ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ওলট-পালট বিশ্ব

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৭, ২৩:৫৮

ক্ষমতায় এসেই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার শরণার্থী এবং মুসলিমদের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সারা বিশ্বের পরিস্থিতিই পরিবর্তন করে দিয়েছেন তিনি। তার সিদ্ধান্তে ওলট-পালট অবস্থা বিশ্বে। ইতোমধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ আদালত স্থগিত করেছে। প্রধান মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য ও জার্মানি থেকে শুরু করে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই তার সিদ্ধান্তের সমালোচনায় মুখর। এমনকি নিজ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরেও বিক্ষোভ চলছে। এসব বিক্ষোভে তাকে প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে চলে যাওয়ার আহবান জানাতে দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যে তার রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করারও দাবি উঠছে। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় ক্ষুব্ধ হয়ে এক নারী আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, আমেরিকান স্বপ্নকে হত্যা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বিশ্বের গনমাধ্যমেও ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার কড়া সমালোচনা করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তথা বিশ্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। খবর বিবিসি, রয়টার্স, ব্রিটিশ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দ্য টেলিগ্রাফ ও সিএনএনের।

আদালতে নির্বাহী আদেশ স্থগিত

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যে নির্বাহী আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছেন একজন মার্কিন বিচারপতি। শুক্রবার জারি করা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওই আদেশের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন। ওই সংগঠনের হিসেব অনুযায়ী, ওই আদেশের জেরে ১০০ থেকে ২০০জনের মতো লোক বিভিন্ন বিমানবন্দরে বা ট্রানজিটে আটকে পড়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওই নির্বাহী আদেশের ফলে আমেরিকার পুরো শরণার্থী কর্মসূচীই থমকে গেছে। তাছাড়া ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলির নাগরিকদের আমেরিকা সফরের ওপর ৯০ দিনের নিষেধাজ্ঞাও আরোপিত হয়েছে। যারা তখন মাঝ-আকাশে ছিলেন তাদের অনেককে বিমানবন্দরে অবতরণের পর আটকানো হয়েছে - যদিও তাদের বৈধ মার্কিন ভিসা কিংবা অন্যান্য অভিবাসন পারমিট ছিল।  শনিবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা দারুণ কাজ করছে। আপনারা বিমানবন্দরগুলোতে সেটা দেখতে পাচ্ছেন, সর্বত্রই দেখতে পাচ্ছেন!’ কিন্তু এখন নিউ ইয়র্কের মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জাজ অ্যান ডনেলি তার রায়ে বলেছেন যেসব শরণার্থীর আবেদন আগেই অনুমোদিত হয়েছে কিংবা অন্য যেসব ব্যক্তির বৈধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা বা পারমিট আছে তাদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। জরুরি ভিত্তিতে দেওয়া এই রায়ে আরও বলা হয়েছে এর ফলে যারা প্রভাবিত হয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে ‘প্রবল ও অপূরণীয় ক্ষত’ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে ডিস্ট্রিক্ট জাজ অ্যান ডনেলি’র এই রায়ে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের সাংবিধানিকতা নিয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে বিভিন্ন বিমানবন্দরে যারা আটকে পড়েছেন তাদের ঠিক কী হবে, সেটা এই রায়ের পরও স্পষ্ট হয়নি। ওদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আদেশের জেরে যারা সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন তারা বলছেন তাদের স্বপ্ন ভেঙে গেছে - প্রবল হতাশা ঘিরে ধরছে তাদের। জার্মানিতে বসবাসরত একজন সিরিয়ান বিজ্ঞানী, যিনি ত্বক ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা করেন, তিনি এখন আগামী মাসে ফিলাডেলফিয়াতে তার সহকর্মীদের কাছে বেড়াতে যেতে পারবেন না। ওই মহিলা বিজ্ঞানীর কথায়, ‘এই অবিচারের সাংঘাতিক, আর এই নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত অবমাননাকর।’ জর্ডানের একজন মার্কিন-নিবাসী হূদরোগ বিশেষজ্ঞ, যার সিরিয়ান স্ত্রী আমেরিকায় তার কাছে আসতে পারবেন না, তিনিও বলেছেন তার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিমানবন্দরে আটক ও বিক্ষোভ

নিদের্শনা জারির পর, নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে ১১ জন শরণার্থীকে আটকের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে এক নারীকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। তখন তিনি শরীরে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। পরে বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা তাকে রক্ষা করেন। বিমানবন্দরের সামনে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হচ্ছেন, আটক হওয়া শরনার্থীদের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন। এছাড়া সানফ্রান্সিসকো বিমানবন্দর, ডালাস ও ফোর্ট ওয়ার্থ ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরেও বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভে ‘নিষেধাজ্ঞাকে মানি না এবং ট্রাম্প, তোমাকে যেতে হবে’ ইত্যাদি স্লোগান দেওয়া হয়।

যে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে তারা ততক্ষণে ট্রানজিটে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেখানেই তাদের আটক করা হয়। যদিও আটকের সংখ্যাটি খুব বড় নয়, কিন্তু এই নির্দেশনার ফলে বহু মানুষের ওপর প্রভাব পড়বে। শনিবারই ইরাকের ৫ জন এবং ইয়েমেনের একজন নাগরিককে কায়রোর এক বিমান বন্দরে বৈধ ভিসা থাকা সত্বেও আমেরিকাগামী বিমানে উঠতে দেওয়া হয়নি। ট্রাম্পের এই নির্দেশনা আসার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরোধিতা ও সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে তাকে। কয়েকজন মার্কিন আইনজীবী নতুন বিধিনিষেধগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও এই কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। অর্থাত্ কোনো ব্রিটিশ নাগরিক যদি একইসঙ্গে ইরাকেরও নাগরিক হন, তবে তিনি আমেরিকায় ঢুকতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের চিফ সেক্রেটারি টু দ্য ট্রেজারি ডেভিড গক বলেন, এই পদক্ষেপ বিভক্তির, এটা সন্ত্রাসবাদের হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অফিস জানিয়েছে, অন্তত ৩৭৫ জন ভ্রমণকারী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। ১৭৩ জন যুক্তরাষ্ট্রগামী বিমানেই উঠতে পারেনি। গ্রিনকার্ডধারী ৮১ জনও বিমানবন্দরে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।

যুক্তরাজ্যেও প্রতিবাদ

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে বলেছেন, আমরা আমাদের নাগরিকদের রক্ষা করবো। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছেন টোরি দলের এমপি নাদিম জাহাবি বলেছেন, ‘এই সিদ্ধান্ত খুবই দু:খজনক। শিশুকাল থেকে এই প্রথম মনে হলো আমি বৈষম্যের শিকার।’ ব্রিটিশ তারকা স্যার মো ফারাহও এই নিষেধাজ্ঞার শিকার হবেন। অন্যদিকে লেবার পার্টি ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় ব্রিটিশ নাগরিকদের ক্ষতি নিয়ে বরিস জনসনকে পার্লামেন্টে তলব করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, ট্রাম্প যতোদিন মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা রাখবেন ততোদিন তিনি যুক্তরাজ্য সফর করতে পারবেন না। লেবারেল ডেমোক্র্যাটসও একই দাবি করেছে। এছাড়া দেশটিতে ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করতে আড়াই লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। এ নিয়ে পার্লামেন্টেও আলোচনা হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ এয়ারলাইনস এয়ারবিএনবি জানিয়েছে, ট্রাম্পের বিতর্কিত নিষেধাজ্ঞায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত তারা। এদিকে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলও বলেছেন, সন্ত্রাসের হুমকির কথা বলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কোনা মানে হয় না।

বিশ্ব গণমাধ্যমেও তীব্র সমালোচনা

ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের শিরোনাম করেছে, শরণার্থীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বিশ্বে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে; ডেইলি নিউজ শিরোনাম করেছে, অরাজক পরিস্থিতি; শিকাগো ট্রিবিউন জানিয়েছে, ‘ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় ভীতি সৃষ্টি করেছে ও ক্ষুব্ধ করেছে’; দ্য অবজারভার বলছে, ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় আতঙ্কিত বিশ্ব। ব্রিটিশ দ্য টেলিগ্রাফে রব ক্রিলি নামের এক বিশ্লেষক বলছেন, এমনকি মানুষ যখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়, তখন বুঝতে হবে আমেরিকার স্বপ্ন মরে গেছে।

 

ইত্তেফাক/এসএসএ