বিজয়ের আনন্দ নিয়ে ঢাকায় ফিরেই শোকের ধাক্কা

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ০৯:৫৯
২৬ মার্চের পরের সেই দিনগুলিতে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমরা। কিন্তু পাকিস্তানের সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর তুলনায় আমাদের সেই প্রতিরোধ যে অপ্রতুল তা বুঝিনি। তাই ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা রেডিওতে শোনার পর যে যুদ্ধ শুরু হলো, তখন আমাদের যুদ্ধের প্রস্তুতি পাকিস্তানি বাহিনীর সামনে ভেঙে পড়তে সময় লাগেনি। শহরের প্রতিরোধ ভেঙে পড়লেও সেসময় গ্রামের মানুষের প্রতিরোধ টিকে ছিল বেশ কিছুদিন পর্যন্ত। আমাদের পিছু হটে যেতে হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এটাও শিখিয়েছে—অস্ত্রের চেয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার শক্তি অনেক তীব্র। ২৭ মার্চের দিকে আমরা কেরানিগঞ্জ চলে যাই। সেখানে ট্রেনিং শুরু হয়। সে খবর পেয়েই পহেলা এপ্রিল গভীর রাতে জিঞ্জিরা, কেরানিগঞ্জ এসব এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালায়। এমন বীভত্স গণহত্যা আমি কখনো দেখিনি। ধানক্ষেতে হাজার হাজার মানুষকে বুলেট স্প্রে করে মেরে ফেলা হয়। গান পাউডার ছিটিয়ে মানুষের গায়ে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দিতে দেখেছি। পুড়িয়ে দিয়েছিল শত শত বাড়ি-ঘর, গ্রাম। নারীদের ওপর অত্যাচার করেছে এবং আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে মানুষের শরীরে, জীবন্ত মানুষের শরীরে। এটি এমনই এক ভয়াবহ দৃশ্য যে আমার চোখে এখনো তা ভাসে। এ রকম ভয়াবহ দৃশ্য আমি আর জীবনে দেখিনি।
 
আমরা আগস্ট মাসে ঢাকায় প্রবেশ করি। আমাদের দায়িত্ব পড়ে ঢাকার উত্তর অংশে। মানিক হলো কমান্ডার, আমি সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। আমাদের বেইজ ক্যাম্প বা আস্তানা তৈরি করি রৌহাই, ধামরাইতে। আমাদের কাজ ঢাকার আশপাশের ব্রিজগুলো ভেঙে দেওয়া। ঢাকার উপকণ্ঠে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে মুভমেন্টগুলো আছে তা বন্ধ করতে হবে। আর সেই সঙ্গে ঢাকা শহরের ভেতরে ঢুকে হিট অ্যান্ড রান করতে হবে।
 
তখন হাবিবুল আলম, ফতেহ আলি, চাষী জিয়া, চুন্নু ভাই-এরা সবাই অপারেশন করছে। ঢাকা শহরে বেশ ভালো ভালো অপারেশন হয়েছে তখন। শেরাটন হোটেলের অপারেশনটা হয়েছে। ফার্মগেট অপারেশন হয়েছে। এখন উত্তর দিক থেকে চাপ দেওয়ার ভাবনা খালেদ মোশাররফের মাথায় এসেছে। উনি ঢাকাকে সব দিক থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছিলেন।
 
১৯৭১ সালে ঢাকা অপারেশনের কথা মনে হলে অনেক স্মৃতির মাঝে আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তত্কালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান কার্যালয়ের ট্রান্সমিশন সেন্টার উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। সেই ঘটনা পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। এর কারণ ছিল, পাকিস্তান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান কার্যালয়টি ছিল তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান গভর্নর হাউস বা এখনকার বঙ্গভবনের খুব কাছে। আজকের যেটা রাজউক ভবন আর সেদিনের ডিআইটি ভবনেই ছিল পাকিস্তান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান সম্প্রচার কেন্দ্র। যে গভর্নর হাউসে বসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা রাও ফরমান আলি, নিয়াজি বৈঠক করতেন, যেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাম আজম এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গ রাজাকার-আলবদররা এসে বৈঠক করত, তার ৩০ গজের ভেতর এত বড় একটি বিস্ফোরণের পর পাকিস্তানি বাহিনী বুঝে গিয়েছিল, তাদের নিরাপত্তাব্যুহ আর সুরক্ষিত নেই।
 
এ অপারেশনে মূল দায়িত্ব পালন করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলী। তিনি তখন পাকিস্তান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান কার্যালয়েই কাজ করতেন। আমরা পরিকল্পনা করলাম টেলিভিশন কেন্দ্রের ট্রান্সমিশন সেন্টার, টাওয়ার এবং নিচে যেখানে টেপ চালানো হয়, সেগুলো উড়িয়ে দেবো। সমস্যা হলো, হামলা চালাতে হলে ভেতরে এক্সপ্লোসিভ নিতে হবে। সে কাজটিও মাহবুব আলীই করেছিলেন। তিনি তখন প্রতিদিন একটু একটু করে এক্সপ্লোসিভ ভেতরে নিয়ে যেতেন। প্রতিদিন আড়াই আউন্স করে হালুয়ার মতো দেখতে এ এক্সপ্লোসিভ তিনি নিতেন টিফিন ক্যারিয়ার ও জুতার মধ্যে করে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, এক্সপ্লোসিভসহ ডেটোনেটর সব নিয়ে যাওয়া শেষ হলে একটা দিন ঠিক করা হবে চূড়ান্ত অপারেশনের জন্য। অপারেশনের দিন আমরা আউটার স্টেডিয়ামের কাছে অবস্থান নিয়ে গানফায়ার করব। ভেতরে অপারেশন হবে। এর মধ্যেই একদিন মাহবুব আলী আমাদের নয়াপল্টনের গোপন অবস্থান কেন্দ্রে এসে জানালেন, পাকিস্তান বাহিনী সম্ভবত অপারেশন পরিকল্পনার ব্যাপারে কিছু টের পেয়েছে। হঠাত্ তারা পুরো ভবনে সার্চ করছে। তখন অক্টোবর মাস। সম্ভবত ২৩ অক্টোবর হবে। আমি বললাম, আর দেরি করা যাবে না। আজই অপারেশন শেষ করতে হবে। ভেতরে যেমন অবস্থায় এক্সপ্লোসিভ রাখা আছে, তেমন অবস্থাতেই অপারেশন করতে হবে। মাহবুব আলীকে ডেটোনেটর দেওয়া হলো। আরও যা যা প্রয়োজন তা মোটামুটিভাবে দেওয়া হলো। তবে বারবার বলে দেওয়া হলো, খুব সাবধানে করতে হবে সবকিছু। ধরা পড়া যাবে না।
 
মাহবুব আলী অসীম সাহসের সঙ্গে আবার ফিরে গেলেন ডিআইটি ভবনে টেলিভিশন সম্প্রচার কেন্দ্রে। পাঁচতলায় একটা আলমারির ভেতরে কাগজের নিচে এর আগে প্রতিদিন নিয়ে যাওয়া এক্সপ্লোসিভ তিনি জড়ো করে রেখেছিলেন। সেই এক্সপ্লোসিভ নিয়ে ডেটোনেটর যুক্ত করে মাহবুব আলী খুব সফলভাবে পাকিস্তানিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত নিচে নেমে এসেছিলেন। ভবনের বাইরে তিনি যখন এলেন তার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ।
 
ভবনের ভেতরে যেখানে মূল বিস্ফোরণটা ঘটেছিল, সেখানে সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। টাওয়ারের অংশ একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। এখন যে ঘড়িটা দেখা যায়, রাজউক ভবনের সে ঘড়িটাও অচল হয়ে গেল। জানালার কাচ ভেঙে আশপাশে পড়ে গেল।
 
ঢাকায় আসলে অন্যান্য অঞ্চলের মতো সম্মুখ সমর হয়নি। ঢাকায় হয়েছে গেরিলা আক্রমণ। মে-জুন মাস থেকেই এ হামলা ধারাবাহিকভাবে হয়েছে। মূলত নভেম্বর পর্যন্তই ছিল গেরিলা অপারেশন। ঢাকা পড়েছিল ২নং সেক্টরে। এ সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। এ সেক্টরকে আবার বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল। এসব অঞ্চলের জন্য আবার একজন করে অধিনায়ক ছিলেন। আমি ছিলাম ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনীতে। ১৪ নভেম্বর ভায়াডুবির ব্রিজের যুদ্ধে আমাদের অধিনায়ক মানিক শহীদ হন। তিনি শহীদ হওয়ার পর সেকেন্ড-ইন কমান্ড হিসেবে আমি স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হই। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই বিভিন্ন অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে ঢাকা অবরুদ্ধ করে ফেলেন। আমি ছিলাম সাভারে। ১২ ডিসেম্বর আমরা মিরপুর ব্রিজ পর্যন্ত এলাকা দখলে নিয়ে নিই। তখনও মিত্রবাহিনী এসে পৌঁছায়নি। ১৩ ডিসেম্বর পাঞ্জাব ৩৩ রেজিমেন্টের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট আমাদের কাছে পরাজিত হয়। প্রায় ২৪৮ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়।
 
এ যুদ্ধের পর আমরা যখন আবার সবকিছু রি-অর্গানাইজ করছিলাম, তখন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর এক অফিসার আমার কাছে এলেন। তিনি বললেন, ‘তুমি কি ঢাকা নর্থের কমান্ডার?’ আমি আমার পরিচয় দিলে অফিসার বললেন, জেনারেল নাগরা এসেছেন। আমি সেদিন জেনারেল নাগরাকে বারবার বলছিলাম ঢাকায় ঢুকে পড়তে। জেনারেল নাগরা বললেন, না, ঢোকা যাবে না। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, ঢুকতে গেলে অনেক বিপদ হতে পারে। তোমাদের অনেক লোক মারা যেতে পারে। তার চেয়েও বড় বিপদ হতে পারে, ঢাকার সাধারণ মানুষকে পাকিস্তানিরা মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি খুবই ভয়ংকর হতে পারে। অতএব, আরেকটু ধৈর্য ধরো। একটা নেগোসিয়েশন চলছে সারেন্ডারের জন্য। পাকিস্তানি বাহিনী টুডে অর টুমরো সারেন্ডার করতে পারে। অনেক কষ্ট করেছ, এখন একটু ধৈর্য ধরো।
 
১৬ ডিসেম্বর নিয়াজি আত্মসমর্পণ করার পর আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম। বিজয়ের আনন্দ নিয়ে ঢাকায় আসার মুহূর্তেই একটা বড় শোকের ধাক্কা আমাদের হতবাক করে দিল। বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিত্সকদের কেউ হত্যা করতে পারে সেদিনের বধ্যভূমি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
 
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা মনে হলে সে-সময় সাধারণ মানুষের ভালোবাসার দিনগুলোর কথাও মনে পড়ে যায়। সাভার থেকে নানা ছদ্মবেশে ঢাকায় আসতাম। রিকশাওয়ালারা, ঠেলাওয়ালারা আমাদের মিরপুর ব্রিজ পার করে দিত নিজেরা ঝুঁকি নিয়ে। মিরপুর ব্রিজ পার হয়ে আমরা আমাদের গোপন অবস্থানে চলে যেতাম। সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ সবাই আমাদের আশ্রয় দিত, বিপদে আড়াল করে রাখত। এমন অনেক দিন গেছে, আত্মগোপনের জন্য হোটেলবয়দের সঙ্গে তাদের রুমে ঘুমিয়েছি। যতভাবে সম্ভব তারা আমাদের সহায়তা করত। সেই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও সেই দিনগুলো হয়ে যেত অন্যরকম ভালোবাসার দিন।