জীবিতকে মৃত ঘোষণা, নাম খারিজে লাখ টাকা ঘুষ!

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:৪২

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা সেবার মান নিয়ে ভয়াবহ অভিযোগ ওঠেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের গণশুনানিতে। এমনকি এই সরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে গণশুনানিতে বেশি অভিযোগ উঠেছে উপজেলা ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে। এখানে জমির নাম খারিজের জন্য প্রায় লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন একজন ভুক্তভোগী।

গতকাল শনিবার উপজেলা চত্বরে দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ক এই গণশুনানির উদ্বোধন করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড.নাসির উদ্দিন আহমেদ। গণশুনানিতে লিখিতভাবে ও উপস্থিত থেকে অভিযোগকারীরা সোনারগাঁও উপজেলা ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে ১৮টি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে ১২, উপজেলা বিদ্যুত্ সমিতি অফিসের বিরুদ্ধে ১১, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে ৮ এবং উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগ করেন। অভিযোগগুলোর ওপর শুনানি শেষে এগুলো আগামী ১৫ দিন থেকে ১ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির আহবান জানিয়েছে দুদক।

হাসপাতালের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ:গণশুনানিতে স্থানীয় লায়ন মোশারফ হোসেন অভিযোগ করে জানান, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত দুইজনকে তিনি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক দুইজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। পরে তিনি লাশ দুটি দাফনের ব্যবস্থা নেন। কিন্তু গোসল দিতে গিয়ে দেখেন একজন জীবিত রয়েছেন। তখন তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। ওই রোগী এখন দিব্যি ভালো আছেন।

এই অভিযোগের জবাবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. তানভীর আহমেদ চৌধুরী জানান, তখন তিনি ছিলেন না। এরপর রজ্জব আলী নামের একজন অভিযোগ করে জানান, গত ৮ বছর যাবত্ হাসপাতালের এক্সরে মেশিনটি অকেজো করে রাখা হয়েছে। এ সুযোগ নিয়ে চিকিত্সকরা রোগীদের পাশের ক্লিনিকে রেফার্ড করেন। এ অভিযোগের ব্যাপারে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, এক্সরে মেশিনটি নষ্ট রয়েছে। আগামি এক মাসের মধ্যে সেটা পুনরায় চালু করার ব্যবস্থা নেয়া হবে। অপরদিকে স্থানীয় কাউন্সিলর জাহানারা আক্তার অভিযোগ করে জানান, হাসপাতালটিতে নিয়মিতভাবে ডাক্তার আসেন না, সরকারি ওষুধের সরবরাহ থাকে না, গাইনি ডাক্তার নাই, অ্যাম্বুলেস অকেজো করে রাখা হয়। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।

ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ: আব্দুল লতিফ নামের এক ব্যক্তি ভুমি অফিসের দুর্নীতির ব্যাপারে অভিযোগ করে বলেন, তার ৮ শতাংশ জমির নাম খারিজের জন্য নায়েব আব্দুর রব তার কাছে ৮০ হাজার টাকারও বেশি ঘুষ দাবি করেছেন। মনির হোসেন নামে একজন জানান, সার্ভেয়ারকে ঘুষ না দেয়ার কারণে তার ‘মিস কেস’ চার বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এ কারণে তাকে ৩৫ বার হাজিরা দিতে হয়েছে। তোফাজ্জল হোসেন নামে একজন অভিযোগ করে জানান, ভূমি অফিসের প্রধান সহকারী মোতালেব তার নথির কাজগপত্র টাকার বিনিময়ে সরিয়ে ফেলেছেন। আহসান হাবিব নামে একজন জানান, দেওয়ানী মামলা থাকা সত্ত্বেও তার জমি ভুয়া দলিলের মাধ্যমে অবৈধভাবে অন্যের নামে খারিজ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি এসিল্যান্ড অফিসে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাননি।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারি কমিশনার রুবায়েত হায়াত শিপলু আগামী ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেবেন বলে দুদক কর্মকর্তাদের জানান ।

‘সেবা না দিলে বাড়ি চলে যান’: গণশুনানির উদ্বোধনী বক্তব্যে দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন বলেন, সরকারি অফিসগুলো দুর্নীতির আখড়া হয়ে গেছে। সরকারি চাকরি করলে জনগণের সেবা করতে হবে। তা না করলে কর্মকর্তাদের বাড়ি চলে যাওয়া উচিত। শুনানি শেষে তিনি আরো বলেন, সরকারি অফিসগুলোর ব্যাপারে জনগণের কেন এত অভিযোগ থাকবে? আমরা কোনো ধরনের দুর্নীতি মেনে নেব না। যেকোনো দুর্নীতির তথ্য আমাদের হাতে আসলে আমরা সরাসরি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিব। আর সরকারি কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতি করলে যাতে তার চাকরি না থাকে সে ব্যবস্থা করবে দুদক। প্রয়োজনে তাকে জেলের ভাত খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হবে। এসময় তিনি সরকারি অফিসগুলোতে প্রতি সপ্তাহে গণশুনানির আয়োজন করার আহবান জানান।

অনুষ্ঠানে দুদকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও উপজেলা শিক্ষা অফিসার আ ফ ম জাহিদ ইকবাল, পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির ডিজিএম মো.গোলাম মোস্তফা, সাব রেজিস্ট্রার আবু তাহের ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।