পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি গতকাল শনিবার রাতে বাগেরহাটের রামপালে নির্মাণাধীন তাপ বিদ্যুেকন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় তার সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য তালুকদার আব্দুল খালেক ও প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ ইউনুছ আলীসহ বন বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর মন্ত্রীকে বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানির প্রতিনিধিরা এই বিদ্যুেকন্দ্র এবং পরিবেশ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় অবহিত করেন।
পরিবেশ মন্ত্রী এ বিদ্যুেকন্দ্রে উত্পাদিত বিদ্যুত্ পুরোপুরি বাংলাদেশে ব্যবহূত হবে কিনা, কেন্দ্রটি সুন্দরবনের উপর কোনো পরিবেশগত বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে কিনা, এখান থেকে নিঃসৃত দূষিত পানি পার্শ্ববর্তী পশুর নদীতে ফেলা হবে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চান। জবাবে মন্ত্রীকে জানানো হয়, উত্পাদিত সম্পূর্ণ বিদ্যুত্ই বাংলাদেশে ব্যবহূত হবে এবং সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না। তাছাড়া দূষিত ও গরম পানি নদীতে ফেলা হবে না। তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্রের বর্জ্য ও ফ্লাই অ্যাশের সুব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা হবে।
মন্ত্রীকে আরো জানানো হয় যে, এই কেন্দ্র এবং আশেপাশে ৫ লাখ বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে বনায়ন সৃষ্টির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তাছাড়া এখানে নারিকেল গাছও লাগানো হবে। যে স্থানে তাপ বিদ্যুেকন্দ্রটি নির্মাণাধীন সেখানকার মাটি ছিল কর্দমাক্ত, এলাকার জনবসতি ছিল খুবই কম এবং চিংড়ি ঘেরবহুল। মন্ত্রী এ সময় আরো জানতে পারেন কেন্দ্রের অবকাঠামোগত নির্মাণ রাস্তা ও নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। এ কেন্দ্রে কয়লা আমদানি পদ্ধতি পুরোপুরি নিরাপদ এবং ব্যবহূত পানি রিসাইকেলিং করে বাগানসহ বিভিন্ন কাজে লাগানো হবে। এই জন্য সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়েছে। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের ডিজিএম প্রতীক শ্রী বাস্তভা, ডিজিএম নবেন্দু লোধ ও এজিএম অরুণ চৌধুরী মন্ত্রীকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা দেন। এ সময় বন বিভাগের বাগেরহাটের ডিএফও মোল্যা রেজাউল করিম ও সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও মোঃ সাইদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
বৃক্ষ ও বন জরিপ কার্যক্রম উদ্বোধন
এদিকে সুন্দরবনে উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সারাদেশে দ্বিতীয় বারের মত বৃক্ষ ও বনজরিপ-২০১৬ শুরু হয়েছে। এ জরিপের আওতায় সারাদেশের প্রায় এক হাজার ৮৫৮ স্থানে এ জরিপ কাজ চালানো হবে। প্রথম বছরে সুন্দরবন ও দেশের উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকায় এ জরিপ কাজ করা হবে। পরের বছর দেশের অন্যান্য স্থানে এ কাজ চলবে। গতকাল দুপুরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রধান অতিথি হিসেবে সুন্দরবনের হারবাড়িয়া ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রের কাছে পর্যটন জাহাজ এমভি টাঙ্গুয়ার হাওরে অনুষ্ঠিত এ জরিপ কাজের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী বক্তৃতায় মন্ত্রী বলেন, এ জরিপ দেশের সরকারি বন ও গ্রামীণ বনের উন্নয়ন, ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের উদ্যোগকে ভবিষ্যত্ পরিকল্পনায় সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তার দিক নির্দেশনা দিবে। পাশাপাশি সরকার তথা বন বিভাগ বনের অবক্ষয় রোধ এবং বন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন বাস্তবমুখী যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সেখানে বিশেষ অবদান রাখবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে বনের অবক্ষয়, বন উন্নয়ন এবং বন সংরক্ষণের বিভিন্ন পদক্ষেপ মূল্যায়নের জন্য বন জরিপ করা আশু প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ ইউনুছ আলী। এ সময় বক্তব্য রাখেন বিশেষ অতিথি বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য তালুকদার আব্দুল খালেক, বিশেষ অতিথি খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার ফারুক হোসেন, ইউএসএআইডি’র প্রতিনিধি, উপ বন সংরক্ষক জহীর ইকবাল, এফএও চীফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার ও ইউএসএআইডি’র প্রতিনিধি মেথিউ হেনরি, খুলনার বন সংরক্ষক জহির উদ্দীন আহমেদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফাসহ সুন্দরবন অঞ্চলের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বন বিভাগের কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। বনজ সম্পদের সুরক্ষা, সর্বোত্তম ব্যবহার সুনিশ্চিত, বনের আচ্ছাদন বৃদ্ধি এবং বন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এ জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের বন অধিদপ্তর এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তাদের সহযোগিতা করছে স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিসংস্থা (এফএও), ইউএসএআইডি এবং সিলভাকার্বন। আগামী ২০১৮ সালে এ জরিপ কাজ শেষ হবে। এটিই প্রথম পরিপূর্ণ দেশের বনজসম্পদ জরিপ বা গবেষণা কার্যক্রম। এর আগে ২০০৫ সালে সারাদেশে এ ধরনের জরিপ কাজ চালানো হয়। তবে সেটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ কাজ ছিল না।
জরিপ কার্যক্রমের সদস্য খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক প্রফেসর ড. নাজমুস সাদাত এ সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এই বনজ সম্পদ জরিপ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন দাতাসংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বন বিভাগ। এই গবেষণার মাধ্যমে আমাদের প্রকৃত বনজ সম্পদ কতটুকু আছে সেটা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, এই গবেষণায় সারা দেশের গ্রামীণ বনজসম্পদের পরিমাণও জানা যাবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রকিবুল হাসান সিদ্দিকী বলেন, এই জরিপ কার্যক্রমের প্রধান তিনটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, বনজসম্পদ চিহ্নিতকরণ, পাঁচ বছর পরে আবার গবেষণা করে দেখা বনে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে এবং এই পরিবর্তনে কি কি প্রভাব কাজ করেছে। এ ছাড়া কার্বন কতটুকু আছে। মেথিউ হেনরি বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বনজসম্পদ জরিপ কাজ সম্পন্ন করা হবে।
মোঃ ইউনুছ আলী বলেন, আমরা সমন্বিতভাবে বনজসম্পদ জরিপ কাজ শুরু করেছি। জরিপের মাধ্যমে আমাদের কি পরিমাণ বন ও কাঠ আছে তা জানা যাবে। এ ছাড়া কার্বন নির্ণয় করা গেলে আমরা বলতে পারবো-বাংলাদেশে কি পরিমাণ কার্বন মজুদ আছে। এর আগে ২০০৫ সালে সারাদেশে এবং ২০০৯-১০ সালে শুধুমাত্র সুন্দরবনে জরিপ করা হয়েছিল। মংলাবন্দর সংলগ্ন সুন্দরবনের পাশে পশুর নদীর তীরে বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, এই শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এখনো এ ধরনের কোনো জরিপ কাজ করা হয়নি। তবে জরিপ কাজ করা গেলে কোন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান কি ধরনের বর্জ্য নদীতে নিঃসরণ করছে এবং তাতে কি ধরনের ক্ষতি হচ্ছে তা জানা যাবে।
পুলিশ লাইন্স ইকোপার্ক নির্মাণ কাজ উদ্বোধন
পিরোজপুর অফিস জানায়, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু শনিবার দুপুরে পিরোজপুর জেলা পুলিশ লাইন্স ইকোপার্কের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। তিনি এ সময় বলেন, এলাকার উন্নয়নের জন্য সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। স্থানীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসন একযোগে কাজ করতে পারলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। জেলা পর্যায় থেকে প্রস্তাবনা পাঠালে কেন্দ্র থেকে কাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম গ্রহণ সহজসাধ্য হয়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনীর অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সময় তারা এদেশের মানুষের জন্য কঠিন দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ পুলিশের ব্যবহার্য সরঞ্জামাদি খুবই অপ্রতুল। টহল কাজসহ কর্তব্য পালনে নিরাপদ যানবাহন থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে দেশ-বিদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির উপকরণ থাকলে পুলিশের জন্য কাজ করা সময়োপযোগী হবে। মন্ত্রী আরও বলেন, পিরোজপুর ছিল একটি দ্বীপাঞ্চল। বলেশ্বর সেতুসহ নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গত দু বছরে এ এলাকার ব্যাপক পরিবর্তন করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। যার ফলে এ এলাকার জনজীবনে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মো. ওয়ালিদ হোসেনের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন বাগেরহাটের সামাজিক বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোল্যা রেজাউল করিম।
ইত্তেফাক/এএন
