ইট কাঠের খাঁচার শহর ঢাকার মধ্যে যেন এক মরূদ্যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। পৃথিবীর আহ্নিক গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সবুজ এই ক্যাম্পাসের কলাভবন, কার্জন হল, ব্যবসায় অনুষদ মাতিয়ে বেড়ায় তরুণের প্রাণ। দিন শেষে রাতেও থামে না এখানকার তারুণ্যের জয়যাত্রা।
ভোররাত পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রান্ত শোনা যায় গানের সুর। কেউবা গাইছে আধুনিক দেশি বিদেশি গান আর কারো কণ্ঠে লালন ফকির, রাধারমণ, উকিল মুনশির মাটি ছোঁয়া লোকসংগীত।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র শামীম আহমেদ দ্বিতীয় দলের। ‘ভাবো তরঙ্গে এসো আমার সঙ্গে’ ‘বন্ধু তুই আমার ভাদ্র মাসের পূর্ণিমার চাঁদ’ ‘কেন জিজ্ঞাসিলে খোদার কথা’ সহ বিভিন্ন গানে ক্যাম্পাস মাতানো শামীমকে বন্ধুরা রীতিমতো বাউল উপাধি দিয়ে দিয়েছে। একতারা হাতে শামীমের মধ্যে শহুরে বাউলের একটা প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে।
সবসময়ে ভালো ছাত্র অভিধা পেয়ে আসা শামীমের গানের জগতে আসার গল্পটা কিন্তু বেশ চমৎকার। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার একটি গ্রামে বেড়ে ওঠা শামীম ‘মসৃণ’ কণ্ঠের সুবাদে পেয়ে যান মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব। এইচএসসিতে আরো ভালো পড়াশোনার জন্য সাভার ক্যান্টনমেন্ট কলেজে চলে আসার আগ পর্যন্ত তার গলার রেওয়াজ চলেছে সুমধুর কণ্ঠে মানুষকে নামাজের জন্য আহ্বান করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগ পর্যন্ত নিজের এই গুণের বিষয়ে তার নিজেরই ধারণা ছিল না। শামীমের ভাষায়, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখতাম ছেলেরা গিটার নিয়ে আসর মাতাচ্ছে। কিন্তু নিজের বন্ধুদের মধ্যে কারো গিটার বা কোনো বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে ধারণা নেই। তাই অনেকটা বন্ধুদের আসর মাতানোর চিন্তা থেকেই সংগীত বিভাগের ছাত্র রবিউল ইসলামের কাছে একতারার দীক্ষা নেয়া।
দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার পরে বিভাগ দিবসের অনুষ্ঠানের সাইডলাইনে প্রথম গান গেয়ে দর্শক আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় শামীম। বন্ধুদের তুমুল করতালি ও উৎসাহে শামীমের মধ্যে গান নিয়ে আগ্রহ তীব্র হয়। তখন লালন, রাধারমণ, হাসন রাজা ও উকিল মুনশির গান শেখায় গভীর মনোযোগ দেয় শামীম।
আর তখন থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার ডাক আসতে থাকে। ক্যাম্পাসে শীতবস্ত্র সংগ্রহের জন্য সংগীত সন্ধ্যা হোক কিংবা বিভাগ দিবসের প্রতিযোগিতা সব জায়গায় শামীমের গান অপরিহার্য। ইউটিউবেও বন্ধুদের কল্যাণে শামীমের গান ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একতারার তালে শামীমের সুকণ্ঠ গাওয়া কোনো কোনো গানের ভিউ ছাড়িয়ে যায় ৫০ হাজারেরও বেশি।
IMG0
ক্যাম্পাসে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহচর মো: শোয়াইব বলেন, আমাদের বন্ধুমহলের আড্ডা কিংবা উদযাপনের প্রধান আকর্ষণ শামীমের গান। একই কথা সহপাঠী তাবিবুর রহমান বিপুর। বিপু বলেন, ক্যাম্পাস থেকে কোথাও ঘুরতে যাওয়া কিংবা কোনো কিছুর উদযাপনে শামীমের গান সেটিকে আরো বিশেষ করে তোলে।
শুধু সংগীতেই নয় শামীমের বহুমুখী প্রতিভার ছাপ সে রেখেছে অভিনয়, মিমিক্রি ও মূকাভিনয়ে। ২০১২ সালে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তিনটি সেগমেন্টে অংশ নিয়ে তুমুল করতালি কুড়িয়ে নেয় সে। বিশেষ করে শিক্ষকদের নকল করে করা মিমিক্রি বিভাগের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল।
IMG1
ইত্তেফাক অনলাইন থেকে আমরা জানতে চাই তার বয়সের ছেলেরা যখন আধুনিক দেশি বিদেশি গান উপভোগে ব্যস্ত তখন কোন বিষয়টা শামীমকে মাটির মানুষের গানে টেনে নিয়ে গেছে? জবাবে সে বলে, লোকসংগীতই পারে মানুষের মননের ভিতে আঘাত করতে। লালনসহ মাটির কাছের বাউলেরা মানুষের মনের গভীরের কথাটা বলে গিয়েছেন গানে গানে। তাই আমার কাছে লোকসংগীত সত্যিকারের শিল্প।
বিশ্বজুড়ে চলছে অসহিষ্ণুতার জয়জয়কার। শামীমের মতে, লালনের বহুত্ববাদিতার দর্শন এই সংস্কৃতি পরিবর্তনে ভূমিকা পালন করতে পারে। আর দশটা ছেলের মতোই স্থিতিশীল জীবনের জন্য একটা স্থিতিশীল চাকরির খোঁজে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু জীবনে সে গানকে পেছনে ফেলে যেতে চায় না। যেকোনো ভাবেই গানের সঙ্গে নিজের জীবনকে জড়িয়ে রাখাই শামীমের আকাঙ্ক্ষা।
ইত্তেফাক/এসএসএ
