বিজয়ের মাসে নৌকার বিজয় দেখছেন আইভী, ফখরুলের ‘ভবিষ্যত্’ হিসাব

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩:৪৩

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে ভোটারদের তুষ্ট করতে শুধু গণসংযোগেই সীমাবদ্ধ নেই মেয়র পদে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী ও অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। সামাজিক অনুষ্ঠানেও যোগ দিচ্ছেন তারা। করছেন উঠোন বৈঠকও। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার সাবেক-বর্তমান খেলোয়াড়দের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছেন আওয়ামী লীগের আইভী, এসময় তিনি বলেছেন ‘বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের ২২ তারিখে হতে যাওয়া নাসিক নির্বাচনে নৌকার বিজয় হবে।’ আর ধানের শীষের প্রার্থী সাখাওয়াতের পক্ষে গতকাল প্রচারণায় নেমেছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক ফাঁকে সাংবাদিকদের ফখরুল বললেন ‘নাসিক নির্বাচন কেমন সুষ্ঠু হয় সেটির উপর নির্ভর করছে আগামী জাতীয় নির্বাচনের ভবিষ্যত্।’

 
আইভী-সাখাওয়াত পুরো নাসিক এলাকা চষে বেড়ালেও তত্পরতা নেই অপর পাঁচ মেয়র প্রার্থীর। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মেয়র প্রার্থী মাহাবুবুর রহমান ইসমাইল ও ইসলামী আন্দোলনের মাসুম বিল্লাহর পক্ষে মাঝে-মধ্যে মাইকিং হচ্ছে। তবে এলডিপির বহিষ্কৃত প্রার্থী কামাল প্রধান প্রার্থী আছেন কেবল কাগজে-কলমে, মাঠে তার দেখা মিলছে না। একই অবস্থা কল্যাণ পার্টির বহিষ্কৃত মেয়র প্রার্থী রাশেদ ফেরদৌস ও ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ইজহারুল হকেরও। নাসিক এলাকা ঘুরে এই পাঁচ প্রার্থীর হাতে গোনা কয়েকটি পোস্টার অবশ্য চোখে পড়েছে। এদিকে, নারায়ণগঞ্জ জাকের পার্টি গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে আইভীর হাতে ফুলের নৌকা তুলে দিয়ে তাকে দলীয়ভাবে সমর্থন জানিয়েছে।
 
খেলোয়াড়দের সঙ্গে আইভীর মতবিনিময়
 
গতকাল দুপুরে চাষাঢ়ায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের মেয়র প্রার্থী আইভী। এসময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সেনা মোতায়েন করা না-করা নির্বাচন কমিশনের ব্যাপার। ইসি প্রয়োজন মনে করলে শুধু সেনাবাহিনী কেন, আরও কোনো বাহিনীও নিয়োগ দিতে পারে। সেনা নিয়োগ আমার ব্যাপার না। আমি চাই নির্বাচন সুষ্ঠু হোক। ইসিকে বলেছি আমি কারও কোনো ফেভার চাই না। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন ‘আপনারা মিডিয়ার লোক। নারায়ণগঞ্জে এসে আপনারাই বুঝতে পারছেন কেমন পরিবেশ। উত্সবমুখর পরিবেশে সবাই নৌকায় ভোট দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। জনগণ আমার সঙ্গে আছে। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।’
 
সেনা মোতায়েনের কথা বারবার সামনে এনে গণমাধ্যমকর্মীরা ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করে আইভী বলেন ‘নারায়ণগঞ্জের এই নির্বাচনটাকে আপনারা বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন। গত নির্বাচনে যখন সেনাবাহিনী দেয়নি, তখন আমি বলেছিলাম-জনতাই আমার সেনাবাহিনী। তাহলে গণমাধ্যম কেন বারবার সেনাবাহিনীর কথা তুলে নির্বাচনটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে? দয়া করে বিতর্কের সৃষ্টি করবেন না। এখানে শান্তিপূর্ণ ও উত্সবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হচ্ছে। প্রার্থীরা সহাবস্থানে থেকে কথা বলছেন। আমরা মিলেমিশে মিছিল-মিটিং করছি। আমার পাশ দিয়েই তো বিএনপির মিছিল যাচ্ছে। কোথাও তো এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। নারায়ণগঞ্জের কোনো ভোটার কী আপনাদের কাছে শঙ্কার কথা বলেছে? কাউকে বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে? অথবা কোনো ভোটার কী অভিযোগ করেছে তারা ভোট দিতে যেতে শঙ্কায় আছেন?’ দয়া করে আপনারা বিভেদ তৈরি করবেন না।’
 
আইভী আশা করে বলেন, ‘২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নির্বাচনে জনগণ যেভাবে আমাকে ভোট দিয়ে পাস করিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিল, এই বিজয়ের মাসেও সেভাবে নৌকা মার্কায় ভোট দেবে।’
 
‘চুনকা পাঠাগার’ চালু করতে না পারা নিয়ে বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনের মন্তব্য প্রসঙ্গে আইভী বলেন, ‘টেকনিক্যাল কারণে পাঠাগারটি বন্ধ রয়েছে। খোলার জন্য কাজ চলছে।’ আপনি চাইলে শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচনী প্রচারণায় নামতে রাজি-এমন প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, ‘আমি আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাইকে বলতে চাই সামান্য নির্বাচনের জন্য ওনার সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। আমি আশা করি এমপি হিসেবে তিনি মানুষের জন্য কাজ করবেন।’ শামীম ওসমানের সমর্থন নির্বাচনে আপনার পক্ষে কোনো প্রভাব ফেলবে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন ‘আমরা গত ১২ বছর ধরে একসাথে কাজ করছি। অবশ্যই নির্বাচনের ফলাফলে এর প্রভাব পড়বে।’
 
মতবিনিময়কালে আইভীর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি বাদল রায়, আবাহনী ক্রীড়া চক্রের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ, জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন চুন্নু, জাকির হোসেন, জোবায়ের নিপু প্রমুখ। পরে জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা আইভীর পক্ষে গণসংযোগ করে নৌকায় ভোট চান।
 
শামীমের শাড়ি পরে আইভীর প্রচারণা
 
শামীম ওসমানের উপহার দেয়া ‘নৌকা’ খচিত শাড়ি পরে গতকাল সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করেন আইভী। এসময় তিনি একাধিক উঠোন বৈঠক ছাড়াও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েও বৈঠক করেন। উল্লেখ্য, শুক্রবার বিকালে শামীম ওসমানের সংবাদ সম্মেলনের পর ওইদিন রাতেই নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে আইভী গেলে সেখানে তার হাতে শামীমের পাঠানো দুইটি শাড়ি তুলে দেন নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আনোয়ার হোসেন। এসময় আইভী বলেন ‘শাড়ি পেয়ে আমি খুশিই হয়েছি। উপহার পাঠানোর জন্য বড় ভাই শামীম ওসমানকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।’
 
সাখাওয়াতের পক্ষে প্রচারণায় ফখরুল
 
বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনের পক্ষে গতকাল নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন স্থানে প্রচারণা চালিয়ে ধানের শীষে ভোট চেয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এসময় সাংবাদিকদের কাছে ফখরুল বলেন ‘নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হয়, সেটির উপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ নির্বাচন। জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও অবস্থানের ফলে বাংলাদেশের জনগণ বিজয়ী হবে এবং আগামী দিনগুলোতে অবশ্যই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।’
 
নাসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন পর নগরীতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাঙাভাব দেখা গেল। ফখরুলের আগমনকে কেন্দ্র করে ২০১৪ সালের এপ্রিলের পর বিএনপির সবচেয়ে বড় জমায়েত লক্ষ্য করা যায় গতকাল। দুই বছর আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জে আসার পর, গতকালই বিএনপির বড় জমায়েত দেখা যায়। ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শাহ্ আলম ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুজ্জামানও অনুসারীদের নিয়ে এ জমায়েতে যোগ দেন। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু ও ২০ দলীয় জোটের মহাসচিব পর্যায়ের কয়েকজন নেতাও উপস্থিত ছিলেন।
 
বেলা ১১টার দিকে শহরের ডিআইটি বাণিজ্যিক এলাকায় সাখাওয়াতের পক্ষে প্রচার শুরু করেন মির্জা ফখরুল। এসময় তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, গত ৫ বছর ধরে এদেশে জনগণের মানবাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। হত্যা, গুম ও খুন করা হয়েছে। বেআইনিভাবে গ্রেফতার করে মিথ্যা মামলা দিয়েছে সরকার। শুধু বিরোধী দল নয়, সকল পর্যায়ের মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। এসময় তিনি ভোটারদের কাছে লিফলেট বিতরণ করেন।
 
ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে কেউ নিরাপদ না। এ সরকার গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, ভোটের অধিকার হরণ করেছে। মানুষ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত। সে কারণে এ নির্বাচনের (নাসিক) উপর অনেককিছু নির্ভর করছে। এ নির্বাচনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মানুষ তাদের ভোটের অধিকার ফিরে পেতে চায়, গুম-খুনের বিরুদ্ধে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ, এটাই আমার প্রত্যাশা। ধানের শীষে ভোট দিলে গণতন্ত্রের অধিকার আদায় হবে।
 
নাসিক নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেয়া প্রসঙ্গে দলটির মহাসচিব বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জনগণের কাছে যাব বলে নাসিক নির্বাচনকে আমরা বেছে নিয়েছি। পরে মির্জা ফখরুল দল-জোটের প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়কের ২ নম্বর রেলগেট, উকিলপাড়া এলাকায় গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করেন এবং ধানের শীষে ভোট চান।

ইত্তেফাক/এএন