'বাংলাদেশের সঙ্গে ৭১ সালে যা হয়েছে তাই হচ্ছে বেলুচিস্তানে'

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৮:১৯
বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সৈন্যরা যা করেছে তা গত ৭০ বছর ধরে বেলুচিস্তানের সঙ্গে হচ্ছে বলে জানালেন অঞ্চলটির 'মুকুটহীন রাজা' বলে খ্যাত 'দ্য খান অব খালত' এইচ এইচ আমির আহমেদ সুলেমান দাউদ। বিজয় দিবসের দিন হোটেল সোনারগাঁওয়ে ইত্তেফাককে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
 
এ সময় তিনি আরো বলেন, ৭০ সালের নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানেও শেষ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অধিক আসন লাভ করেছিল আওয়ামী লীগ। কেননা বেলুচিস্তান তাকে সমর্থন করেছিল।
 
বেলুচিস্তানের বর্তমান এই রাজা পাকিস্তান থেকে পালিয়ে লন্ডনে বসবাস করছেন। তিনি জানান, পাকিস্তান বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়ার অঙ্গীকার করেছিল ব্রিটিশ সরকারের কাছে। কিন্তু পরবর্তীতে বন্দুকের নলের সামনে বেলুচিস্তানের তৎকালীন রাজা, আমার দাদার কাছ থেকে কাগজে স্বাক্ষর নেয় এবং এরপর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে অত্যাচার চালাচ্ছে পাকিস্তানের সৈন্যরা।
IMG0
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের সময় কাশ্মিরের মতই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা ছিল বেলুচিস্তানের। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল বেলুচিস্তান। ১৯৪৭ সালে ৮ আগস্ট তারা স্বাধীন হয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের সৈন্যরা কাশ্মিরে আক্রমণ চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর সেই সৈন্যরা আক্রমণ চালায় বেলুচিস্তানে এবং এই অঞ্চলকে নিজেদের প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে।
 
'দ্য খান অব খালত' বলেন, আমাদের থেকে জোর করে এই ভূখ- ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। যা কখনই মেনে নেয়নি বেলুচিস্তানের নাগরিকেরা। আর সে কারণেই পাকিস্তান সরকারের বিপক্ষে তারা একাধিকবার স্বাধীনতা আন্দোলন চালায়। ১৯৪৮ সালে বর্তমান পাকিস্তান এই প্রদেশের পার্লামেন্টে আলোচনায় বলা হয়, এক ধর্মের জন্য আমরা আমাদের ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ঐতিহ্য সবকিছু বিসর্জন দিতে পারি না। কিন্তু পাকিস্তান বেলুচিস্তান অস্ত্রের জোরে দখল করে নেয় এবং জোর করে উর্দু ভাষা আরোপ করে। এখনও তা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান।
 
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালে প্রথম আন্দোলন শুরু করে বেলুচিস্তান। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে, ১৯৬৩ সালে এবং ১৯৭১ সালে আবারো তীব্র আন্দোলন চালানো হয়। কিন্তু প্রতিবার পাকিস্তান সরকার ওয়াদা করে, বেলুচিস্তানকে সার্বভৌমত্ব দেয়া হবে। তারা কুরআন শরিফ ছুঁয়ে এই শপথ করে। কিন্তু যখন বেলুচিস্তানের বিপ্লবীরা আত্মসমর্পণ করে, তখন তাদের বন্দি করে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, না হলে আজীবন কারাদ- দেয়া হয় বলে জানান আমির আহমেদ সুলেমান। তিনি বলেন পঞ্চমবারের মত আমরা এই আন্দোলন শুরু করেছি। পাকিস্তান সরকার নানা প্রলোভনে আমাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা বারবার ওয়াদা ভঙ্গ করেছে, করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
IMG1
এ সময় বেশ দুঃখ করে তিনি জানান, ১৯৭১ সালে ১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। গত ৭০ বছর যাবৎ এই কাজ চলছে বেলুচিস্তানে। সেখানে পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচার থেকে একজন স্কুলের শিক্ষিকাও বাঁচতে পারছে না। ডাক্তার, অধ্যাপক, লেখক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সকল শ্রেণীর মানুষ, যারা বেলুচিস্তানের এই গণহত্যা নিয়ে আওয়াজ তুলতে চায়, তাদের গুম করে ফেলা হচ্ছে।
 
এ সময় মনির মেঙ্গুল নামে তার সাথে থাকা অপর এক বেলুচিস্তানের নাগরিক জানান, প্রায় ২৬ হাজার মানুষ আমার অঞ্চলে নিখোঁজ রয়েছে। আমি নিজে দুই বছরের জন্য নিখোঁজ ছিলাম। আমাকে মাটি থেকে ২৫ ফুট নিচের সেনাবাহিনীর টর্চার সেলে রাখা হয়েছিল। খুব বীভৎস ছিল সময়টা। ফ্রান্স সরকারের সহায়তায় আমি সেখান থেকে মুক্তি পাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার অধিকাংশ বেলুচিস্তানের ভাই এই স্থান থেকে বের হতে পারে না। তাদেরকে এই টর্চার সেলে ঢুকিয়ে অত্যাচার করা হয়, হত্যা করা হয় এবং এক সময় লাশ কোন স্থানে ফেলে দেয়া হয়। পুলিশ লাশ পাওয়া গেছে বলে জানায়। কিন্তু এই হত্যার কোন বিচার নেই।
 
এ সময় বেলুচিস্তানের এই রাজা বলেন, পাকিস্তানে দুই ধরণের সৈন্য আছে। এক ইউনিফর্ম পরা সৈন্য এবং আরেকটি ইউনিফর্ম ছাড়া সৈন্য। পাকিস্তানি সৈন্য সরাসরি হত্যা করতে না পারলে এই ইউনিফর্ম ছাড়া সৈন্যদের প্রেরণ করে। পৃথিবী তাদের বিভিন্ন নামে চেনে। কখনও তারা লস্কর-ই-ওমর, কখনও তাহরিকে পাকিস্তান। কিন্তু বেলুচিস্তানের তাদের সবার কাজ একটি। আর তা হল, শোষণ।
 
এ সময় বেলুচিস্তানের নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাকিস্তান সেনা বাহিনী সর্বদা পছন্দের প্রার্থীকে এখানে বিজয়ী করে। ভোট নিশ্চিতভাবেই হয় এখানে। কিন্তু ভোট কেন্দ্রে মাত্র ৫ শতাংশ ভোটার উপস্থিত থাকে। কিছু কিছু কেন্দ্রে ১ শতাংশ ভোটারও উপস্থিত থাকেন। আমাদের বেলুচিস্তানের চিফ মিনিস্টার মাত্র ৫০০ ভোট পেয়ে পাশ করারও নথি আছে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন। এখানে সাধারণ মানুষের মতামতের কোন মূল্য নেই।
 
২০০৬ সাল থেকে আবারো বেলুচিস্তানের নতুন করে শুরু হয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলন। এবার আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তরুণরা। এ প্রসঙ্গে বেলুচিস্তানের নাগরিক ও ফ্রান্স ভিত্তিক এনজিও তে কর্মরত মনির মেঙ্গুল বলেন, এখন স্মার্ট ফোনের যুগে আপনি চাইলেই সত্যকে গোপন করতে পারবেন না। বেলুচিস্তানে যেই গণহত্যা ও গুম চালানো হচ্ছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে, তা চাইলেই আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না।
 
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের হিসেব অনুসারে বিশ্বে সাংবাদিকদের জন্য সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর একটি বেলুচিস্তান। সেখানে ২৬ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। মনির জানান, এই অঞ্চলে পাকিস্তানের স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
 
ডন পত্রিকার একটি কলামে বলা হয়, বেলুচিস্তান থেকে কোন সাংবাদিকের জীবিত ফেরত আসাটাই এক ধরণের বিজয়। বেলুচিস্তান নিয়ে কাজ করা পাকিস্তানের সাংবাদিক হামিদ মিরকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয় এ বছরের মার্চ মাসে। তিনি কোন মতে বেঁচে যান এই আক্রমণের পর। এ ছাড়াও বেলুচিস্তানের জন্য কলম ধরায় মারা গেছেন আরো অনেক সাংবাদিক। বেলুচিস্তানের ভাষায় দুবাই ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করায় আটক করা হয়েছিল মনির মেঙ্গুলকে।
 
বেলুচিস্তানের রাজা এইচ এইচ আমির আহমেদ সুলেমান দাউদ বলেন, আমরা বাংলাদেশের প্রশংসা না করে পারছি না। তারা আমাদের এই দেশে আসার অনুমতি দিয়েছে এবং সেমিনার করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সরকার যদি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ না নিত আমরা কখনও এটা করতে পারতাম না। আমার অনুরোধ, বাংলাদেশ যেন পাকিস্তানে চলা এই গণহত্যার বিরোধিতা করে বিশ্ব দরবারে। সকলের কাছে আমার অনুরোধ নৈতিকভাবে, রাজনৈতিক ভাবে, কূটনৈতিকভাবে বা কলম ধরে, যেভাবে সম্ভব আমাদের সাহায্য করুন। পাকিস্তান ১৯৫২ সালে আপনাদের ওপর যেই অত্যাচার করেছিল, তা থেকে ১৯৭১ সালে আপনারা স্বাধীন হয়েছেন। কিন্তু গত ৭০ বছর ধরে আমার নাগরিকেরা অত্যাচারিত অবহেলিত। তাদের ভাষা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। এই গণহত্যার বিরুদ্ধে আপনারা অবস্থান নিন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে আমরা আপনাদের পক্ষে ছিলাম, আপনাদের জাতীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে কাজ করেছি আমরা। এখন আপনাদের দায়িত্ব আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবার।
 
ইত্তেফাক/আরএ