বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে গত কয়েক দশকে। আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থা। ব্যাংক ব্যবস্থাকে দুর্বল এবং অনুন্নত রেখে শক্তিশালী অর্থনীতির আশা করা যায় না কোনোভাবেই। আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সমস্যা, সংকট রয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) কারণে ২০০০ সালের পরবর্তী দেড় দশকে দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে অনেক বেশি সংখ্যক গ্রাহককে ব্যাংকিং সেবা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে কর্মদক্ষতা ও মুনাফাও। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আইসিটির ব্যবহার শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালের পর থেকে। তবে ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে আইসিটির ব্যবহার বাড়তে শুরু করে। সেই অবস্থা থেকে আইসিটি এখন ব্যাংক খাতের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড একমুহূর্তের জন্য পরিচালনার কথা ভাবা প্রায় অসম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশ-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ আমাদের ব্যাংকিং খাত। এখানে যাবতীয় লেনদেন হিসাব-নিকাশ, অর্থ স্থানান্তরসহ সব কাজই এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে। মাত্র কিছু সময়ের জন্য যদি অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটে তাহলে একটি ব্যাংকের চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এ বিষয়ে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের যে ক্ষতি হয় সেটা কোনো না কোনোভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু একটি ব্যাংকের অনলাইন ভিত্তিক কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে সেই ব্যাংকের পক্ষে একদিনও টিকে থাকা সম্ভব নয়।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) কারণে দেশে প্রথাগত ব্যাংকিং মাধ্যমের লেনদেনকে ছাড়িয়ে গেছে অনলাইন ভিত্তিক লেনদেন। এর ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা ও উত্পাদনশীলতা বাড়ছে, অন্যদিকে এই খাতের মুনাফা বৃদ্ধিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নির্ভুল লেনদেনের মাধ্যমে গ্রাহকের সন্তুষ্টি বাড়াতেও আইসিটির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথাগত ব্যাংকিং মাধ্যমে এখন বছরে গড়ে ১৭০ কোটি বার লেনদেন হচ্ছে। আর আইসিটির কারণে অনলাইনে ২০০ কোটি বারের বেশি লেনদেন হচ্ছে। আর আইসিটির কারণে অনলাইনে একজন কর্মী এখন বছরে গড়ে ১০ হাজার লেনদেন সম্পন্ন করছেন। ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত ব্যাংকের একজন কর্মীর গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজারের কম। অর্থাত্ প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গত দেড় দশকে ব্যাংকের কর্মীদের কর্মদক্ষতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আইসিটিতে বিনিয়োগ ব্যাংক খাতের জন্য অবশ্যই লাভজনক। ব্যাংকের আইসিটি খাতে এক টাকা খরচ করলে তা কতোটা মুনাফা নিয়ে আসে তা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিটিতে একটাকা বিনিয়োগ করলে ব্যাংকের জন্য তা ১৩৬ টাকার সমান উত্পাদনশীলতা তৈরি করে। এর বিপরীতে প্রযুক্তি বহির্ভূত খাতে একটাকা খরচ করলে সেটি ৫৮ টাকার সমপরিমাণ উত্পাদনশীলতা নিয়ে আসে। একইভাবে আইসিটি বিষয়ে জ্ঞান আছে, এমন একজন কর্মীর পেছনে একটাকা খরচ করা হলে ব্যাংকের আয় বাড়ে ২৫ টাকার সমান। সাধারণ একজন কর্মীর পেছনে একটাকা খরচ করলে ব্যাংকের আয় বাড়ে ছয় টাকা। অর্থাৎ আইসিটিতে দক্ষ একজন কর্মীর পেছনে ব্যাংকের বিনিয়োগ চারগুণ বেশি লাভজনক।
মূলত ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ধীরে ধীরে আইসিটির ব্যবহার শুরু হয়েছিল। সে সময় ব্যাংকের একজন কর্মী গড়ে ৪১ কোটি টাকা লেনদেন করতেন। সেটি ২০১৫ সালে বেড়ে ১৬০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাত্ লেনদেন সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে একজন কর্মীর আর্থিক লেনদেনের দক্ষতাও এ সময়ে প্রায় চারগুণ বেশি বেড়েছে। কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকের মুনাফাও বেড়ে গেছে একথা আজ অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ১৯৯০ সালে বেসরকারি ও বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলো মুনাফা করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের লোকসানের কারণে সামগ্রিক ব্যাংক খাত লোকসানের মধ্যে ছিল। সেই অবস্থা থেকে ২০০০ সালে ব্যাংক খাতের গড় মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫৫ কোটি টাকা। এ মুনাফা ২০১৫ সালে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে অনলাইন ভিত্তিক ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং প্রভৃতির দ্রুত বিকাশ এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা খুব সহজেই চোখে পড়ে। এখন বেশিরভাগ গ্রাহক অনলাইন ব্যাংকিং-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন বাস্তব প্রয়োজনেই। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে ব্যাংকের জটিল লাভ ক্ষতির হিসাবকরণ প্রক্রিয়া অনেক সহজ এবং নির্ভুল হয়েছে। আগে যা করতে প্রচুর সময় লাগতো, বিলম্বিত হতো ব্যাংকের সঠিক মুনাফা প্রক্রিয়াকরণ কাজ এখন তা নির্বিঘ্নে করা সম্ভব হচ্ছে। এখন ব্যাংকের লেনদেনে ভুলের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। কোনো কোনো ব্যাংক আগের প্রচলিত হিসাবকরণ প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মিথ্যে, কাল্পনিক মুনাফা প্রদর্শন করতো। এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের ফলে সেই জালিয়াতির সুযোগ আর নেই বলা চলে। এখন ব্যাংকগুলোকে সত্যিকার সঠিক মুনাফাই প্রদর্শন করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি কিংবা জালিয়াতির কোনো সুযোগ থাকছে না।
ব্যাংক খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, যার কারণে ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে দারুণ গতির সঞ্চার হয়েছে সেই আইসিটিকে ব্যাংক খাতের প্রধান একটি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন। এখনো আইসিটিকে ব্যাংক খাতের মূল ব্যবসা থেকে আলাদা করে দেখার একটি মানসিকতা বহাল রয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নতুন গতি সঞ্চারকারী আইসিটি খাতকে সবচেয়ে গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলিত অবস্থায় রেখে দিলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। এ খাতের নীতি নির্ধারকদের পুরনো মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে বাস্তবতার নিরিখে। আইসিটি খাতকে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সিরিয়াসলি নিতে হবে। ২০০০ সালেও আইসিটিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ বলতে বোঝাতো সফটওয়্যার ও কিছু কম্পিউটার কেনা। সেই অবস্থা থেকে আইসিটির কারণে ব্যাংকখাতে নতুন অনেক সেবা এসেছে, কর্মদক্ষতাও বেড়েছে।
এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে দৈনিক ৬৯০ কোটি টাকা লেনদেন হয়। মোট ৬ লাখ ৭১ হাজার এজেন্ট এ সেবা দিচ্ছে। ব্যাংক খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দারুণ এক বিপ্লব ঘটে গেছে। আগের চেয়ে অনেক সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্য হয়েছে ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড। দ্রুত ও অপেক্ষাকৃত কম সময়ে ব্যাংকিং লেনদেন সম্ভব হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে কিংবা বিদেশ থেকে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স অবিশ্বাস্য কম সময়ের মধ্যে প্রাপকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের ব্যাংক খাত যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে তেমনিভাবে এর অপপ্রয়োগ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ঘটে যাওয়া এটিএম কার্ড জালিয়াতি মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়ন ও চাঁদাবাজি অর্থ আদান প্রদানের ঘটনাগুলো সবাইকে এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেউ কেউ ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম করছেন। এটা অনাকাঙ্খিত। কেউ কেউ অর্থ পাচার করছেন মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বিভিন্ন মডেলে মোবাইল আর্থিক সেবা চালু আছে। তবে বাংলাদেশে শুধু ব্যাংকের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। যা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রযুক্তির উত্কর্ষ দিন দিন বাড়ছে। এক সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং অবৈধ অর্থ পাচারের বড় হাতিয়ার হতে পারে। যা প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সজাগ থাকতে হবে দুর্বৃত্তরা যাতে হ্যাকিং এর মাধ্যমে ব্যাংকের তথ্য ভাণ্ডারে প্রবেশ করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটাতে না পারে।
সারাদেশের বিস্তৃত মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিতদের সেবা দিতে ২০১১ সালে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পল্লী এলাকাতেও ব্যাংকিং সেবা পৌঁছান সম্ভব হয়েছে। এখন ব্যাংক শাখার খরচ কমিয়ে কীভাবে আর্থিক, বীমা ও অন্যান্য সেবা দেওয়া যায়, তা নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের সময় এসেছে। যে সব অঞ্চলে যাতায়াত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, সে অঞ্চলে বেশি মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ও প্রণোদনা মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে সম্পন্ন হলে উপকারভোগীরা অনেক লাভবান হবেন, অযথা হয়রানি ও অন্যান্য ঝামেলা পোহানোর ঝক্কি থেকে বাঁচবেন।
অনাকাঙ্খিত ভুল ত্রুটি অনিয়ম ও সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়িয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির যথার্থ প্রয়োগ ঘটিয়ে আরো এগিয়ে যাবে, আমাদের সবার একান্ত প্রত্যাশা।
