রাজধানীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। হাতিরঝিলে সার্ভিস শুরু করেছে ওয়াটার ট্যাক্সি। দীর্ঘদিন পর ঢাকার ভিতরের জলপথে ঢেউ তুলেছে নৌযান। এ নৌ-সেবা একদিকে স্থানীয় জনগণের যোগাযোগকে সহজ ও আনন্দময় করে তুলছে, অন্যদিকে বিনোদনেরও নতুন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ঢাকার খালগুলো উদ্ধার ও জলপথ ব্যবহার পুনরায় শুরু করতে দীর্ঘদিনের নাগরিক আকাঙ্ক্ষা ও দাবির প্রতিফলনও ঘটতে শুরু করেছে এ ওয়াটার ট্যাক্সিসেবা চালুর মধ্য দিয়ে।
রাজধানীতে বিনোদনের এক নতুন আশা হয়ে তৈরি হযেছিল হাতিরঝিল। এ আনন্দে খাদ ছিল নিস্তরঙ্গ ঝিলের পানি। সেই দৃশ্যপটও পাল্টে গেছে। নিস্তরঙ্গ ঝিলের পানি ছলকে উঠছে। পানির বুক চিরে ছুটে চলেছে ওয়াটার ট্যাক্সি। রাজধানীর অন্যতম এই বিনোদন কেন্দ্রটিতে ওয়াটার ট্যাক্সি নবমাত্রা দিয়েছে। এই যানে চড়ে কেউ যাচ্ছেন গুলশান, রামপুরা, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেটের পথে। আবার অনেকে এটিকে বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ওয়াটার ট্যাক্সি শিহরণ তুলছে ভ্রমণকারীদের মনে।
হাতিরঝিলে এতদিন সড়ক বেষ্টনী ধরে ঝিলটির চারপাশে ঘুরে বেড়ানো যেত। গত ১৬ ডিসেম্বর চালু হয়েছে ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস। ভ্রমণ করা যাচ্ছে ঝিলের পানিতেও। বিনোদনপ্রেমীদের ভিড় বাড়ছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। যাত্রীদের উত্সাহ দেখে কর্তৃপক্ষ জানুয়ারি মাসে আরো ৫টি ওয়াটার ট্যাক্সি নামানোর ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে হাতিরঝিলের দ্বীপে ঝর্ণা তৈরি করা হবে। তখন বাজনার তালে তালে নানা রংয়ের আলো ও পানির নাচন দেখতে পাবেন ঝিলে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীরা। শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধের কারণে যে হাতিরঝিল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন ঢাকাবাসী, এখন সেই ঝিলেই উপচেপড়া ভিড়। খুশির ঝিলিক। সে অবস্থায় ২০০৭ সালে সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু হয় এর উন্নয়ন। ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাতিরঝিল প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এর পরেই ঢাকাবাসীর জীবনে যোগ হয় এই দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো।
চার বছরে হাতিরঝিলের সড়কপাড়ের গাছগাছালি বড় হয়ে উঠেছে। বাড়ছে বিনোদন স্পট হিসেবে হাতিরঝিলের আকর্ষণ। কয়েক মাস আগে ঝিলের এক প্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত ঘুরে ঘুরে দেখার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস নামানো হয়েছে।
হাতিরঝিল সমন্বিত প্রকল্পের পরিচালক ও রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জামাল আক্তার ভুঁইয়া ইত্তেফাককে বলেন, হাতিরঝিলে আসা বিনোদনপ্রেমীদের জন্য নতুন মাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে ওয়াটার ট্যাক্সি। যাত্রীদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আগামী জানুয়ারি মাসে আরো ৫টি ওয়াটার ট্যাক্সি নামানো হবে। উদ্বোধনী দিনে ৪টি ওয়াটার ট্যাক্সি চালু করা হয়েছে। চাহিদা বাড়লে এর সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, আপাতত হাতিরঝিল থেকে দুটি রুটে চলবে ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা। মেরুল বাড্ডা থেকে মগবাজার সাতরাস্তা পর্যন্ত রুটে ভাড়া ২৫ টাকা এবং এফডিসির সামনে থেকে গুলশান-১ পর্যন্ত রুটের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ টাকা। প্রতিটি ওয়াটার ট্যাক্সির যাত্রী ধারণক্ষমতা ২০ থেকে ২৫ জন। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই ট্যাক্সি চলবে।
রাজউকের চেয়ারম্যান বজলুল করিম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, বিনোদনের পাশাপাশি যানজটমুক্ত রাস্তা তৈরি করা রাজউকের প্রধান উদ্দেশ্য। ওয়াটার ট্যাক্সি ছাড়াও হাতিরঝিলের দ্বীপে ঝর্ণা তৈরি করা হচ্ছে। প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় ডিসেম্বরে এটা চালু করা যাচ্ছে না। আশা করছি ফেব্রুয়ারি মাসে এটি চালু করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া গুলশান-নিকেতন মুক্তমঞ্চ নির্মাণের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এ মঞ্চের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে এখানে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবেন প্রায় দুই হাজার দর্শক।
তিনি জানান, হাতির ঝিলকে ঘিরে আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। মুক্তমঞ্চের কাছে দশতলা বিশিষ্ট আধুনিক গাড়ি পার্কিং ভবন নির্মাণ করা হবে। এ ভবনে থাকবে একটি সম্মেলন কেন্দ্র যেখানে লোকজন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবেন। আরও থাকবে হাতিরঝিল পরিচালনা অফিস, জাদুঘর ও রেস্টুরেন্ট। রাজউকের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
