সুপারশপে আগ্রহ হারাচ্ছে ক্রেতা

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০১

এক ছাদের নীচে সবকিছু। মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে ফলমূল—কি নেই? আছে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত জিনিসপত্র—তা সে ইলেক্ট্রনিক্স, ঝাড়ু বা হাড়ি-কুড়ি, বাসন পেয়ালা, পোশাক-পরিচ্ছদ, স্টেশনারি জিনিসপত্র যা-ই হোক না কেন। শুধু উচ্চবিত্ত নয়, মধ্যবিত্তরাও আসছে সুপার শপে কেনাকাটা করতে। তবে সন্তুষ্টির পরিবর্তে বেশিরভাগ ক্রেতার হতাশার অভিজ্ঞতাই বেশি। সীমিত আয়ের মানুষদের মাথাব্যথার কারণ সুপারশপগুলোর পণ্যের অতিরিক্ত দাম। এছাড়া বিভিন্ন সময় ভেজালবিরোধী অভিযানে দেখা গেছে, মানুষ সুপারশপের ঝা চকচকে বিশাল ভবনে ঢুকে ‘মানসম্মত পণ্য’ মনে করে অন্ধ বিশ্বাসে যা কিনছে তা আসলেই অনেক ক্ষেত্রে ভেজালযুক্ত কিংবা নিম্নমানের। এসব কারণে আস্থা হারাচ্ছে এই শপগুলো। আর মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করেছে অনেক সুপারশপকে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সুপারশপ থেকে পণ্য কিনলে আর্থিকভাবে লাভবান হবার পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবধারিতভাবে ঠকতে হবে। কারণ এখানে বাজার করলে ক্রেতাদের ভ্যাট দিতে হয়। অথচ ওই একই পণ্য ওই শপের ঠিক বাইরের মুদি দোকান থেকে কিনলে ভ্যাট তো প্রয়োজন হয়ই না, উপরন্তু পণ্যের গায়ে লেখা খুচরা মূল্যের চেয়ে কিছু কমও রাখে দোকানদার।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বর্তমানে এ ব্যবসায় স্থবিরতা বিরাজ করছে। বিভিন্ন কারণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি এ খাতের। সুষুমভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য নীতিমালা প্রয়োজন। কিন্তু সরকার এখনো এ খাতের জন্য কোনো নীতিমালা করেনি। বর্তমানে ২৫ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুপারশপের সাথে জড়িত বলে তারা জানান।

বর্তমানে রাজধানীতে আগোরা, মীনা বাজার, স্বপ্ন, প্রিন্স বাজার, ক্যারি ফ্যামিলি, শপ অ্যান্ড সেফ, আলমাস, ফ্যামিলি কেয়ার, ল্যাভেন্ডার, পিক অ্যান্ড পে, ফ্যামিলি নিডস, চেকার্স ডিজিটাল, আমানা সুপারশপ, ওশেনিয়া, আরবি, জিমার্ট, সপ্তর্ষী, ফ্যামিলি ওয়ার্ল্ড, ফ্যামিলি টাচসহ প্রায় ২০০টি সুপারশপ রয়েছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাতেও অনেক প্রতিষ্ঠানের শাখা রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে বিভিন্ন সুপারশপে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এক ছাদের নীচে সব পণ্য পাওয়া যায় তাই উচ্চ বিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও সুপারশপ থেকে বাজার করতে আসছেন। কর্মজীবীদের কাছে সুপারশপের আলাদা কদর রয়েছে। কিন্তু ভোক্তাদের অভিযোগ— সুপারশপে পণ্যের দাম বেশী নেয়, টাটকা, কীটনাশকমুক্ত শাক-সবজির কথা বলা হলেও অনেক সুপারশপেই সাধারণ মানের শাক-সবজি বিক্রি করা হয়। তার চেয়ে মহল্লায় ভ্যানে করে যে শাক-সবজি বেচে বেড়ায় ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা সেগুলো অনেক সতেজ ও পরিচ্ছন্ন।  মাছ, মাংসের বেলায়ও একই অবস্থা।

রাজধানীর মনিপুরি পাড়ায় অবস্থিত সুপারশপ স্বপ্ন’র আউটলেটের এ্যাসিস্ট্যান্ট অপারেশন ম্যানেজার আকিবুর রহমান দাবি করেন, তাদের সুপারশপে টাটকা ও কীটনাশকমুক্ত সবজি বিক্রি করা হয়। এজন্য জোরালো নজরদারি করেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই আউটলেটে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত খেঁজুরের দাম লেখা আছে ৩২০ টাকা। অথচ বাইরের বাজারে সেই খেজুরের দাম ২৮০ টাকা। দামের এত ব্যবধান কেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন— আমাদের খেজুরের মান ভালো, তাই।

সুপারশপ থেকে বাজার করা প্রসঙ্গে রাজধানীর জনৈক ক্রেতা তানজুম আরা বলেন, এখানে মানসম্মত পণ্য বিক্রয় করা হয়, এমন বিশ্বাস থেকেই আসি। তাছাড়া আমরা চাকরিজীবী পরিবার, খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। এক জায়গাতেই সবকিছু পাওয়া যায় বলে মূলত এখানে আসা হয়।

আরেক ক্রেতা পলি আক্তার বলেন, সুপারশপে অনেক পণ্যের দাম বেশী রাখে। এছাড়া ভালো মনে করে পণ্য কোনো কোনো পণ্য কিনে বাসায় গিয়ে দেখা গেছে তা নিম্নমানের।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, ২০০০ সালে আগোরা ও মিনাবাজারের মাধ্যমে বাংলাদেশে সুপারশপের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করে সুপারশপ ‘স্বপ্ন’। একে একে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলেও ব্যাপকভাবে এ খাতের সম্প্রসারণ হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান একাধিক আউটলেট চালু করলেও পরে লোকসান হওয়ায় আউটলেটের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সুপারশপ ব্যবসার সম্প্রসারণ না হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এ ব্যবসার শুরুতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু মুনাফা আসতে সময় লাগে। এছাড়া এই খাতের সম্প্রসারণে সরকারের যে সহায়তা দরকার তা নেই। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সুপারশপগুলোকে বড় অঙ্কের শুল্ক দিতে হচ্ছে। আর পণ্য বিক্রির ওপর ২ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছে সরকার। এসব কারণে এ শিল্পের বিকাশ থমকে গেছে। মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইউএসডি’এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কায় সুপারশপের দ্রুত বিকাশ ঘটলেও বাংলাদেশে তা হচ্ছে না। শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যা মাত্র ২ কোটি ২০ লাখ। অথচ সেই দেশে সুপারশপ রয়েছে ২৪০টি। আর ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে সুপারশপের সংখ্যা মাত্র ২০০।

বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, এই ব্যবসার সম্প্রসারণ যেভাবে হওয়ার উচিত ছিল তা হয়নি। অথচ ভারত আমাদের পরে এসে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ভেজালবিরোধী অভিযানের কারণে সুপারশপগুলো ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়েছে। এ খাতের বড় বড় কোম্পানিগুলো ভর্তুকি দিয়ে টিকে আছে। তিনি বলেন, সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই এ খাতের বিকাশ সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের উচিত দ্রুত নীতিমালা করা। আমরা নিজেরা নীতিমালা তৈরি করে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে দিয়েছি। কিন্তু তারপরও তা এগোয়নি আছে।