমাদের চাওয়া-পাওয়া-আবদার-অনুযোগ সবচেয়ে বেশি।
তাসমিমা হোসেন বলেন, স্বাধীনতা উত্তর এই ৪৫ বছর একটি দেশের জন্য কিছুই নয়। এই রংপুরের ঐশ্বর্য্যময় একটি অতীত ছিল। কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এক বিশাল ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। অতীতে রংপুরের মানুষ উচ্চশিক্ষার জন্য কোলকাতায় যেতেন। শিক্ষা-দিক্ষায় তারা অনেক অগ্রসর ছিলেন। আবার সেই দিন আসবে। তিনি রংপুরের নাগরিক সমাজের দাবির সঙ্গে একমত পোষন করে বলেন, ‘ইন্ডাষ্ট্রিয়াল হাব’ করার দাবি রাখে রংপুর। এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলের জন্য একটি মাষ্টারপ্লান নিয়ে অগ্রসর হওয়া জরুরী। এ বিভাগে ৫টি কয়লার খনি আছে। এটার সদ্বব্যবহারের মাধ্যমে গ্যাসের ঘাটতি পূরণ সম্ভব। কারণ, গ্যাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিকল্প তো কিছু করতে হবে। তিনি রংপুরবাসীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে একাট্টা থাকতে হবে। তাহলে পূরণ করতে পারবেন। তিনি বলেন, প্রায় সব মিডিয়াই ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। ইত্তেফাক এখন স্বাতন্ত্র নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ইত্তেফাক ব্যবসায়ীক হয়নি। আমরা সবার সহযোগিতা নিয়ে এই সম্মানটা যেন রাখতে পারি। তাসমিমা হোসেন বলেন, মেয়েদের স্বাবলম্বী না করা গেলে সমাজের উন্নয়ন কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছানো কঠিন। পশ্চাদপদ, অবহেলিত, সংখ্যালঘু শ্রেণীর মেয়েদেরকে কোয়ালিফাইড পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। তাদেরকে উঠে দাঁড়ানো শিখাতে হবে।
রংপুর চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, অবহেলিত রংপুরের উন্নয়ন করতে হলে রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে। তার মাধ্যমে এখানকার সমস্যা চিহ্নিত করে সঠিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ভাগ্য পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। বিকল্প কোন পথ দেখছি না। তিনি বলেন, রংপুরে এককালে কোন অভাব ছিল না। গৃহস্থ মানুষ সুখী জীবন-যাপন করতো। ফলে শিল্প, কলকারখানা, কিছুই গড়ে ওঠেনি। আর এখন রংপুরের মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে ধান লাগাচ্ছে। আমরা আমাদের উন্নয়ন চাই।
ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, দেশের সবচাইতে বেশি দারিদ্রের বসবাস রংপুর বিভাগে। এ বিভাগের উন্নয়নে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরী। তিনি বলেন, রংপুরের শতাধিক নদী এখন মৃত্যুপ্রায়। তিস্তার পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। শুস্ক মৌসুমে এভাবে পানি সরাতে থাকলে মরু করণের দিকে ধাবিত হতে পারে এই অঞ্চল। তিস্তার ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে না পারলে ৫৩টি নদীতে পানি আসবে না।
ডাঃ ইউসুফ আহমেদ বলেন, ইত্তেফাকের নাম শুনলে শরীরে এখনও কাপুনি বোধ করি। মনের কুঠায় এখনও ইত্তেফাক আছে। ইত্তেফাক আজকে রংপুরে এসে যে উদ্যোগের যাত্রা শুরু করলো তা যেন অব্যাহত থাকে। এর মাধ্যমেই আমরা অবহেলা আর বঞ্চনা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারবো। তিনি রংপুর অঞ্চলের শিল্প বিকাশে ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স ফ্রি করে দেয়ার দাবি জানান।
রংপুর চেম্বার প্রেসিডেন্ট আবুল কাশেম বলেন, রংপুর বিভাগের সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। প্রথমে স্বল্প মেয়াদী, মধ্য মেয়াদী, দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। অতঃপর তা সমাধান করার জন্য আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তিনি বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে রংপুর। এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৯০ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত করার দাবি জানাচ্ছি। বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ ৬০ কিলোমিটার রেল লাইন করলে ৭ ঘন্টায় ঢাকা যেতে পারবো আমরা। তিনি বলেন, রংপুর অঞ্চলের উন্নয়নে নর্থ বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট মন্ত্রণালয় চাই। তাহলে আমাদের কিছুটা পরিবর্তন আশা করা যায়।
এ্যাডভোকেট এমএ বাশার টিপু বলেন, আমরা এমনই দুর্ভাগ্যবান যে এ বিভাগের প্রতিটি জিনিসের জন্য আমাদের আন্দোলন করতে হয়েছে। আন্দোলনের ফসল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।
উপাধ্যক্ষ রকিবুল হাসান বুলবুল রংপুর থেকে ঢাকায় দিনের বেলায় একটি ট্রেন চালুর দাবি জানান। দিনাজপুর থেকে শিক্ষা রংপুরে আনারও দাবি জানান তিনি।
অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, লালমনিরহাটের বিমান বন্দরটি চালুর দাবি জানিয়ে বলেন, আগামী ১ হাজার বছরেও এর স্থায়িত্ব নষ্ট হবে না। তিনি বলেন, রংপুর অঞ্চলে ব্যাপক ভুট্টা চাষ হচ্ছে। তবে এই ভুট্টার ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষকরা। পাটগ্রামে চা হচ্ছে। তবে বাজারজাতকরণ বিঘ্নিত হচ্ছে। সরকার উদ্যোগ নিলে ভুট্টা চাষ এ অঞ্চলের শিল্পে পরিণত হতে পারে।
ব্যবসায়ী শফিকুল আলম ডাবলু বলেন, এই অঞ্চলের চিত্র পরিবর্তন হচ্ছে। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সুবিধা বঞ্চিতদের উন্নয়নে বর্তমান সরকার কাজ করছে। উন্নয়নে গতি এসেছে। তবে এখানে অবকাঠামো, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন জরুরী। পর্যাপ্ত বিদ্যুত প্রয়োজন।
এ্যাডভোকেট মুনীর চৌধুরী বলেন, উত্তরাঞ্চলে প্রধান সমস্যা গ্যাস নেই। গ্যাস না থাকলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখানে শ্রম সস্তা। তাহলে শিল্পায়নের সম্ভাবনা আছে।
ড. সমর্পিতা ঘোষ তানিয়া বলেন, রংপুর অঞ্চলে সর্বাক্ষিক বাল্য বিবাহের ঘটনা ঘটছে। আর বাল্য বিবাহের কারণে জরায়ুন ক্যান্সার বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে রংপুরে একটা ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানাচ্ছি।
কুড়িগ্রামের আব্রাহাম লিংকন, ৭৪ এ বাসন্তির মিথ্যা ছবি ছাপা হয়েছিল। কুড়িগ্রামে দারিদ্রের বিবর্তন হয়েছে। আগে বলা হতো, কি খেয়েছো। আর এখন বলা হয়, কি দিয়ে খেয়েছো। সীমান্ত হাটগুলো কার্যকর করা হলে চোরাচালান বন্ধ হবে।
এ্যাডভোকেট কাজী মোহাম্মদ ফারুক বলেন, গত দশকেও মঙ্গার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে রংপুরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন রংপুর নগর সভ্যতায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে। উন্নয়নের সুপানে পা রেখেছে।
সাংবাদিকদের সংবর্ধনা
এর আগে রংপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলুর নেতৃত্বে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ফুলের স্তবক দিয়ে ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেনকে সংবর্ধিত করেন।
ইত্তেফাক/এএন
