যেখানে সেখানে মিলছে দামি গাড়ি। নদীর পানিতে, বাজারের রাস্তায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হচ্ছে এসব গাড়ি। গাড়িগুলোর মালিকদেরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ বলছে, এগুলো ‘বেওয়ারিশ’ গাড়ি হিসাবে তারা উদ্ধার করছে। আর শুল্ক ও গোয়েন্দা তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলছেন, যে নামে গাড়ি আনা হয়েছে বা কেনা হয়েছে, ঐ নামে গাড়িগুলো এখন আর ব্যবহার করতে পারছে না বলেই গাড়িগুলো বেওয়ারিশ হিসাবে ফেলে দেয়া হয়েছে। এসব গাড়ির ভুয়া মালিকদরে সকলেই ‘হাইপ্রোফাইল’ ক্যাটাগরির। এদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে বলেই মান সম্মানের রক্ষার্থে তারা গাড়ি ফেলে দিচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের কাপাসিয়ার দস্যুনারায়নপুর বাজার সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একটি টয়োটা প্রাডো গাড়ি উদ্ধারের পর গতকাল শেরপুরের শ্রীবর্দীর ভায়াডাঙা বাজার থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় টয়োটা অ্যাভাঞ্জা গাড়ি উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হঠাত্ করে আবারও রাস্তায় এ ধরণের গাড়ি ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটছে। বিগত ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময়ও রাজধানীসহ সারাদেশে যেখানে সেখানে এ ধরনের গাড়ি ফেলে দেয়া হয়েছিল।
গত বছরের ৯ জুন হবিগঞ্জ জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে থেকে ২ কোটি টাকা মূল্যের মিত্শুবিশি ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি উদ্ধার করে শুল্ক ও গোয়েন্দা তদন্ত অধিদফতর। অন্যের নামে কেনা গাড়িটি ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করে গাড়িটি রাস্তায় চালানো হচ্ছিল। শুল্ক ও গোয়েন্দা তদন্ত অধিদফতরের অভিযানের খবর জানতে পেরে ভুয়া মালিক গাড়িটি ফেলে পালিয়ে যায়।
ঐ বছরের ১২ জুন রাজধানীর বারিধারা এলাকার স্বদেশ মটরস নামে একটি গাড়ি বিক্রি ও সার্ভিসিং সেন্টার থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি সেডান ও দুটি জিপ উদ্ধার করে শুল্ক ও গোয়েন্দা তদন্ত অধিদফতর। শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সামপ্রতিক বিশেষ অভিযানের কারণে এসব গাড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। গাড়িগুলো সার্ভিসিং সেন্টারে মেরামতের জন্য আনা হয়েছিল। কিন্তু মালিক শুল্ক ও গোয়েন্দা তদন্ত অধিদফতরের অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে আর গাড়ি নিতে আসেননি।
আবার ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল’ হয়ে গাড়ির অবৈধ ব্যবহারকারী গাড়িতে চিঠি লিখে ঘোষণা দিয়ে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে পালিয়ে যাওয়ারও ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ১৬ আগস্ট কাকরাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কার্যালয়ের সামনের সড়কে পরিত্যক্ত অবস্থায় মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি উদ্ধার করে সংশ্লিষ্টরা। গাড়ির ভিতর অবৈধ মালিক একটি চিঠিও রেখে যায়। এতে লেখা ছিল, ‘আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমার দখলে থাকা গাড়িটি শুল্ক গোয়েন্দার সদর দফতরে জমা করছি।’ শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, গাড়িটি কারনেটের আওতায় দেশে আনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। শর্ত অনুযায়ী, বিদেশে ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও শর্ত ভঙ্গ করে কারনেটের সুবিধার অপব্যবহার করে এ দেশে চালানো হয়েছিল।
শ্রীবর্দী (শেরপুর) সংবাদদাতা আব্দুল বাতেন জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে শ্রীবরদী উপজেলার ভায়াডাঙ্গা বাজার থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পুলিশ টয়োটা অ্যাভাঞ্জা গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। ভায়াডাঙ্গা বাজারের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তারা সাদা রঙের গাড়িটি ভায়াডাঙ্গা বাজারে দাঁড় করানো দেখতে পান। বিকাল পর্যন্ত কেউ নিতে না আসলে পুলিশকে জানানো হয়।
শ্রীবর্দী থানার ওসি এস আলম ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকা মেট্রো- গ-৩৭-৮৯৯৭ নম্বরের সাদা রঙের গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঐ গাড়ির মালিকানা কেউ দাবি করেনি। তবে পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র দিয়ে জানা গেছে যে, ঐ গাড়ির মালিক আব্দুল হালিম। তিনি ঢাকার বাড্ডায় বসবাস করেন। তার বিরুদ্ধে আদম পাচারের অভিযোগ রয়েছে। গত বুধবার রাতে র্যাবের একটি টিম তাকে ধরতে পিছু নেয়। পরে হয়তো ভায়াডাঙা বাজারে ঐ ব্যক্তি গাড়ি ফেলে পালিয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে ঢাকায় র্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান ইত্তেফাককে বলেন, মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে র্যাব অভিযান চালাচ্ছে। শেরপুরের শ্রীবর্দীতে ফেলে যাওয়া গাড়িটি মানবপাচারকারীর কিনা তা তদন্ত করছে র্যাব।
শ্রীবর্দীর রানীশিমুল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মাসুদ রানা ইত্তেফাককে বলেন, ভায়াডাঙার টেংগুরপাড়া গ্রামের অছিম উদ্দিনের নাতনি জামাই আব্দুল হালিম। শুনেছি, আব্দুল হালিম ঢাকায় আদম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে ঐ গাড়িটি ফেলে রাখা হতে পারে।
কাপাসিয়া (গাজীপুর) সংবাদদাতা আসাদুজ্জামান সাদ জানান, দস্যুনারায়নপুর বাজার সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা টয়োটা প্রাডো গাড়ির নম্বর প্লেট ভুয়া বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। এ কারণে পুলিশ গতকাল রাত পর্যন্ত ঐ গাড়ির মালিকের সন্ধান করতে পারেনি।
কাপাসিয়া থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক জানান, নদী থেকে উদ্ধার করা গাড়িতে লাগানো নম্বর প্লেট (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-২০২৯) বিআরটিএ মাধ্যমে অনুসন্ধান করা হয়েছে। এ নম্বরটি ঢাকার মিরপুরের রিনা বেগম, পিতা আবদুর রব, ২/এইচ, বাসা ৯/১৪ নামে রেজিষ্ট্রেশনকৃত। কিন্ত পুলিশ উল্লেখিত ঠিকানায় এ নামের কাউকে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, গাড়িটি ফেলে দেয়ার সময় তাতে ভূয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করা হয়েছে।
