প্রযুক্তির বিভ্রাটে ই-ভোটিং থেকে সরে এসেছে ইসি

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:২৪

আইনগত জটিলতা ও প্রযুক্তির বিভ্রাটের কারণে খোদ নির্বাচন কমিশন ই-ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা থেকে সরে এসেছে। ২০১৩ সালের পর থেকে কোনো নির্বাচনেই ইভিএম ব্যবহার করেনি কমিশন। সর্বশেষ রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে জটিলতা হয়। এ কারণে ওই বছরের ২০ জুন কালীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে কমিশন।

 
রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম নিয়ে জটিলতার পর একটি কেন্দ্রের ফল বাতিল করে পুনরায় প্রচলিত পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হয়। জটিলতার কারণে উন্নত দেশগুলোও ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে যাচ্ছে। আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ড ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। জার্মানি ও ফিনল্যান্ডে আদালতের নির্দেশে নিষিদ্ধ করা হয় ইভিএম। যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
 
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিং মেশিন ব্যবহারের বিষয়টি ফের সামনে এসেছে। বুধবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে। এর মধ্যে ই-ভোটিং পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রস্তাব ছিল। শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০১০ সালে প্রথম স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার শুরু করে। সে সময়ে বলা হয়েছিল পর্যায়ক্রমে জাতীয় নির্বাচনেও এটি ব্যবহার করা হবে। যদিও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে আপত্তি দেয়। এই আপত্তি উপেক্ষা করে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে কমিশন। সে সময় সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু এ নিয়ে মামলা হয় আদালতে। মামলার কারণে সেই ইভিএম মেশিন দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে পড়ে ছিল।
 
তারপর বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হয় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে। সবকটি কেন্দ্র ইভিএম ব্যবহার করে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ফলাফল ঘোষণার মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করে কমিশন। কিন্তু ওই নির্বাচনে ইভিএমে ক্রুটি ধরা পড়লেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দুই মেয়র প্রার্থীও ব্যবধান বেশি হওয়ায় সেটি নিয়ে আর ঝামেলা হয়নি।
 
কিন্তু ইভিএম জটিলতায় রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদের পুনরায় নির্বাচন আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছিল কমিশন। ভোট গণনার সময় ৩৯ নম্বর ভোট কেন্দ্রের (টিচার্স ট্রেনিং কলেজ) একটি বুথের ইভিএম বিকল হয়ে পড়ে। পড়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেখানে পুনরায় ভোট হয়। আর এক কেন্দ্রে ফলাফলে গড়মিল দেখা দেয়। নারায়ণগঞ্জে বন্দর থানা এলাকায় কাজী সিরাজুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের একটি বুথে দুই দফা ইভিএম বিকল হয়ে পড়েছিল। ওই কেন্দ্রের একটি বুথে ৫৫টি ভোট নেওয়ার পর ইভিএম বিকল হয়ে যায়। কমিশনের বিশেষজ্ঞরা নারায়ণগঞ্জে গিয়ে মেশিন সচল করেন। পরে আরো ১১টি ভোট নেওয়ার পর ওই মেশিনটিও বিকল হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে মেশিনটি মেরামত করা হলেও প্রদত্ত সকল ভোটই মুছে যায়।
 
এসব বাস্তবতায় ইভিএম মেশিন ব্যবহার থেকে সরে দাঁড়ায় নির্বাচন কমিশন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহারে যায়নি কমিশন। ইভিএম ব্যবহারে নানাবিধ জটিলতা রয়েছে। প্রযুক্তিগত জটিলতা ছাড়াও আইনি জটিলতাও রয়েছে। সনাতনী পদ্ধতিতে ব্যালট পেপার কিছুকালের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হতো। নির্বাচন নিয়ে কোনো মামলা হলে ট্রাইব্যুনালে সংরক্ষিত ব্যালটপেপার মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু ইভিএমে কোনো ব্যালট পেপার থাকে না। এখানে অবৈধভাবে প্রদত্ত ভোট চি?হ্নিত করার কোনো উপায় নেই। এই পদ্ধতিতে প্রিজাইডিং এবং পোলিং অফিসারকে বশ করে বা জিম্মি করে সুইচ টিপে শত শত ভোট দেওয়া সম্ভব।
 
পৃথিবীর শতকরা ৯০ ভাগ দেশে ই-ভোটিং পদ্ধতি নেই। যে কয়েকটি দেশ এটি চালু করেছিলো তারাও এখন এটি নিষিদ্ধ করেছে। ২০০৬ সালে আয়ারল্যান্ড ই-ভোটিং পরিত্যাগ করে। ২০০৯ সালে জার্মানির ফেডারেল ভোট ইভিএমকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা দেয়। ২০০৯ সালে ফিনল্যান্ডের সুপ্রিমকোর্ট ৩টি মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের ফলাফল অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করে। নেদারল্যান্ডে ই-ভোটিং কার্যক্রমের প্রয়োগ হয়। তবে, জনগণের আপত্তির মুখে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, জালিয়াতির সুযোগ থাকায় এতে এক চাপে ৫০টি ভোট দেয়া সম্ভব। বিদেশের মাটিতে বসেও ইভিএম হ্যাকিং করা যায় এবং একটি ইভিএম হ্যাকিং করতে এক মিনিটের বেশি লাগে না। ড. অ্যালেক্স হালডারমেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ইভিএমের ওপর গবেষণা করে প্রমাণ পেয়েছেন, আমেরিকায় ইভিএম টেম্পারপ্রুফ নয়। ফলে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যেও ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। আমেরিকায় ২২টির বেশি অঙ্গরাজ্যে এটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বাকিগুলোতেও তা নিষিদ্ধ হওয়ার পথে।
 
ভারতে বিতর্ক
 
ইভিএম ব্যবহার নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে রয়েছে যথেষ্ট বিতর্ক। ২০০৯ সালের শেষ দিক থেকে এটি বেশ গতি লাভ করেছে। ভারতের আদালতে ইভিএম নিয়ে একাধিক পিটিশন আছে। ভারতে বিভিন্ন এনজিও এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সুপ্রিমকোর্টে মামলা করেছেন ইভিএম নিষিদ্ধ করার জন্য। এর মধ্যে ভারতের জনতা পার্টির প্রেসিডেন্টও দুইটি আসন নিয়ে ইভিএম-এর জালিয়াতির বিষয়ে হাইকোর্টে মামলা করেন।
 
প্রযুক্তিবিদরাও এখন ইভিএমের বিরুদ্ধে সোচ্চার। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে ‘ভারতের ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন জালিয়াতি প্রতিরোধক নয়’ দাবি করেছেন একদল মার্কিন আইটি বিশেষজ্ঞ। তারা বলেন, ‘ভারতের ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন জালিয়াতি প্রতিরোধক নয় এবং দেশটির নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ ভোট গ্রহণ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা উচিত।’ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেন আডিডা, মাইক্রোসফট গবেষক ড. জোশ বেনালো ও পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাট ব্লেইজ। তিন মহাদেশের তিন প্রযুক্তিবিদের (নেট ইন্ডিয়া লিমিটেডের কর্নধার ক্যারি কে. প্রসাদ, আমেরিকার মিশিগান ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সিকিউরিটি বিষয়ক প্রফেসর ড. অ্যালেক্স হালডারমেন এবং নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত কম্পিউটার হ্যাকার রপ-গনগগ্রিজিল) ‘সিকিউরিটি অ্যানালাইসিস অব ইন্ডিয়া’স ইলেক্ট্রোনিক ভোটিং মেশিনস’ শিরোনামের গবেষণাপত্রটিই বিশ্বকে ইভিএম থেকে সরে আসার অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। তারা বলেন, ‘ভারতের তৈরি ইভিএমকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করা হতো। আসলে সেটি ইউরোপ ও আমেরিকার তৈরি ইভিএম থেকে অনেক দুর্বল’।
 
ই-ভোটিং কি ?
 
ভোট প্রয়োগে মেশিন বা ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি অণুসৃত হয় বিধায় সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি ইলেক্ট্র্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম নামে পরিচিত। এর অন্য নাম ই-ভোটিং। ইলেক্ট্রনিক প্রক্রিয়ায় এটি একাধারে ভোট প্রয়োগ ও দ্রুততার সাথে ভোট গণনা করতে সক্ষম। ভোট গ্রহণের স্থান হিসেবে ভোট কেন্দ্রেই মূলত ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এতে কাগজের ব্যালট বা ব্যালট বাক্সের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। ব্যালট কাগজে সিল মারার পরিবর্তে ভোটার পছন্দের প্রতীকের পাশের সুইচটি টিপে ভোট দিতে পারেন। এই মেশিন চালাতে দরকার হয় ১২ ভোল্টের একটি ব্যাটারি। প্রতিটি মেশিনের দুটি অংশ রয়েছে। ব্যালট ইউনিট ও কন্ট্রোল ইউনিট। ইউনিট দুটি একটি তারের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে। কন্ট্রোল ইউনিটটি সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের সামনের টেবিলে থাকে। আর ব্যালট ইউনিটটি থাকে বুথের ভেতর। ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম এই পদ্ধতি চালু হয়।

ইত্তেফাক/এএন