তৃতীয় চা অঞ্চল হিসেবে পঞ্চগড়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে চায়ের আবাদ। কিন্তু যে আশা নিয়ে ক্ষুদ্রচাষিরা চা আবাদ করেছেন তাদের সেই আশা ধূলোয় মিশে যাচ্ছে। চা পাতা তুলে বিক্রি করতে গিয়ে তারা পড়ছেন নানা বিড়ম্বনায়।
বর্তমানে পঞ্চগড়ে যে কয়েকটি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে তাদের দৈনন্দিন চাহিদার চাইতে কারখানায় বেশি পাতা আসছে। এই সুযোগে কারখানা মালিকরা কারখানায় আসা চা পাতার প্রায় অর্ধেকেরই দাম দিচ্ছেন না। অথচ মৌসুমের শুরুতে কারখানায় আনা চা পাতা থেকে কোনো কর্তন করা হবে না মর্মে চা চাষিদের আশ্বাস দেয়া হয়। সে অনুযায়ী প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য ৪ টাকা কমিয়ে ২০ টাকা করা হয়েছিল।
এ নিয়ে গত সোমবার বিকালে পঞ্চগড় জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড় থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পর্যন্ত এক কিলোমিটার মহাসড়কে পাতা ছিটিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ক্ষুদ্র চা চাষিরা। পরে তারা তাদের সমস্যার আশু সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) গোলাম আজম স্মারকলিপি গ্রহণ করেন এবং তাদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। এ সময় ক্ষুদ্র চা চাষি ও জেলা সদরের অমরখানা ইউপি চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান নুরু বলেন, চা কারখানা কর্তৃপক্ষের সিন্ডিকেটের কারণে আমরা ক্ষুদ্র চা চাষিরা পথে বসছি। অনেক টাকা লগ্নি করে আমরা চা আবাদ করেছি। কিন্তু চা কারখানাগুলো তাদের ইচ্ছেমত পাতা কিনছে। এরমধ্যে স্যালিলেন চা কারখানা পাতা নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, স্যালিলেন চা কারখানা কর্তৃপক্ষ যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অমরখানা এলাকার ক্ষুদ্র চা-চাষিদের কাঁচা চা-পাতা না নেয় তাহলে তাদের চা কারখানায় ঢোকার সকল রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হবে।
পঞ্চগড়ে বর্তমানে সাতটি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। এগুলো হলো তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি লি:বা টিটিসিএল, কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট, করতোয়া টি ফ্যাক্টরি, গ্রীন কেয়ার টি ফ্যাক্টরি, গ্রীন এনার্জি চা ফ্যাক্টরি, স্যালিলান টি ফ্যাক্টরি এবং নর্থ বেঙ্গল সেন্ট্রাল টি ফ্যাক্টরি। এর মধ্যে কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট চা কারখানা তাদের নিজস্ব উত্পাদিত পাতা দিয়েই চা প্রক্রিয়াজাত করে থাকে। বাকি ৫টি কারখানা সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে কাঁচা চা পাতা কিনছে। কিন্তু বর্তমানে যে হারে প্রতিদিন কাঁচা চা পাতা তোলা হচ্ছে ৫টি কারখানায় সেই পাতা নেয়ার সক্ষমতা নেই। প্রতিদিন বাগান থেকে উত্তোলিত চা পাতা দিতে পঞ্চগড়ে আরো ৫টি কারখানা প্রয়োজন। কারখানা কম থাকার কারণে চাষিরা নিত্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একটি কারখানা একদিন পাতা নিলে পরবর্তী ১০ দিন আর পাতা নিচ্ছে না। কারখানায় পাতা দেয়ার সিরিয়াল স্লিপ নেয়ার পর বাগান থেকে পাতা তোলার সময় তাদেরকে জানানো হচ্ছে পাতা কারখানায় না আনার জন্য।
চা চাষি মতিয়ার রহমান জানান, অধিক লাভের আশায় চা চাষ করে আমরা এখন আটকে গেছি। অনেক টাকা লগ্নি করে চা বাগান তৈরির পর পাতা বিক্রির জন্য ঘুরছি এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায়। কারখানায় আনা সব পাতা কোনো বাদ না দিয়েই কিনবে কারখানা কর্তৃপক্ষ; এমন আশ্বাসে মৌসুমের শুরু থেকেই আমরা নিজেরাই প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য ৪ টাকা কমিয়ে ২০ টাকা করে দিচ্ছি। তারপরও কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের অর্ধেক পাতাই বাদ দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, তাদের কাছে পাতা দেয়ার স্লিপ নিয়ে পাতা তোলার পর তারা জানাচ্ছে পাতা নেয়া সম্ভব না। এতে করে অনেক পাতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পঞ্চগড়ে যে হারে কাঁচা চা পাতা উত্তোলিত হয় তাতে করে কমপক্ষে ১২টি কারখানা প্রয়োজন। এর মধ্যে আমাদের পাতা নেয়ার জন্য আছে মাত্র ৫টি কারখানা। এই সুযোগ নিয়ে চা কারখানা মালিকরা তাদের ইচ্ছেমত পাতা নিয়ে চা চাষিদের বিপদে ফেলে চা শিল্পকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে। তিনি আরো বলেন, পঞ্চগড়ে সরকারিভাবে একটি বড় চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা হলে এখানে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। লাভবান হবে চা চাষিরা ।
এদিকে চা কারখানাগুলোর দাবি, চাষিরা নির্ধারিত পাতার চেয়ে বেশি পরিমাণে ডগা ও পাতা আনার কারণে ওজনে বেশি হওয়ায় কিছু পরিমাণ ওজন তাদের বাদ দিতে হচ্ছে। তাছাড়া হঠাত্ করে নিলাম মার্কেটে চায়ের দাম কমে যাওয়ায় লোকসান কমাতে তারা কম পাতা নেয়ার চেষ্টা করছেন।
চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের ঊর্ধ্বতন পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুমন শিকদার জানান, পঞ্চগড়ে চা চাষিরা কোনো কিছু না বুঝে চা আবাদ করছেন। এতে করে চায়ের গুণগত মান কমে গিয়ে নিলাম মার্কেটেও চায়ের দাম কমে যাচ্ছে। চা বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ শূন্য থাকায় চা চাষিদের সঠিকভাবে পরামর্শও দেয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া বাগান অনুযায়ী চা কারখানা কম। ফলে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি না হওয়ায় চা চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এখানে আরো ৬টি চা কারখানা প্রয়োজন। কারখানার সংখ্যা বাড়লে কৃষকরা লাভবান হবেন।
এ প্রসঙ্গে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক অমল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, চা চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এমন অভিযোগ আমি পেয়েছি। এই মৌসুমে তারা আর একবার পাতা তুলতে পারবেন। মাঝখানে কয়েকমাস বিরতি দিয়ে তারা নতুন করে পাতা তোলার পর তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। কারণ তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে চা শিল্প হুমকির মধ্যে পড়বে। চলতি বছর তেঁতুলিয়ায় চায়ের বাম্পার উত্পাদন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকদের সঠিক পরিচর্যার ফলে এই উত্পাদন হয়।
ইত্তেফাক/এএন
