এককালের ঐতিহ্যবাহী ঘাঘরা নদী এখন দিনাজপুরের দুঃখ। অবৈধ দখলে-দুষণে এই নদী এখন নালায় পরিণত হয়েছে। শহরের সমস্ত আবর্জনা পয়ঃনিষ্কাশন পড়ছে গিয়ে ঘাঘরায়। ক্রমশঃ বিষময় হয়ে পড়েছে এই মৃতপ্রায় নদীর দুধারের পরিবেশ-প্রতিবেশ। সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা গ্রাস করছে পুরো শহরকে। উপছে উঠছে ঘাঘরার নোংরা পানি। দিনাজপুরবাসী ঘাঘরাকে দখলমুক্ত করে তার সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনার দাবি তুলে ধরেছেন।
বুধবার দৈনিক ইত্তেফাকের উদ্যোগে দিনাজপুরের এনজিও ফোরাম আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ঘাঘরা ক্যানেল সংস্কারসহ অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দিনাজপুর পৌরসভার নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে উঠে এসেছে ঘাঘরার চালচিত্র এবং দাবিমালা।
দিনাজপুরের পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তাসমিমা হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত, দিনাজপুর জেলা মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান তরিকুন বেগম লাবুন, দৈনিক উত্তরবাংলার নির্বাহী সম্পাদক জিনাত রহমান, সিডিএ নির্বাহী পরিচালক শাহ্-ই-মবিন জিননাহ, বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব শাহ্জাহান শাহ্, বিআরটিএর সহকারী পরিচালক উথোয়াইনু চৌধুরী, ডা. মো. এমদাদুল হক, জেলা ব্র্যাক প্রতিনিধি মো. মহসিন আলী, আরডিআরএস দিনাজপুরের প্রকল্প ব্যবস্থাপক তপন কুমার শাহ্, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমান্ডার মো. হবিবর রহমান, মাদকবিরোধী জোটের সাধারণ সম্পাদক মির্জা ওবায়দুর রহমান, সিডিসির নির্বাহী পরিচালক যাদব চন্দ্র রায়, অনুঘটকের নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম বাবলু, এমএন ফাউন্ডেশনের হেড অব প্রোগ্রাম আব্দুল হামিদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. সায়হান আলী, বিবিডিএসর নির্বাহী পরিচালক ডিএস এম জিল্লুর রহমান, দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক রবিন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য, দিনাজপুর জেলা স্কাউটস্-এর সম্পাদক মো. মশিহুর রহমান, এইড কুমিল্লার প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. দেলোয়ার হোসেন, এনজিও ফোরামের প্রোগ্রাম অফিসার এ এফ এম রেজাউল করিম প্রমুখ।
‘ঘাঘরা ক্যানেল সংস্কারসহ অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দিনাজপুর পৌরসভার নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক উত্তরবাংলার বার্তা সম্পাদক ও ইউনিটি ফর এনজিও’স দিনাজপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদৎ হোসেন শাহ্।
উপস্থিত ছিলেন ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশনস্-এর কার্যনির্বাহী পরিচালক মুহিবুল আহসান শাওন।
আলোচকরা বলেছেন, ভূমি দস্যুদের সর্বগ্রাসী থাবা থেকে উদ্ধার করতে হবে ঘাঘরা ক্যানেলকে। গভীর খননের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে হবে নাব্যতা। দু’ধারে ফুটপাত, বৃক্ষরাজী এবং আলোকমালায় সজ্জিত করে ট্যাম্প নদীর আদলে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। নান্দনিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এর সংস্কার নিশ্চিত হলে শহরে ফিরিয়ে আসবে নির্মল পরিবেশ। কমবে মশা, মাছি বাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। পোকা মাকড়ের উপদ্রব। বৃদ্ধি পাবে শহরের আর্থিক স্বচ্ছলতা। এ লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে শক্তিশালী ঘাঘরা কমিশন গঠন করে এর সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় ঐতিহ্যবাহী দিনাজপুরের প্রাণভোমরা ঘাঘরার মৃত্যু ঘটবে। সেই সঙ্গে এই নগরবাসীর জীবনেও নেমে আসবে দুর্ভোগের অমানিষা।
এছাড়া দিনাজপুর শহর উন্নয়ন, রাস্তা ঘাট সংস্কার, একমাত্র শিশুপার্কটি পুনঃউদ্ধার, দিনাজপুরের ইতিহাস ও কৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করতে সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণের দাবি আলোচনা উঠে আসে।
তাসমিমা হোসেন বলেন, সমাজে দুষ্ট মানুষ কম। তবে দুষ্ট মানুষরা সক্রিয় থাকে বেশি। তাই ঘাঘরা সংস্কার করে এই শহরের উন্নয়নের জন্য সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। ‘ঘাঘরা বাঁচাও’ আন্দোলনে সক্রিয় হতে হবে। তাহলে দ্রুত আপনাদের দাবি বাস্তবায়ন ঘটবে।
তিনি বলেন, ঘাঘরা নদীকে আবারও সেই সোনালী অতীতের মত পুনর্ভবা নদীর সঙ্গে সংযুক্তি ঘটাতে হবে। আপনাদের ভিশন ঠিক করে অগ্রসর হতে হবে।
তাসমিমা হোসেন ঘাঘরা নদীকে কেন্দ্র করে দিনাজপুর শহরের উন্নয়নের যে দাবি এখানকার নাগরিক সমাজ উচ্চারণ করেছে তার সঙ্গে একাত্বতা ঘোষণা করে বলেন, ‘আমি আপনাদের সঙ্গে আছি।’
দিনাজপুর পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘাঘরা এখন দিনাজপুরবাসীর জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এক ইঞ্চি বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা নেমে আসে। ঘরে ঘরে পানি থৈ থৈ করে। পৌরসভার ক্ষমতা খুবই সীমিত। আমরা চাইলেই সব কিছু করতে পারি না। স্থানীয় সরকার দ্বারাই পরিচালিত হয় পৌরসভা। আমরা চাই এই শহরটিকে অনেক সুন্দর করে গড়তে। তবে সর্বাগ্রে ঘাঘরা পুনঃসংস্কার করা জরুরি।
মেয়র বলেন, ঘাঘরা সংস্কারের জন্য ৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তা আমাদের হাত পর্যন্ত পৌঁছায়নি। আমরা এই প্রজেক্টে ২৫ কোটি টাকা চেয়েছিলাম। তা কমিয়ে ৭ কোটি টাকায় আনা হয়। শেষ পর্যন্ত নামিয়ে দেয়া হয়েছে ৩ কোটিতে। তারপরও এই অর্থ আমরা পাই কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
তরিকুন নাহার লাবু বলেন, দিনাজপুরের সৌন্দর্য্য বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ঘাঘরা নদীকে হত্যা করে পয়ঃনিষ্কাশনের নালায় পরিণত করা হয়েছে। অনেক ঐতিহ্যের ধারক পুনর্ভবা নদী দুর্দশা দেখলে বড় দুঃখ লাগে। সেখানে ভূমিদস্যুরা দখলদারিত্ব স্থাপন করে মাদকের আখরা গড়ে তুলেছে। আমরা একটি উন্নত স্বস্তিময় দিনাজপুর চাই।
শাহ্-ই-মবিন জিননাহ্ বলেন, ঘাঘরা নদী নিয়ে যা চলছে তাকে এক কথায় বলতে হবে চরম নৈরাজ্য। তার দু’পাশ দখল করে বসতি স্থাপন করা হয়েছে। এই নদীকে চিড়ে চাপটা করে সংকীর্ণ নালায় পরিণত করা হয়েছে। আজ আমাদের আর বসে থাকার অবকাশ নেই। ঘাঘরাকে যে করেই হোক উদ্ধার করতেই হবে।
শাহ্জাহান শাহ্ বলেন, দিনাজপুরের মানুষের নান্দকি দৃষ্টিভঙ্গি আছে। এখানকার মানুষ সহজসরল। এ শহরের প্রাণ ঘাঘরা মরতে বসেছে। আর আমরা কিছুই করতে পারছি না।
যাদব চন্দ্র রায় বলেন, শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনা আমাদের হাতে নেই। তাহলে আমরা কিভাবে উন্নয়ন করব। যারা আজ ঘাঘরা নদী দখল করছে, তারা এখানকারই বাসিন্দা। এদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ঘাঘরা উদ্ধারের কমিটি করতে হবে। আমরা সুন্দর একটি নগর চাই।
সায়েন আলী বলেন, ঘাঘরাকে কেন্দ্র করে দিনাজপুর শহর উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সুনির্দিষ্ট ভিশন নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।
আব্দুল হামিদ বলেন, ঘাঘরা ক্যানেল বাঁচাও নামে একটি সংগঠন করা যেতে পারে। তাহলে আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়ন দ্রুততর হবে।
জিনাত রহমান বলেন, ঘাঘরা ক্যানেল সংস্কার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এই শহরকে উন্নত করতে ঘাঘরা উদ্ধার করতে হবে।
ইত্তেফাক/ইউবি
