কুমিল্লায় ৭ম শ্রেণির স্কুলছাত্র আবু তাহের ওরফে হূদয়কে অপহরণের পর হত্যার পর লাশ বস্তাবন্দী করে তিতাস নদীতে ফেলে দেয়াসহ ওই কিলিং মিশনে পাঁচ জন ঘাতক অংশ নিয়েছে। হত্যার পর মোবাইল ফোনে তার পরিবারের নিকট ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবিসহ এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি ও থানা পুলিশের নিকট চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে গ্রেফতারকৃত চার ঘাতক। ঘাতকদের দেখানোমতে তিতাস ও মেঘনা নদীতে দু’দিন ধরে ডুবুরীদের একাধিক দল অভিযান চালিয়েও গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হূদয়ের লাশের সন্ধান পায়নি। গ্রেফতারকৃত চার ঘাতককে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদানের জন্য মঙ্গলবার কুমিল্লার আদালতে প্রেরণ করেছে পুলিশ। এদিকে লাশের অপেক্ষায় হূদয়ের স্বজনসহ হাজারো উত্সুক জনতা মঙ্গলবারও নদীপাড়ে ভিড় জমান। হূদয় জেলার তিতাস উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের মধ্য আকালিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী বশির আহমেদ বাচ্চু মিয়ার একমাত্র ছেলে এবং বাতাকান্দি উচ্চবিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্র।
২১ ডিসেম্বর বিকালে ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য স্কুলছাত্র হূদয়কে তার ফুপাতো বোনের ছেলে মাহিন বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে সে আর বাড়ি ফিরে আসেনি। পরদিন বৃহস্পতিবার বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে এবং এলাকায় মাইকিং করেও কোথাও না পেয়ে হতাশ হন হূদয়ের পরিবারের লোকজন। হূদয়ের বাবা বশির আহমেদ বাচ্চু জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে একটি মোবাইল ফোন থেকে ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, আপনার ছেলে অপহরণ হয়েছে। আমাদের হেফাজতে রয়েছে। ২০ লাখ টাকা দিলে আমরা তাকে ছেড়ে দেব। অন্যথায় হূদয়ের লাশ পাবেন। একথা বলে ফোনটি কেটে দেয়। এরপর রাতে আরো একবার ফোন করে আমার নিকট জানতে চাওয়া হয়- টাকা জোগাড় হয়েছে কি-না? জবাবে বলেছি, কিভাবে কোথায় টাকা পাঠাতে হবে? এরপর অপহরণকারীরা পরে জানান হবে বলে লাইনটি কেটে দিয়ে আর কোনো ফোন করেনি। নিরুপায় হয়ে বিষয়টি তিতাস থানা পুলিশকে জানাই। শুক্রবার সকালে সন্দেহভাজন হিসেবে মধ্য আকালিয়া গ্রামের মতিন বেপারীর ছেলে মোহাম্মদ আলী ওরফে সিলভার মো. আলীকে আটক করে পুলিশ। আটকের ২দিন পর একই গ্রামের বর্তমান মেম্বার রেনু মিয়াকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে রেনু মিয়া তার ছেলে রিয়াদকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়ে নিজে বেরিয়ে আসেন। এরপর একই গ্রামের নজরুলের ছেলে মাহিন ও কালাই গোবিন্দপুরের জাকিরের ছেলে সাকিবকে আটক করে সিআইডি ও তিতাস থানা পুলিশ।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলী আশ্রাফ জানান, গ্রেফতারকৃতরা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, হূদয়ের কিলিং মিশনে অংশ নিয়েছিল পাঁচ সন্ত্রাসী। তারা হচ্ছে- মোহাম্মদ আলী, রিয়াদ, মাহিন, আল আমিন ও সোহেল। অপহরণের পরই তারা হূদয়কে হত্যা করেছে। এদের মধ্যে গ্রেফতারকৃত রিয়াদ ও মাহিন হূদয়ের দু’হাত ধরে রাখে এবং মোহাম্মদ আলী নাক-মুখ চেপে ধরলে রাতের অন্ধকারে ওই খেলার মাঠেই হূদয় মারা যায়। এসময় পাহারার দায়িত্বে ছিল সন্ত্রাসী সোহেল ও অস্ত্র মামলায় জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে আসা আল-আমিন। পরে হূদয়ের লাশ একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভর্তি করে শক্ত করে মুখ বন্ধ করা হয়। এরপর সিএনজিযোগে হোমনা-বাঞ্ছারামপুর সড়কের সংযোগ সেতুর (হোমনা ব্রিজ) উপর নিয়ে তিতাস নদীতে লাশটি নিক্ষেপ করা হয়। হূদয়কে হত্যার পর সন্ত্রাসীরা সাকিবের মোবাইল ফোন দিয়ে তার পরিবারের নিকট ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল।
অপহরণকারীদের এমন লোমহর্ষক বর্ণনার ভিত্তিতে সোমবার থেকে নিহত হূদয়ের লাশ উদ্ধার অভিযানে নামে পুলিশের একাধিক টিম। সোমবার ও গতকাল মঙ্গলবার চারটি ট্রলারসহ স্থানীয় ডুবুরীরা তিনটি মাছ ধরার বড় জাল নিয়ে এবং চাঁদপুর থেকে আসা ডুবুরীদের একটি দল তিতাস ও মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরো জানান, তিতাস নদীর যেখানে লাশটি ফেলা হয় সেখান থেকে খরস্রোতা মেঘনা নদীর দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। তাঁর ধারণা, প্রবল স্রোতে লাশটি মেঘনার গহীন জলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া প্লাস্টিকের বস্তায় শক্ত করে মুখ বন্ধ করার কারণে লাশ ফুলে ভেসে ওঠার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। বিকাল ৫টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত লাশের সন্ধান পাওয়া যায়নি। গ্রেফতারকৃত চার সন্ত্রাসীকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদানের জন্য কুমিল্লার আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। লাশের অপেক্ষায় নিহতের স্বজনসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষজন মঙ্গলবার দিনভর নদীপাড়ে ভিড় জমান।
ইত্তেফাক/এএন