মঘা নক্ষত্রে সুর্যের অবস্থান ঠিকঠাক থাকলেও পরিমন্ডলে উত্তুরে হাওয়া নেই। ঠান্ডার বদলে গরম-গরম ভাব। তার দোসর হয়েছে আবছায়া-গুমোট প্রকৃতি। পঞ্জিকায় এখন ভরা মাঘ মাস। ’মাঘের শীত বাঘের গায়’ যেন রঙ্গ-রসিকতা। শীত আসতে না আসতেই পালাই পালাই করছে। ’তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলেই...’—অবস্থা হলো শীতের। রাজধানী ঢাকায় গতকাল সন্ধ্যায় তাপমাত্রা প্রায় গ্রীষ্মের কাছাকাছি ২৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। নতুন করে ঠান্ডা পড়ার মতো কোনও পূর্বাভাস দিতে পারছে না আবহাওয়া দফতরও। হাওয়া বলছে, আর কনকনে ঠান্ডার জন্য অপেক্ষা না করে যেটুকুন আছে সেটাই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করুন। পিকনিকসহ শীত ভ্রমণ সেরে ফেলুন। কারণ এখনো গ্রামীণ জনপদে কিছুটা হলেও শীতের প্রকোপ আছে।
প্রকৃতির কেন এই বৈরী আচরণ? আবহাওয়া কেন এমন লুকোচুরি খেলছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়ায় এমন অস্বাভাবিকতায় প্রকৃতি ও প্রাণী জগতে দেখা দিচ্ছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। শীত কম থাকায় শীতকালীন সবজি চাষিরা চিন্তিত। শীত না পড়লে মহাবিপদ। পোকার আক্রমণ বেড়ে যাবে। ফলন কমে যাবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১০০ বছরে বাংলাদেশে তাপমাত্রা ০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেও ঢাকায় বেড়েছে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গাছপালা একদিকে তাপ শুষে নেয় অন্যদিকে শীতল অক্সিজেন সরবরাহ করে। জলাভূমিও তাপ শোষণ করে। কিন্তু গাছপালা ও জলাভূমি দুটিই ধ্বংস হওয়ায় তাপমাত্রা বাড়ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আবু নাসের খান জানান, বাংলাদেশে যে কেবল শীত বিলম্বিত হচ্ছে তাই-ই নয়, দাবদাহও বাড়ছে। দেশের অন্য জেলার মতো ঢাকার তাপমাত্রাও প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসংখ্যার আধিক্য, নিম্নমানের গণপরিবহন, যানবাহন ও জেনারেটরের ধোঁয়া, বিভিন্ন ভবন ও যানবাহনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বাতাস, পাকা ভবন ও রাস্তাঘাট, সবুজ চত্বর ও গাছপালার অভাব, উন্মুক্ত স্থান, মাঠ, পার্ক ও লেকের অপর্যাপ্ততা, নিম্নাঞ্চল ও জলাভূমির স্বল্পতা, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তন এর অন্যতম কারণ।
সার্ক আবহাওয়া কেন্দ্রের সাবেক বিজ্ঞানী আব্দুল মান্নান জানান, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এবার দেশে শীতের তীব্রতা কমে গেছে। প্রায় প্রতি ৮ থেকে ১২ বছর পর আবহাওয়া রুদ্র রূপ ধারণ করে। ১৯৯৮ সালের বন্যার পর ২০০৪ সালের বন্যা। ২০০৩ সালের পর আর তীব্র শৈত্যপ্রবাহ দেখা যায়নি। উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের কারণেই মূলত শীত নামে। সাইবেরিয়া থেকে উচ্চচাপ বলয় হিমালয় পেরিয়ে এ দেশে প্রবেশ করে। বর্তমানে উপমহাদেশ জুড়ে পশ্চিমা লঘুচাপ বিরাজ করছে। আবহাওয়া দফতরের পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে। ২০০৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ছিল ১৩.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৬ সালে ১২.২, ২০০৭ সালে ১৩.২, ২০০৮ সালে ১৩.৯, ২০০৯ সালে ৯.৪, ২০১০ সালে ১১.২, ২০১১ সালে ১৩.২, ২০১২ সালে ১০.২, ২০১৩ সালে ১১.৭, ২০১৪ সালে ১১.৯, ২০১৬ সালে ১৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এ বছর গতকাল পর্যন্ত গড় তাপমাত্রা ছিল ১৪.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
জার্মান ওয়াচ গোবাল ক্লাইমেট রিক্স ইনডেক্সের (সিআরআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বন্যা, সাইক্লোন, অনাবৃষ্টি, শৈত্যপ্রবাহ, অতিগরম প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে বাংলাদেশের স্বাভাবিক জীবনধারায় প্রতিবছরই আঘাত আসছে।
