মোবাইল ব্যাংকিং

জনপ্রিয়তার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০১৭, ১০:৩০
 
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা যে এখন তুঙ্গে সে কথা বলার অপেক্ষা থাকে না। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণ। এর মাধ্যমে এখন দৈনিক গড় লেনদেন হচ্ছে ৭৩১ কোটি টাকা। তবে এ জনপ্রিয়তার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। আর তাদের চক্রে হরহামেশাই পা দিচ্ছেন অনেকেই। ফলে  ছোট-খাট প্রতারণা থেকে শুরু করে মাদক ও মানবপাচারের অর্থেও লেনদেনও হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এমনকি বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে প্রতারণা ঠেকাতে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ। তবে প্রতারণা থামছে না।
 
সম্প্রতি ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাংক কর্মকর্তারা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারে হুন্ডি হওয়ার অভিযোগ করেন। এতে করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় লেনদেনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে হুন্ডি হ্রাসের চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিপত্রে বলা হয়েছে, কোনো মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে ৫ হাজার টাকা বা তার বেশি নগদ অর্থ জমা বা উত্তোলনে গ্রাহককে পরিচয়পত্র বা স্মার্টকার্ডের ফটোকপি প্রদর্শন করতে হবে, যা এজেন্ট তার রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করবেন। এমনকি রেজিস্ট্রারে গ্রাহকের স্বাক্ষর বা টিপসই সংরক্ষণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কোনো এজেন্ট এই ধরনের নির্দেশনা সম্পন্ন না করলে বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে এজেন্টশিপ বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
 
মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে প্রতারণা বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে গত বুধবার নতুন নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস্ ডিপার্টমেন্টের ওই নির্দেশনায় বলা হয়, এখন থেকে একজন ব্যক্তি যেকোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় একটি মাত্র হিসাব রাখতে পারবেন। যাদের একাধিক মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব চলমান রয়েছে, তা দ্রুত বন্ধ করে দিতে হবে। একইসঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দৈনিক ও মাসিক লেনদেনের সীমা আরো কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক এ নির্দেশনা দেয়।
 
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহকের একই জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্টকার্ড বা অন্য কোনো পরিচয়পত্রের বিপরীতে একাধিক মোবাইল হিসাব থাকলে উক্ত গ্রাহকের সাথে আলোচনা করে তার বেছে নেয়া- যেকোনো একটি মোবাইল হিসাব চালু রেখে অন্য হিসাবগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহকের সাথে আলোচনা করে এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ দুরূহ হলে, যে হিসাবটিতে সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে, তা চালু রেখে অন্য হিসাবগুলো বন্ধ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুসারে, একজন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক একবারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। আগে এই হার ছিল ২৫ হাজার টাকা। এখন থেকে গ্রাহক দৈনিক দুই বার এবং মাসে ১০ বার এই সেবা নিতে পারবেন, যা আগে ছিল দৈনিক তিন বার এবং মাসে ১০ বার।
 
একইসঙ্গে দৈনিক জমার সীমাও পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে এখন থেকে দিনে সর্বোচ্চ দুই বারে ১৫ হাজার টাকা করে পাঠানো যাবে। যা মাসে সর্বমোট ২০ বারে এক লাখ টাকার বেশি হতে পারবে না। আগে দিনে পাঁচ বারে ২৫ হাজার টাকা এবং মাসে সর্ব্বোচ্চ ২০ বারে দেড় লাখ টাকা করে জমা করা যেত। এছাড়া একটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে টাকা জমার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই হিসাব থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকার বেশি নগদ উত্তোলন করা যাবে না।
 
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সুবিধাবঞ্চিতদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দুয়ার খুলে দিতে ২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং চালুর অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ সেবা দিচ্ছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করলেও এখন সবচেয়ে এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। মোট লেনদেনের ৫৫ দশমিক ১১ শতাংশ হয় বিকাশের মাধ্যমে। আর ডাচ-বাংলার ৩৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং অন্যান্য ব্যাংকের সর্বমোট ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ মার্কেট শেয়ার রয়েছে। বর্তমানে দেশে ১৯টি ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন রয়েছে। তবে এর মধ্যে ১৭টি ব্যাংক এ সেবা চালু করেছে। আর আগে অনুমোদন নিয়েও সেবাটি বন্ধ করে দেয় প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের (পিএসডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ২১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের মাসে এর পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। সে হিসেবে লেনদেন ৬ শতাংশ বেড়েছে। গত নভেম্বরে প্রতিদিন গড়ে ৭৩১ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। অক্টোবর মাসে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬৮৯ কোটি টাকা। এ সময়ে এজেন্টের সংখ্যা ছয় লাখ ৭১ হাজার ৩৩৭ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৯৪ হাজার ৬২৯। পাশাপাশি নিবন্ধিত গ্রাহক তিন কোটি ৮৯ লাখ থেকে বেড়ে তিন কোটি ৯৬ লাখ হয়েছে। সক্রিয় গ্রাহক এক কোটি ৩৮ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে এক কোটি ৫১ লাখ। অক্টোবরে এ সেবার মাধ্যমে ১৮৩ কোটি টাকার বেতন বিতরণ করা হয়, নভেম্বরে বেতন বিতরণ বেড়ে হয়েছে ৩২২ কোটি টাকা। মূলত পোশাক খাতের কর্মীদের ও ছোট অঙ্কের বেতনপ্রাপ্ত কর্মীদের এই সেবার মাধ্যমে বেতন প্রদান করা হয়।
 
এক হিসাবে দেখা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৬০০ টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার টাকার লেনদেনই বেশি। সাধারণত যারা অল্প আয়ের মানুষ এবং যারা ব্যাংকে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার মতো দক্ষ নন, তাদের একটি বড় অংশ এ ব্যাংকিং সেবার দিকে ঝুঁকছেন। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে টাকা লেনদেনে বিভিন্ন কড়াকড়ির ফলেও মোবাইল ব্যাংকিং বাড়ছে। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলার সময় যে তথ্য দেওয়া হয় শুধুমাত্র সেটাই থাকে এর বাইরে লেনদেনের তেমন কোনো তথ্য থাকে না। এজেন্টের মাধ্যমে করলে যার কাছে টাকা পাঠান হয়, তার মোবাইল নম্বর ছাড়া আর কোনো তথ্যই থাকে না। আর সেটার সুযোগ নিয়েই মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে অবৈধ কাজে টাকা ব্যবহার হচ্ছে। ভুয়া মেসেজের মাধ্যমে এজেন্টরা যেমন টাকা দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি গ্রাহকের টাকাও তুলে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে ভূরি ভূরি।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুলনামূলকভাবে যারা অসচেতন তাদেরকে ভুল বুঝিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে অন্যের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য বড় ধরনের সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় রয়েছে। অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দক্ষ কায়দায় তারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের টাকা লুফে নিচ্ছে। তাদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন অবসরে যাওয়া সরকারি চাকরিজীবী, সেনা কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের সদস্যরা পর্যন্ত।
 
আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছে আসা অভিযোগে দেখা গেছে, বিভিন্ন ধরনের অপরাধে মোবাইল ব্যাংকিং-এর সহায়তা নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নোবেল লরিয়েটের সঙ্গে ডিনার প্রোগ্রাম, সুলভমূল্যে ফ্ল্যাট-প্লট প্রদান ও জিনের বাদশার কথা বলে অর্থ আদায়, অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়, মানবপাচার, চুরি, হ্যাকিং, ন্যাশনাল আইডি কার্ড জালিয়াতি, সিএনজি ও অটোরিকশা ছিনতাই প্রভৃতি। এসব ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৩শ’ টাকা থেকে সর্বোচ্চ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।
 
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্দেহজনক লেনদেন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ মাধ্যমেই মানবপাচার থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসায়ে অর্থায়ন হচ্ছে। আর এখন মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। যার মাধ্যমে বাড়ছে হুন্ডি ব্যবসা আর রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে।
 
জনপ্রিয় এ মাধ্যম কাজে লাগিয়ে যেভাবে প্রতারণা করা হচ্ছে তা থেকে কিভাবে মুক্ত হওয়া যায় সে বিষয়টির এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।