তারুণ্যের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে কৃষি

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২:৩৯
ছিল পরিত্যক্ত জমি। ছোট-বড় পাহাড়ের টিলা। ঝোঁপ-ঝাড়ে ঘেরা ছোট ছোট গজারির বন। চালচে রঙের মাটিতে এসিডের(অম্ল) পরিমানও বেশি। সব ধরনের ফসল ভালো হয় না। কেউ ভাবেনি এমন পরিত্যক্ত জমিতে চাষ করা যাবে, এখানেও সোনা ফলবে। কৃষি পাগল বাবুল মিয়ার উদ্যোগ পাল্টে দিয়েছে সব দৃশ্য। 
 
ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার উথুরা ইউনিয়নের হাতিবেড় গ্রামটি ছোট-বড় টিলা-টালায় ঢাকা। নিচু জমিতে ধানের চাষ হলেও টিলার উপরে ঝোঁপ-ঝাড়ে ঘেরা গজারির বন। ওই গ্রামের এক টগবগে তরুন বাবুল মিয়া। পড়ছেন টঙ্গী সরকারি কলেজের তৃতীয় বর্ষে। সমবয়সী তরুনরা যখন মরিয়া হয়ে চাকুরী খুঁজছেন, কেউবা জমি-জমা বিক্রি করে বিদেশ পাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন এই তরুণ দেখলেন এক ভিন্ন স্বপ্ন। কিভাবে পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগিয়ে সামলম্বি হওয়া যায়। 
 
তখনও কৃষি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা নেই বাবুল মিয়ার। চাষ পদ্ধতি কিভাবে হবে, কোথায় ভালো বীজ মিলবে, কিভাবে এই পরিত্যক্ত জমি চাষের আওতায় এনে স্বাবলম্বি হওয়া যাবে-এমনসব নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে এই তরুনের মাথায়। 
 
পরামর্শ নিলের স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার কাছে। ভালো বীজের জন্য আলাপ করলেন স্থানীয় বীজ বিক্রেতার কাছে। সবার সাথে পরামর্শ শেষে সবজী চাষে আগ্রহী হন। 
 
প্রথমেই পরিত্যক্ত ১০ একর জমি চাষের আওতায় নিয়ে আসেন। এজন্য তাকে বেশ খাটুনি খাটতে হয়েছে। খরচও হয়েছে বেশি। বাবুল মিয়া বলেন, ১০ একর পরিত্যক্ত জমি চাষের উপযোগী করে লাউ চাষ করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। তবে এরই মধ্যে ১০ লাখ টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। আরো দুই মাস লাউ বিক্রি করতে পারবেন যা থেকে আরো ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করেন তিনি।  
জমি চাষের উপযোগী করে তুলতে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে ধলোচুন ব্যবহার করেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজ আজম বলেন, এই এলাকার মাটিতে এসিডের পরিমান বেশি। তাই সব ধরনের ফসল ভালো হয় না। তবে ধলোচুন ব্যবহার করলে মাটির এসিডিটি কমে। তখন মাটি সবজি চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে।    
 
স্থানীয় বীজ বিক্রেতা মো. আলাল মিয়ার কাছ থেকে গেটকো এগ্রো ভিশন লিমিটেড এর ‘মম’ জাতের বীজ সংগ্রহ করেন। নিজেই চারা তৈরী করেন। তরুন উদ্যোগক্তা বাবুল বলেন, ফসলের ভালো উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে বীজের উপর। ভালো বীজ, ভালো জাত নির্ধারণ করতে পারলে উৎপাদন বেশি হয়। ‘মম’ জাতের বীজটি নিয়ে বেশি লাভবান হয়েছি। কারণ একদিকে যেমন এর উৎপাদন বেশি অন্যদিকে রোগ-বালাইয়ের আক্রমন কম হয়। চাষ করতে গিয়ে কোন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়নি। ফ্রুট ফ্লাই এর আক্রমন থেকে বাঁচাতে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে ‘সেক্স ফেরোমেন ট্রাপ’ ব্যবহার করেছি।
¯œাতক পড়–য়া এ শিক্ষার্থী এখন নিজেই উদ্যোক্তা। নিজ ক্ষেতের পরিচর্যা করতে প্রতিদিন দশ জন লোক খাটান তিনি। ক্ষেত থেকে দিনে প্রায় ৫৫০ টি লাউ তোলেন। স্থানীয় বাজারে তুললে প্রতিটি লাউ পাইকরি বাজারে ২৭ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। 
 
ঢাকায় বাজার ভালো থাকলে অনেক সময় পাইকাররা আগাম অর্ডার দিয়ে রাখেন। লাউ সংগ্রহ করতে অনেক সময় পাইকাররা বাবুলের ক্ষেতেই চলে আসে। এলাকার লোকজনদের কাছেও বাবুলের লাউয়ের চাহিদা ভালো। কারণ, খেতেও স্বুসাদু। তাই লাউ বিক্রিতে কোন ধরনের অসুবিধায় পড়তে হয় না বাবুলকে। তবে অসুবিধা একটাই। সেচের সমস্যা। বিদুৎতের ব্যবস্থা না থাকার কারণে ডিজেল পুড়ে সেচ দিতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যায়, জানান বাবুল।
 
এলাকার সব বয়সীদের কাছে বাবুল মিয়া এখন হাতিবেড় গ্রামের মডেল। লাউ চাষে তার সাফল্য এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অনেক বেকার যুবকরা এখন বাবুলকে অনুসরন করতে শুরু করেছেন। তারা বাবুলের কাছে আসছেন, তার সফলতার গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। 
 
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইসহাক আহম্মেদ বলেন, বাবুল চ্যালেঞ্জ নিয়ে সফল হয়েছে। গ্রামের বেকার যুবকরা বাবুলকে অনুসরণ করলে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে অন্যদিকে তরুনদের হাত ধরে দেশটাও পাল্টে যাবে।
 
তরুণদের চোখে বাবুল এক সাহসী উদ্যোক্তা। কৃষি কাজ করতে এসে নানা কথা শুনতে হয়েছে তাকে। বাবুল বলেন, আমাদের সমাজে অধিকাংশ  অভিভাবকরা চান না তাদের সন্তান লেখা-পড়া শিখে ক্ষেতে খামারে চাষ করুক। গ্রামের বেশিরভাগ অভিভাবকরা চান, সন্তান লেখা-পড়া শিখে শহরে গিয়ে চাকরি করুক। আমার মত অনেক তরুনের ইচ্ছা ও সাহস থাকলেও সামাজিক এ প্রতিবন্ধকতায় পিছিয়ে পরতে হয়। 
বাবুলের ভাষায়, কৃষি প্রধান দেশটাকে কৃষির মাধ্যমেও পাল্টে দেয়া যায়। পরের ভরসায় না থেকে নিজে কিছু করতে চাইলে, সব প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। দেখবেন, একদিন সাফল্য আসবেই।   
 
বাবুলের শুরুটা খুব সহজ ছিল না। অর্নাস পড়ুয়া এই শিক্ষার্থী হাতে তখনও একটি আধুলি নেই। শুরুটা কিভাবে হবে তাও জানা নেই তার। তবে পরিবারের সাথে পরামর্শ করে সাপোর্ট পেয়েছেন। জমি বিক্রি করে ৪ লাখ টাকা জোগালেন। বাকি ৪ লাখ স্থানীয় এনজিও থেকে সংগ্রহ করে শুরু করেন যাত্রা। 
 
এই তরুণ আরো বলেন, শুরুতে অনেক ধার-দেনা হয়ে গেছিলাম। তবে লাভের মুখ দেখে সাহস বেড়েছে। আশা করি, এ বছরই ধার-দেনা শোধ করে দিতে পারবো। তবে স্বল্পসুদে ঋন পেলে আগামী বছর আরো বড় পরিসরে জায়গা নিয়ে চাষ করতে পারবো। সুযোগ-সুবিধা পেলে আমার মত আরো অনেক তরুন কৃষিতে ভালো কিছু দেখাতে পারবে। 
বাবুলকে এ কাজে সহযোগিতা করেছে উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা। 
 
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, বাবুল মিয়াকে চাষের কাজে আমরা সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করেছি। এখানকার মাটিতে অম্লের পরিমান বেশি থাকায় সব ফসল ভালো হয় না। তবে লাউ চাষের জন্য এ মাটি উপযোগী। কিভাবে মাটি তৈরি করতে হবে, মাটি কিভাবে রোগ মুক্ত করতে হবে, গাছের খাদ্য কি হবে, কখন সেচ দিতে হবে, রোগ দেখা দিলে কখন কি করতে হবে-এসব বিষয়ে বাবুল মিয়া আমাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছেন। 
 
গেটকো এগ্রো ভিশন লিমিটেড এর চীফ অপারেটিং অফিসার মোঃ আব্দুস সামাদ মন্ডল বলেন, ‘মম’ জাতের বীজটি আমাদের নিজস্ব গবেষণার ফসল। এর প্রধান গুণ হল, প্রতি গিঁটে গিঁটে ফল ধরে। ফলে উৎপাদন বেশি হয়। এছাড়া এ জাতের লাউ সারা বছর চাষ করা যায়। খেতেও সুস্বাদু। সারাদেশে কৃষকরা এ জাতের বীজটি চাষ করে লাভবান হয়েছেন।