রাজনীতিতে মানবতা মেধা মনন সংযোগ করেন সোহরাওয়ার্দী

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩:৫৮

গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পার্টি-জেপি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের জন্য তিনি (সোহরাওয়ার্দী) আজীবন সংগ্রাম করেছেন। রাজনীতিতে মানবতাবোধ, মেধা, মনন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সংযোগ ঘটিয়েছেন তিনি। কোনো লোভ-লালসার কাছে আত্মসমর্পণ করে তিনি কখনো আদর্শচ্যুত হননি। তার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান বক্তারা। রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ-আইডিইবি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, তিনি আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানান।

 
শ্রমিকদের নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলেন তিনি: আমির হোসেন আমু
 
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, একটি উচ্চবৃত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজনীতি শুরু করেছিলেন সাধারণ শ্রমিকদের নিয়ে। ঠেলাগাড়ির শ্রমিকদের নিয়ে তিনি প্রথম রাজনীতিতে আসেন। পাকিস্তানের পক্ষে তিনি সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ’৪৬ এর নির্বাচনে যখন মূল প্রশ্ন ছিল পাকিস্তান হবে কি হবে না, তখন পাকিস্তানের পক্ষে তার নেতৃত্বেই পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগ জয়লাভ করে। দুঃখজনক হলো, পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানসহ চারটি প্রদেশ সেদিন পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়নি। অথচ ’৪৭ এ যখন পাকিস্তান গঠিত হয় তখন ওই চারটি প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীরা স্বপদে বহাল ছিলেন, আর সোহরাওয়ার্দীকে সরিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছিল। এছাড়া বাঙলা ভাগের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দী দু’বার সংবাদ সম্মেলনেও বক্তব্য রেখেছিলেন, পাকিস্তানের সংবিধানও তৈরি হয়েছিল তার হাতেই।
 
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্য আরো বলেন, সোহরাওয়ার্দীকে বলা হতো গণতন্ত্রের মানসপুত্র। কারণ তার সকল কার্যক্রম ছিল গণতান্ত্রিক পন্থায়। গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যেই শর্তসাপেক্ষে তিনি সেসময় বগুড়ার মোহম্মদ আলীর কেবিনেটে যোগ দিয়েছিলেন। শিল্পমন্ত্রী বলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবাদর্শেই বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। আর এখন বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দেশকে সামনে এগিয়ে নিচ্ছেন।
 
তিনি কখনো লোভ-লালসার কাছে আত্মসমর্পণ
 
করেননি : আ ক ম মোজাম্মেল হক
 
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক বলেন, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে লেখা এক চিঠিতে সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন ‘আমি যদি মানুষের কোনো কাজেই না আসতে পারি, তাহলে আমার বেঁচে থেকে কী লাভ।’ বঙ্গবন্ধু ও মানিক মিয়া ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর দুই যোগ্য শীর্ষ। এই দুই রত্ন সৃষ্টির জন্য হলেও তিনি ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন। তিনি বলেন, আমরা জেনেছি- ব্যারিস্টার সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তার পরিবারের সবচেয়ে কম শিক্ষিত সদস্য, এথেকে বোঝা যায় তিনি কোন পরিবারের। মন্ত্রী আরো বলেন, সোহরাওয়ার্দী আজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, লোভ-লালসার কারণে কখনো আদর্শচ্যুত হননি। আমাদের মাঝে তার আদর্শ চির জাগরুক থাকুক, তাহলেই তার জন্ম স্বার্থক হবে।
 
সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠতাও
 
ইতিহাসের অংশ : আরেফিন সিদ্দিক
 
আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একজন মানবতাবাদী মানুষ। গণতন্ত্রের জন্য তার অবদান ছিল অসাধারণ। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি শুধু শিক্ষাই অর্জন করেননি, তিনি মানবতাবোধের শিক্ষা অর্জন করেছিলেন। যুক্তবাংলা আন্দোলন তিনিই শুরু করেছিলেন। সুদুর লেবাননে নিঃসঙ্গ অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কোন পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছিল তা নিয়েও অনেক বিতর্ক রয়েছে।
 
ঢাবি ভিসি বলেন, সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যে ঘনিষ্ঠতা সেটাও ইতিহাসের অংশ। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বিভিন্ন স্থানে সোহরাওয়ার্দীর কথা এসেছে। আরেফিন সিদ্দিক বলেন, কলকাতায় যখন জাতিগত দাঙ্গা দেখা দিয়েছিল তখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। সেই কঠিন সময়ে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধুকে সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন- বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীকে সুস্থ করে তোলো, পরে এসে রাজনীতি করো। ঠিক তখনই বেগম ফজিলাতুন্নেসা বঙ্গবন্ধুকে চিঠি লিখে বলেছিলেন ‘তোমার পরিবার আমার যত্ন নিচ্ছে, তুমি তো রাজনীতি করো মানুষের জন্য, তোমার আসতে হবে না, তুমি নির্যাতিত মানুষের সঙ্গে থাকো।’ স্ত্রীর একথা বঙ্গবন্ধু তখন সোহরাওয়ার্দীকে জানান। সোহরাওয়ার্দী তাকে বলেছিলেন ‘তুমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে এমন একজন স্ত্রী তোমার রয়েছেন।’ কাজেই সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা- তিনজনই মহান মানুষ। এ দেশ আজ যে অবস্থানে এর পেছনে বহু মানুষের বহুরকম অবদান রয়েছে। তাদের জীবনী থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করে গড়ে তুলতে হবে।
 
অবিভক্ত ভারতে বাঙালি মুসলিম নেতাদের মধ্যে
 
তিনি ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র : সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
 
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও গবেষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, অবিভক্ত ভারত ও বাংলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মুসলমানদের চেয়ে সবদিকে এগিয়ে ছিলেন। সে কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক নেতৃত্বও বিকশিত হয়েছিল। সেই তুলনায় মুসলিমদের মধ্যে তেমন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেনি। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যে কজন নেতার সৃষ্টি হয়েছিল- সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তাদের মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি বলেন, সোহরাওয়ার্দী রাজনীতিতে মেধা, মনন, সততা, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সংযোগ করেছেন।
 
অন্যরা যা বললেন
 
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেন, রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দীর হাতেখড়ি হয়েছিল শ্রমিকদের হাতে। তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য তিনি লড়াই করেছেন। তিনি ছিলেন পেশাদার রাজনীতিক। রাজনীতির মধ্য দিয়ে কীভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে পুষ্ট করতে হয় তিনি তা শিখিয়ে গেছেন। জেপির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতিতে লালসা ছিল না। তার রাজনীতি ছিল মানুষের অধিকার, স্বাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য। উঁচুতলার মানুষ হয়েও তিনি নিচুতলার মানুষের সঙ্গে মিশতেন। সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ও গবেষক সিরাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, সোহরাওয়ার্দী ছিলেন রাজনৈতিক দার্শনিক। গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত সোহরাওয়ার্দীর উপর ব্যাপক গবেষণার ব্যবস্থা করা, যেন ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি কাটে। জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহিম বলেন, আওয়ামী লীগ সৃষ্টির পেছনেও সোহরাওয়ার্দীর বড় অবদান ছিল। আলোচনা সভা পরিচালনাকারী ও জেপির নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী বলেন, বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী ও মানিক মিয়ার অবদানকে সংরক্ষণ ও তাদের উপর আরো গবেষণার জন্য একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা উচিত। আলোচনা সভায় জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচ সালাহউদ্দিন মাহমুদ, শেখ জয়নাল আবেদীন, এজাজ আহমেদ মুক্তা, নাজমুন্নাহার বেবী, ভাইস-চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, এমএ কাইয়ুম, দপ্তর সম্পাদক এম, সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
 
সোহরাওয়ার্দীর মাজারে জেপির পুষ্পস্তবক প্রদান ও ফাতেহা পাঠ
 
বিকালে আলোচনা সভার আগে সকালে জেপির পক্ষ থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাজারে পুষ্পস্তবক প্রদান ছাড়াও মাজার জিয়ারত ও ফাতেহা পাঠ করা হয়। জেপির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে এসময় উপস্থিত ছিলেন- দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মফিজুল হক বেবু, এজাজ আহমেদ মুক্তা, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন রেনু, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, এম এ কাইয়ূম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক এম সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

ইত্তেফাক/এএন