বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির আগেই ২৩ বিদেশি নাগরিক ব্যাংকে প্রবেশ করেছিলেন। তারা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রিজার্ভ সার্ভার ব্যবহার করেন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এসব বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবেশের ঘটনা ঘটে। তারা ব্যাংকের সার্ভার ব্যবহার করে ধীরে ধীরে এটিকে অরক্ষিত করে ফেলেন। রিজার্ভ লুটের ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি’র তদন্ত রিপোর্টে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সার্ভারের সঙ্গে কোনো ইন্টারনেট যোগাযোগ ছিল না। হ্যাকারদের সহযোগিতা করতেই ওইসব বিদেশি নাগরিক সার্ভারে ইন্টারনেট সংযোগ দেন। এরপর সুবিধামতো হ্যাকিংয়ে রিজার্ভ সরিয়ে নিতে মাঠে নামেন। রিজার্ভ চুরি করতে তারা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহারকারী ম্যানিলার রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংককে বেছে নেন। রিজাল ব্যাংকের রিজার্ভ যেখানে ১ মিলিয়ন ডলারেরও কম, ঐ ব্যাংকের মাধ্যমে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেন। এই রিজার্ভ চুরির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তারা জেনেশুনে এবং পরিকল্পিতভাবে রিজার্ভ চুরিতে সহযোগিতা করেছেন।
সিআইডি’র অতিরিক্ত ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) মো. শাহ আলম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা বিদেশি এজেন্ট ও ভেন্ডারদের সহযোগিতায় সুরক্ষিত সার্ভার সিস্টেমকে অরক্ষিত করেছেন। দেশি-বিদেশি লোক এই ব্যাংকে ঢুকেছেন। বিদেশি এজেন্টদের এক্টিভিটিসের সঙ্গে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এক্টিভিটিস এক হওয়ার পরই রিজার্ভ চুরি করা সম্ভব হয়েছে। তারা ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সার্ভার সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের ম্যানিলার রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের জুপিটার শাখায় একটি ভুয়া একাউন্টের মাধ্যমে রিজার্ভের টাকা স্থানান্তর করেন।
সিআইডি’র তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি করতে প্রথমে যোগাযোগ করা হয় এই ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের সহযোগিতায় সুরক্ষার পদ্ধতিকে ধাপে ধাপে অরক্ষিত করা হয়েছে। রিজার্ভ সার্ভারে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তারাই এই কাজটি করেছেন। রিজার্ভ সার্ভার নিয়ন্ত্রণের প্রধান কম্পিউটারে তারা ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েছেন জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। ৩১ জানুয়ারি রিজার্ভ সার্ভার তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। নিয়ন্ত্রণের খবরটি হ্যাকাররা নিশ্চিত হওয়ার পর অর্থ সরানোর কাজে নেমে পড়েন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ কর্মকর্তা জড়িত।
পরে সিআইডির ডিআইজি সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মির্জা আব্দুল্লাহেল বাকী ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হানুল ইসলাম ফিলিপাইনে গিয়ে ঐ দেশের অর্থনৈতিক অপরাধ সংক্রান্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক করেন। টিমটি রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথাও বলেন। ফিলিপাইনের এই তদন্ত রিপোর্টে সিআইডি উল্লেখ করেছে, রিজাল ব্যাংক জুপিটার শাখার ম্যানেজারের সম্মতি নিয়েই ১ ফেব্রুয়ারি ঐ ভূয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে শর্ত ছিল যে যা টাকা ডিজবার্সমেন্ট (প্রদান) হবে, তার ১৫ ভাগ টাকা পাবে ব্যাংক। বাকি ৮৫ ভাগ টাকা হ্যাকারদের কাছে চলে যাবে। রিজাল ব্যাংক থেকে টাকা ম্যানিলার একটি ক্যাসিনোতে পাঠানো হয়। ঘটনার দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ক্যাসিনোতে হ্যাকাররা জয়ী হয়ে সব টাকা নিয়ে যায়। হ্যাকারদের জয়ী হওয়ার বিষয়টিও ছিল পূর্বপরিকল্পিত। কারণ প্রতিদিন যে জুয়ার আসর বসে সেখানে কেউ জেতে আবার কেউ হারে। কিন্তু ২৩ ফেব্রুয়ারি জুয়ার আসরে একতরফাভাবে জয়ী হয়ে পুরো ডলার হ্যাকারদের হাতে চলে যায়। হ্যাকাররা টাকা চুরি করতে আগে থেকেই ক্যাসিনো ঠিক করে রেখেছিল।
সিআইডির অ্যাডিশনাল ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) মো. শাহ আলম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এর দায় কখনোই ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক এড়াতে পারে না। কারণ চোর চুরি করবে। তাই বলে কি চুরি হওয়া জিনিস উদ্ধার হবে না?
গত ২৬ নভেম্বর আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অ্যাটর্নি জেনারেল ও একজন সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ফিলিপাইন সফর করেন।
এ সফরের সময় বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সেদেশের শীর্ষ আইন কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে সহায়তা চেয়েছেন। সফর শেষে আইনমন্ত্রী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে অগ্রগতি জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘১৫ মিলিয়ন ডলার আমরা আগেই পেয়েছি। ২৯ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফ্রিজ করা আছে। সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের রায় পেলেই আমরা এই ২৯ মিলিয়ন ডলার ফেরত পাব। এটি পেতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমরা ফিলিপাইন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।’
২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম হ্যাক করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে হ্যাকাররা ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চুরি করে ফিলিপাইনে অর্থ পাঠিয়ে দেয়। এ ছাড়াও ২০ মিলিয়ন চুরি করে পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কায় যা ফেরত পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি চলতি বছরের মে মাসে প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে তা এখনো প্রকাশ করেনি সরকার।
ইত্তেফাক/আরএ
