আগের আফ্রিকা আর নেই। আমেরিকানদের কয়েক প্রজন্ম আফ্রিকাকে কেবল দয়াদাক্ষিণ্য দেখাতেই শিখেছে। গণহত্যা ও দুর্ভিক্ষের প্রাচুর্যই এর কারণ। অনেকেই সেখানে যাওয়ার কথা চিন্তা করে কেবল ভোজনবিলাসী শিকার অভিযান কিংবা ত্যাগ-তিতিক্ষাযুক্ত মানবিক সাহায্যে অংশ নেয়ার প্রসঙ্গ আসলে। কিন্তু সময় এসেছে ‘অর্থনৈতিক যন্ত্র’ আফ্রিকা সম্পর্কে ধারণা পাল্টানোর। আফ্রিকার ব্যাঘ্র অর্থনীতিকে দেখার জন্য প্রস্তুতি নেবার সময় কি সত্যিই এসে গেছে— এ প্রশ্নটা এখন জোরেশোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। এর পেছনে যুক্তিও রয়েছে যথেষ্ট। ২০০১ থেকে ২০১০, এ সময়ে বিশ্বের সেরা দশটি দ্রুত বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির ৬টিই ছিল এ মহাদেশটির। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আএমএফ) বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৫, এ সময়ে সেরা দ্রুত বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির তালিকায় আফ্রিকান প্রতিনিধিদের সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়াবে সাত।
আফ্রিকা এখন আর শিকার অভিযান ও মানবিক সাহায্যের জায়গা নয়; দ্রুত অর্থ বানিয়ে নেওয়ারও উত্কৃষ্ট স্থান। তেলের বিশাল রিজার্ভ এবং গ্যাসসহ নানা খনিজ সম্পদ আবিষ্কৃত হতে থাকায় বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো বিস্তৃত হচ্ছে ওই মহাদেশটিতেও। গোল্ডম্যান সাক্স সম্প্রতি ‘আফ্রিকাস টার্ন’ নামক একটি রিপোর্টে আফ্রিকার ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধার তুলনা করে ১৯৯০’র দশকের গোড়ার দিকের চীনের সঙ্গে। খুব সহসাই চীনের মতো হয়ে যাবে এ মহাদেশের অনেক দেশ, এমন কথা বলা না হলেও এটি বলে দেয়া হয়েছে যে, বিদেশিরা আফ্রিকায় ব্যবসা খুলতে গেলে তীব্র প্রতিযোগিতার দিন ঘনিয়ে আসছে। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, মহাদেশটির অনেক দেশেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। অবশ্য অনেকে এরই মধ্যে সে আন্দাজ করে ফেলেছে।
আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় পর্বতবেষ্টিত রাষ্ট্র লেসোথো। এ দেশটির গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোতে পোশাক তৈরি করা হয় আমেরিকার বিপণীবিতানগুলোর জন্য। লেসোথোই আফ্রিকার মধ্যে সবচে’ বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। দৈত্যসম তাইওয়ানিজ করপোরেশান নিয়েন হাইজিং-এর ফ্যাক্টরিগুলোতে কাজ করছে ১০ হাজার শ্রমিক। নিয়েন হাইজিং টেক্সটাইল বিশ্বে তাদের সর্ববৃহত্ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে লেসোথোতে। লিভাই’সসহ অন্যান্য আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য তারা নিখুঁতভাবে তৈরি করছে নীল জিন্স। কোম্পানির উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা কথা প্রসঙ্গে জানান, এখানকার তৈরি পোশাকের গুণগত মান এশীয় ফ্যাক্টরগুলোর কাছাকাছি, অর্থাৎ তুলনা চলে।
৩ লাখ নতুন চাকরির সৃষ্টি হয়েছে গোটা আফ্রিকায়। কিন্তু গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস আইন নবায়নে দেরি করায় বেকার হয়ে পড়ে অনেক লোক। শুধুমাত্র লেসোথোতেই চাকরি হারায় পাঁচ হাজার লোক। এখন অবশ্য বাধা দূর হয়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে তারা আবার কাজে যোগ দিয়েছে।
দুর্নীতি, নিপীড়নমূলক শাসন এবং ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে প্রতিযোগিতা না থাকাতে খুব সহজেই ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হতে পারছে না আফ্রিকায়। উদাহারণস্বরূপ লেসোথোতে গার্মেন্ট কর্মীদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২০ মার্কিন ডলার। সে জায়গায় বাংলাদেশে অর্ধেকেরও কম। উপরন্তু আফ্রিকায় লাল ফিতা দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। সোয়াজিল্যান্ডে একটি কোম্পানি খুলতে গেলে সম্পন্ন করতে হয় ১২টি প্রক্রিয়া এবং সেজন্য সময় লাগে কয়েক বছর। একটি গুদামের অনুমতি মিলতেই কেটে যায় ৩২৬ দিন। সেনেগালে ফ্যাক্টরি দিতে চাইলে চূড়ান্ত অনুমতি মিলে প্রায় দুই বছর পর। তার আগে সম্পন্ন করতে হয় ৪৩টি প্রক্রিয়া। এসব তথ্য জানা গেছে বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৩ সালের রিপোর্ট থেকে।
মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখতে হয়। ইদানীং আফ্রিকার প্রায় সবগুলো দেশই উঠেপড়ে লেগেছে ব্যবসা-বান্ধব পরিস্থিতি সৃষ্টির। রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ইথিওপিয়া ও রুয়ান্ডা জনগণের স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়নে বেশ ভালো কাজ করছে। বহু দেশই আগের চেয়ে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও কৌশলী হয়েছে।
