দেশ, জাতি ও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, অগ্রগতি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করার জন্য দুই হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে রহমত প্রার্থনার মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার শেষ হয়েছে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। বিশেষ তাত্পর্য ও ফজিলতপূর্ণ আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন তাবলীগ জামাতের দিল্লির মারকাজের শুরা সদস্য হযরত মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ। তিনি আরবি ও উর্দু ভাষায় মোনাজাত করেন। এ সময় ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মধ্যাহ্নের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে মহামহিম ও দয়াময় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় লাখো লাখো মুসল্লিরা আকুতি জানান।
বেলা ১১ টা ০১ মিনিট থেকে শুরু করে ১১টা ৩৬ মিনিট পর্যন্ত ৩৫ মিনিট স্থায়ী আবেগঘন আখেরি মোনাজাতে লাখো কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে রাহমানুর রাহীম আল্লাহর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব। আমীর-ফকির, মনীব-ভৃত্য, ধনী-গরিব, নেতা-কর্মী নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশা-গোষ্ঠীর মানুষ পরওয়ারদেগার আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। দক্ষিণে খিলক্ষেত, উত্তরে বোর্ড বাজার, পূর্বে টঙ্গী বিসিক শিল্প নগরী ও পশ্চিমে আশুলিয়া পর্যন্ত অন্তত ১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা বিস্তৃত বিশাল জনসমুদ্র থেকে মধ্যাহ্নের আকাশ কাঁপিয়ে ধ্বনি উঠে— ‘ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ’।
মাওলানা মোহাম্মদ সা’দ মোনাজাতে বলেন, হে আল্লাহ তুমি তো ক্ষমাশীল, তোমার কাছেই তো আমরা ক্ষমা চাইব। দ্বীনের ওপর আমাদের চলা সহজ করে দাও। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আমরা যেন তোমার সন্তুষ্টি মাফিক চলতে পারি সে তওফিক দাও। দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে আমাদের হেফাজত কর। এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে অনুকূল আবহাওয়া বিদ্যমান থাকায় আনুমানিক ৩০/৩৫ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান আখেরি মোনাজাতে শামিল হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
এ দিকে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ তার পরিবারের সদস্যবর্গ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের নিয়ে বঙ্গভবনের দরবার হলে বসে বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে শামিল হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানী ঢাকায় গণভবনে বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে শরিক হন। বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ এমপি তার বাসভবনে এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গুলশানের কার্যালয়ে বসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন।
শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে স্থাপিত জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোলরুমে বসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ প্রমুখ। ৩৫ মিনিট স্থায়ী আখেরি মোনাজাতে মাওলানা সা’দ প্রথম ১০ মিনিট মূলত পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াতগুলো উচ্চারণ করেন। শেষ ২৫ মিনিট দোয়া করেন উর্দু ভাষায়। মুঠোফোন ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের আরো অগণিত মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে।
আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপণি বিতান, অফিসসহ সবকিছু ছিল বন্ধ। চারদিন বিরতি দিয়ে আগামী ২০ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে শুরু হবে তাবলিগ জামাত আয়োজিত ৫২তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। ২২ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে এ বছরের বিশ্ব ইজতেমা।
গতকাল রবিবার ভোর হতে চারদিক থেকে লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি পায়ে হেঁটেই টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা স্থলে পৌঁছান। সকাল ৯টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলি-গলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে লাখো মানুষকে কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিতে দেখা গেছে।
আখেরি মোনাজাতের জন্য পুরানো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে বসে পড়েন মুসল্লিরা। এ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস-দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদীতে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন।
মুসল্লিদের বাধভাঙ্গা জোয়ার :রবিবার আখেরি মুনাজাতে শরীক হতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিগণ টঙ্গী অভিমুখে ছুটতে থাকেন শনিবার রাত থেকে। কেবলমাত্র আখেরি মোনাজাতে শরীক হতে বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী লাখো লাখো মুসল্লি ছাড়াও রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার মানুষ ভিড় এড়াতে শীত ও নানা ঝক্কি-ঝামেলা উপেক্ষা করে রাতেই টঙ্গীমুখো হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আল্লাহ প্রেমী মুসলমানরা রেলপথ, সড়ক পথ, নৌপথসহ বিভিন্ন যানবাহন এবং অনেকে পায়ে হেঁটে টঙ্গীতে পৌঁছে অবস্থান নিতে শুরু করেন। যতই সময় গড়াতে থাকে ততই মানুষের ঢল বাড়তে থাকে তুরাগের তীরে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের সমাবেশ ঘটে আখেরি মোনাজাতে। রাজধানী ঢাকা, টঙ্গী, গাজীপুরের সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টসশিল্প সর্বত্রই ছিল পূর্ণ ছুটির আমেজ। সকাল থেকে সড়কপথে টঙ্গীমুখী সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় দীর্ঘ পথ হেঁটে টঙ্গী পৌঁছতে হয়েছে লাখ লাখ মানুষকে। চারিদিকে যত দূর চোখ যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবী পরা মানুষ আর মানুষ। সকাল ৯টার মধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় তুরাগ তীরের পুরো ইজতেমাস্থল ও চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। এদিকে বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মুনাজাতে আগের তুলনায় মহিলাদের অংশ গ্রহণ বেড়েছে।
ফিরতি যাত্রায় বিড়ম্বনা ও যানজট :আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পর এক সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ফিরতে শুরু করলে টঙ্গীর আশপাশের সব সড়ক-মহাসড়কে ভয়াবহ জট সৃষ্টি হয়। টঙ্গী রেলস্টেশনে ফিরতি যাত্রীদের জন্য অপেক্ষমান ট্রেনগুলোতে উঠতে মুসল্লিদের জীবনবাজির লড়াই ছিল উদ্বেগজনক। ট্রেনের ভিতরে জায়গা না পেয়ে ছাদে ও দরজা-জানালায় ঝুলে শতশত মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিরতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে মানুষের জন্য ট্রেন দেখা যাচ্ছিল না। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশুলিয়া সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ফিরতি মুসল্লিদের বিড়ম্বনা ও কষ্টের সীমা ছিল না। চার-পাঁচ দিন ধরে টঙ্গীতে জমায়েত হওয়া মুসল্লিরা যোহরের নামাযের পর এক যোগে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে চাইলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। হাজার হাজার বৃদ্ধ, শিশু-কিশোর ও মহিলা মাইলের পর মাইল হেঁটে মোনাজাতে শরীক হন এবং একইভাবে ফিরেন। বিকেলে সীমিত আকারে যানবাহন চলাচল শুরু হলেও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
ইজতেমায় প্রথম পর্বে ৮ মুসল্লির মৃত্যু :গতকাল রবিবার সকালে টঙ্গীর চেরাগআলী মার্কেট এলাকায় রাস্তায় পড়ে অজ্ঞাত পরিচয় (৫৫) এক মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ নিয়ে বিশ্ব ইজতেমা প্রথম পর্বে ৮ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে।
টঙ্গী হাসতপালে ভর্তি ৮৩ জন মুসল্লি : গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা: আলী হায়দার খান জানান, গত ১২ থেকে ১৫ জানুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত টঙ্গী হাসপাতাল ও ৪টি অস্থায়ী ক্যাম্পের মাধ্যমে মোট ৮ হাজার ৮৫ জন মুসল্লিকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়া হয়েছে।
মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যা :নেটওয়ার্কে সমস্যার কারণে রবিবার ইজতেমা ময়দান ও টঙ্গী থেকে কোনো মোবাইলে কোথাও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। মাঝে-মধ্যে লাইন পেলেও মুহূর্তেই কেটে যাচ্ছিল।
পরিত্যক্ত জুতা ও পত্রিকার কাগজ :আখেরি মোনাজাত শেষে হুড়োহুড়ি করে ইজতেমা ময়দান থেকে বের হতে গিয়ে অগণিত জুতা ও সেন্ডেল ফেলেই খালি পায়ে মাঠ ত্যাগ করেন ধর্মপ্রাণ অনেক মুসল্লিরা। এছাড়াও মোনাজাত শেষে ইজতেমা মাঠ ও আশপাশের সড়কগুলোতে বিপুল পরিমাণ পত্রিকার কাগজ, জুতা ও সেন্ডেল পড়ে থাকতে দেখা যায়।
দু’সহস্রাধিক জামাত :ইজতেমা আয়োজক কমিটির অন্যতম শীর্ষ মুরুব্বি প্রকৌশলী মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, তাবলীগের শীর্ষ মুরুব্বীদের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত শেষে দু’সহস্রাধিক জামাত দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।
ইত্তেফাক/এএন
