নমুনা সংগ্রহ করতে না পারায় রীতিমতো থমকে গেছে ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের কাজ। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড থেকে মসলিনের নমুনা চেয়ে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে বারবার চিঠি দেয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি। জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ মসলিনের নমুনা দিতে অপারগতা জানিয়েছে। এক্ষেত্রে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধারে এ প্রকল্পের কাজ হাতে নেয় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এ প্রসঙ্গে ‘ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক গবেষণা কর্মসূচির প্রধান গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মনজুর হোসেন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, মসলিন পুনরুদ্ধার করতে হলে অবশ্যই নিখাঁদ মসলিনের নমুনা প্রয়োজন। কিন্তু জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ কেন যে মসলিনের নমুনা দিতে চাচ্ছে না তা বুঝতে পারছি না। এটা দুঃখজনক। মসলিনের ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) বিশ্লেষণের জন্য এই নমুনা দরকার। তিনি বলেন, আমরা যদি মসলিন পুনরুদ্ধার করতে পারি তাহলে এটা হবে দেশের জন্য একটি বড় পাওয়া। বাংলাদেশ মসলিন কাপড়ের প্যাটেন্টের স্বীকৃতি পাবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে মসলিন তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে ২০১৬ সালে ৭ জানুয়ারি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধির সমন্বয়ে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। কিন্তু মসলিনের নমুনা না পাওয়ায় থমকে গেছে সেই কমিটির কাজ।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ২৮ জানুয়ারি ও ২৮ মার্চ মসলিনের নমুনা চেয়ে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় তাঁত বোর্ড। এর মাঝে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ১ মার্চ মসলিনের নমুনা দেয়ার জন্য জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে লিখিত নির্দেশনা দেয়। কিন্তু তারপরও মসলিনের নমুনা পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ গত বছরের ২২ মে তাঁত বোর্ডকে লিখিতভাবে জানিয়েছে, জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টি তাদের ১৬৩তম সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত কোনো নিদর্শনের অঙ্গহানির প্রস্তাব অনুমোদন করার অবকাশ নেই। ফলে আবেদনটি না মঞ্জুর করা হলো।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মসলিনের নমুনা সংগ্রহ করতে না পারায় তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান জসীম উদ্দীন আহমেদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমরা এখনো মসলিনের নমুনা সংগ্রহ করতে পারিনি। তবে আমরা বসে নেই। ইতিমধ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছি। যদি কারো কাছে থাকে তাহলে আমরা তার কাছে থেকে কিনে নেব। এছাড়া সম্প্রতি আমরা বরগুনাতে ২০০ বছরের পুরনো একটা শাড়ি পেয়েছি। কিন্তু সেটা মসলিন নয়, সিল্কের। আরেকটি শাড়ি পেয়েছি ১০০ বছরের পুরনো। কিন্তু সেটাও সিল্কের।
গবেষক অধ্যাপক ড. মো. মনজুর হোসেন বলেন, যদি শেষ পর্যন্ত কোথাও মসলিনের নমুনা না পাওয়া যায়, তাহলে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাবো। যাতে জাতীয় জাদুঘরের মাধ্যমে আমরা মসলিনের নমুনা সংগ্রহ করতে পারি।
উল্লেখ্য, মোঘল রাজশক্তির পতন, ব্রিটিশ শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য বিস্তার, উচ্চহারে কর আরোপ ইত্যাদি কারণে ঢাকাই মসলিনের উত্পাদন বন্ধ হয়ে যায়। ১৭৯৮ সালে প্রকাশিত জেমস টেইলর তার ‘টপোগ্রাফি অব ঢাকা’ গ্রন্থে ঢাকাই মসলিন রপ্তানি সংক্রান্ত যে হিসেব দেখিয়েছেন তাতে তিনি উল্লেখ করেন, ঐ সময় সোনার গাঁ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার মসলিন রপ্তানি হতো। ঢাকাই মসলিনের সূক্ষ্মতার একটি বড় কারণ হচ্ছে ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় উত্পন্ন এক বিশেষ শ্রেণির কার্পাস তুলা; যা ‘ফুটি কার্পাস’ নামে পরিচিত ছিল।
গবেষকরা বলছেন, সপ্তদশ শতকে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় মসলিন শিল্প বিকাশ লাভ করেছিল। তবে মোগল আমলে এ কাপড়ের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা, ধামরাই, সোনারগাঁও, জঙ্গলবাড়ী আর বাজিতপুর ছিল মসলিন তৈরির জন্য বিখ্যাত।
তারা বলেছেন, নানা ধরনের মসলিন ছিল। একটির ধরন ছিল জামদানি, যেটা ফুলওয়ালা। ছিল মসৃণ মসলিন। আরেকটির ধরন ছিল ডুরিয়া, যেটাতে দাগ আছে। সবচেয়ে সূক্ষ্ম সুতার তৈরি, সবচেয়ে কম ওজনের মসলিনের কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। দামটাও ছিল আকাশ-ছোঁয়া। মানের ওপর ভিত্তি করে মসলিনের বিভিন্ন নামকরণ হতো। যেমন: তানজেব, আবই-রওয়ান, শব-নম, আলাবালি প্রভৃতি। মোগলরা ৬০০ কাউন্ট সুতার তৈরি মসলিন ব্যবহার করত। এ মসলিনকে তারা ‘মলমল খাস’ নামে ডাকত। সব মিলিয়ে প্রায় একশ’ ধরনের মসলিন ছিল।
গবেষকরা জানান, মসলিন শুধু মাত্র একটি কাপড় নয়, একটি কিংবদন্তি, ইতিহাস, ঐহিত্য ও রাজসিক আভিজাত্যের সাক্ষী। মসলিন বাংলার গর্ব ও অহঙ্কার। মসলিন ফিরিয়ে আনা হবে আমাদের জন্য একটা বড় প্রাপ্তি।
ইত্তেফাক/এএন
