নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলীর সঙ্গে মতবিনিময়ে মেয়র পদে সাতজন প্রার্থীর পাঁচজনই সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনেরও দাবি জানান। কারো কারো অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের ‘দলবাজ’ কর্মকর্তারা গোপনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। এমন অভিযোগ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী বলেছেন ‘কারো দয়ায় আমি মেয়র হতে চাই না, আমি জনতার রায়ে বিশ্বাসী।’ আইভীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নির্বাচনের সাতদিন আগে সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি প্রশাসনের দলবাজ কর্মকর্তাদের নির্বাচনকার্য থেকে বিরত রাখার দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভার সঞ্চালক ছিলেন জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়া। নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী ছাড়াও এতে অংশ নেন রিটার্নিং অফিসার নূরুজ্জামান তালুকদার, জেলা পুলিশ সুপার মইনুল হক ও র্যাব-১১র কমান্ডার কামরুলসহ স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আওয়ামী লীগের আইভী ও বিএনপির সাখাওয়াত ছাড়াও এতে যোগ দেন অপর পাঁচ মেয়র প্রার্থী- বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, এলডিপি থেকে বহিষ্কৃত মেয়র প্রার্থী কামাল প্রধান, ইসলামী আন্দোলনের মাসুম বিল্লাহ, ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ইজহারুল হক ও কল্যাণ পার্টি থেকে বহিষ্কৃত মেয়র প্রার্থী রাশেদ ফেরদৌস। সাত মেয়র প্রার্থী এক সারিতে পাশাপাশি আসনে বসেন। আইভী ও সাখাওয়াত ছিলেন পাশাপাশি চেয়ারে বসা।
মতবিনিময়ে বিএনপির সাখাওয়াতসহ বেশিরভাগ মেয়র প্রার্থী এখনো সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি বলে অভিযোগ করেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী আইভী আচরণবিধি ভঙ্গ করছেন বলেও অভিযোগ আনেন তারা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আইভী বলেছেন, আচরণবিধির বিষয়ে তিনি অত্যন্ত সতর্ক, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। এসময় আইভী ও সাখাওয়াত কিছুক্ষণের জন্য বাহাসেও জড়ান। আর ইসি জাবেদ আলী ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে তারা বদ্ধপরিকর।
নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী আগেরদিন নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। একইদিন তিনি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও নির্বাচনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন। তবে নারায়ণগঞ্জে গত দুইদিনে তার এই সফর ও কার্যক্রম নির্বাচন কমিশন অনুমোদিত নয় বলে জানা গেছে। সূত্রের দাবি, জাবেদ আলী নিজ উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জে গেছেন।
অভিযোগের নামে পরিবেশ ঘোলাটে করার চেষ্টা: আইভী
সেলিনা হায়াত্ আইভী মতবিনিময়ে বলেন, পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হওয়া দরকার। অভিযোগের নামে অযথা পরিবেশ ঘোলাটে না করতে তিনি সবার প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, এখানে কেউ কেউ বললেন- আমি নাকি সরকারি সুযোগ-সুবিধায় প্রচার চালাচ্ছি। এটা ঠিক না। সরকারি সুযোগ-সুবিধা আমি কখনো নিইনি, এখনো নিচ্ছি না, নেবও না। কারণ কারো দয়ায় আমি মেয়র হতে চাই না। আমি জনগণের রায়ে বিশ্বাসী।
ইসিকে দুর্নাম ঘুছাতে হবে : সাখাওয়াত
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিএনপিসহ ২০ দলের মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, এই নির্বাচনটা মাইলফলক। অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য বর্তমান নির্বাচন কমিশনের উপর দেশবাসীর কোনো আস্থা নেই। নাসিক নির্বাচনেও কমিশনের ভূমিকা কি হবে, তা ভেবে নারায়ণগঞ্জবাসী শঙ্কিত। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। জনগণ ওই ধরনের নির্বাচন চায় না, কমিশনের পাশাপাশি সরকারকেও সেটা বুঝতে হবে।
অন্য মেয়র প্রার্থীরা যা বললেন
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মাহবুবুর রহমান ইসমাইল কারোর কথা উল্লেখ না করে অভিযোগ করেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন-নৌকাকে বিজয়ী করা নাকি তাদের দায়িত্ব। সব ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জানান তিনি। এলডিপির বহিষ্কৃত মেয়র প্রার্থী কামাল প্রধান বলেন, নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দরকার নেই। ইসলামী আন্দোলনের মাসুম বিল্লাহ বলেন, ভোটাররা যেন পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন-সেজন্য সেনা মোতায়েন করা দরকার। ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ইজহারুল হক ও কল্যাণ পার্টির বহিষ্কৃত মেয়র প্রার্থী রাশেদ ফেরদৌসও সেনা মোতায়েনের দাবি জানান।
মডেল নির্বাচন করতে চাই : ইসি জাবেদ আলী
বিএনপির সাখাওয়াতের অভিযোগের জবাবে নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী বলেন, এই ইসির আগে দুর্নাম ছিল, আপনারা যাই মনে করেন না কেন-যা হবার হয়ে গেছে। আর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের যে প্রসঙ্গ আনা হলো সে ব্যাপারে বলছি, কমিশন তার উপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে।
এরপর জাবেদ আলী বলেন, এই কমিশনের কোনো দুর্নাম নেই। কমিশন আজ পর্যন্ত কারো প্রতি পক্ষপাতিত্বও করেনি। কাজেই দুর্নাম আপেক্ষিক বিষয়, আর ঘুছানো তো বিরাট ব্যাপার। নাসিক নির্বাচনেও কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।
ফল বুঝে নেবেন : রিটার্নিং অফিসার
নাসিক নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার নূরুজ্জামান তালুকদার প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচনে আমরা ৪১ জন কর্মকর্তা কাজ করছি। ভয়ভীতির কারণ নেই। ২৭টি ওয়ার্ডে ২৭জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন। ভোটের দিন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। প্রার্থীদের বলব-আপনারা ১৭৪টি কেন্দ্রের ১৩০৪টি বুথেই পোলিং এজেন্ট দেবেন। ভোট শেষে কেন্দ্র ত্যাগ না করে ফল বুঝে নেবেন।
ইত্তেফাক/এএন
