শিশুদের উদ্দেশে হাইকোর্ট : আদালতে আসতে কি ভয় লেগেছে?

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৭, ২০:৩৯
আদালতের নির্দেশে হাইকোর্টে হাজির করা হয় কামরাঙ্গীর চরের দুই শিশুকে। যাদেরকে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। হাজিরের পর দুই শিশুর উদ্দেশে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক বলেন, বাবুরা এদিকে এসো। তোমাদের কি আদালতে আসতে ভয় লেগেছে? ভয়ের কিছু নেই। তোমাদের নাম কি? কি কর? আদালতের আহ্বানে শিশু দুটি ডায়াসের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। 
 
এ সময় ক্ষীণ কণ্ঠে তারা বলেন, আমরা গ্যারেজে কাজ করি। স্কুলে যাই না। বিচারক বলেন, তোমাদের বাবাকে গিয়ে বলবে জজ সাহেব বলেছেন স্কুলে যেতে। লেখাপড়া করে বড় হও, তারপর কাজ করবে। একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বয়স নির্ধারণ না করেই দুই শিশুকে গ্রেপ্তারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের শুনানিকালে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক এসব কথা বলেন।
 
শুনানি শেষে হাইকোর্ট মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুই শিশুকে স্থায়ী জামিন দেয়। আদালত বলেছে, এই মামলার বিচার হবে শিশু আদালতে। অন্য কোন আদালত আদেশ দিতে পারবে না। একইসঙ্গে শিশু দুটির নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য লালবাগ জোনের ডিসি ও কামরাঙ্গীচর থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর ডিভিশন বেঞ্চ রবিবার এই আদেশ দেন। 
 
কামরাঙ্গীর চরের দুই শিশুকে হাইকোর্টে হাজির করতে গত ১৫ জানুয়ারি নির্দেশ দেয়া হয়। ওই নির্দেশ মোতাবেক রবিবার শিশু দুটিকে কামরাঙ্গী চর থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা তাদেরকে আদালতে হাজির করেন। হাজিরের পর শুনানি শুরু হয় মামলার। 
 
শুনানির এক পর্যায়ে শিশু দুটিকে দেখিয়ে আদালত কক্ষে উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বিচারপতি রেজা-উল হক বলেন, এই বয়সে ওদের তো স্কুলে থাকার কথা। কিন্তু আজ এই শিশুদের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে। অথচ আমাদের রাজনীতিবিদরা, সমাজপতিরা অনেক কথা বলেন, কিন্তু এসব বিষয়ে তারা দৃষ্টি দেন না। 
 
তিনি বলেন, পুলিশ এই দুটি শিশুর বয়স নির্ধারণ না করে গ্রেফতার করে শিশু আইনের লংঘন করেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল এই শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। এতটুকুন বয়স। তারা শিশু শ্রমে নিয়োজিত। এটা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য লজ্জার। সমাজ  কি এর জবাব দেবে? সরকার বিভিন্ন খাতে অনেক অর্থ বরাদ্দ দেয়, এদিকে একটু গুরুত্ব দিলেই পারে? আদালতে শিশুদের পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুল হালিম ও রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস শুনানি করেন। 
 
শুনানিতে ব্যারিস্টার হালিম বলেন, শিশু আইনের লংঘন করায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে তলব করা যেতে পারে। এটি করা হলে অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারাও আইন মেনে চলার ব্যাপারে সতর্ক হবে। ডিএজি বলেন, আইন অনুযায়ী শিশুদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এখানে আইনের লংঘন হয়নি। শুনানি শেষে পহেলা মার্চ পরবর্তী আদেশের জন্য দিন ধার্য রেখেছে হাইকোর্ট। 
 
গত ২৪ নভেম্বর ‘লাশের পরিচয় মেলেনি, খুনি সন্দেহে ২ শিশু গ্রেপ্তার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাইকোর্টে রিট করেন চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আবদুল হালিম। গত ২৯ নভেম্বর হাইকোর্ট ওই দুই শিশুর বয়স নির্ণয় করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়। সেই আদেশ মোতাবেক গত ৪ জানুয়ারি লালবাগের ডিসি ও কামরাঙ্গীচরের ওসি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফরেনসিক প্রতিবেদনে চিকিৎসকরা উল্লেখ করেছে শিশু দুটির বয়স ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে হবে। 
 
ইত্তেফাক/এমআই