উচ্চ প্রযুক্তির চিকিৎসা সরঞ্জাম বিকল

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১০:৩৯
 
চট্টগ্রাম মেডিক্যালে দীর্ঘদিন যাবৎ উচ্চ প্রযুুক্তির চিকিত্সা সরঞ্জাম বিকল থাকায় অনেকে কঠিন রোগের চিকিত্সা বন্ধ রয়েছে। অতি জনগুরুত্বপূর্ণ এসব সরঞ্জাম অচল থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। গত দুই বছর যাবত্ এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ক্যান্সারের কোবাল্ট মেশিনে চিকিত্সা বন্ধ রয়েছে। গত কয়েকদিন যাবত্ আইসিইউ বিভাগের ১২টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ৭টিতে চিকিত্সাসেবা বন্ধ রয়েছে। ফলে জটিল ও মুর্মূর্ষু রোগীরা চরম অসহায় অবস্থায় পড়েছে।
 
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল সূত্র জানায়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সরঞ্জাম ঘাটতি, যান্ত্রিক ত্রুটি ও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে অচল থাকায় জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রোগীদের পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। চরম বিপাকে পড়েছে দরিদ্র রোগীরা। ব্যয়বহুল রোগ নির্ণয়ের এসব পরীক্ষা প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাব থেকে করতে অনেক টাকার প্রয়োজন। বেশির ভাগ রোগীর পক্ষে তা সম্ভব হয় না। হাসপাতালে ধুঁকে মরতে বসেছে দরিদ্র রোগীরা।
 
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য আলাদা রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগ রয়েছে। এই ওয়ার্ডে রয়েছে উচ্চ প্রযুক্তির রোগনির্ণয় যন্ত্র এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন। দু’টি মেশিন গত দুই বছর যাবত্ অচল অবস্থায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকরা জানান, মেশিন দু’টি অনেক আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। মেরামত খরচও অত্যন্ত বেশি। কিন্তু বিপুল টাকা খরচ করে মেরামত করা হলেও সুফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে নতুন মেশিন স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই। এই ওয়ার্ডে ২টি এক্স-রে মেশিনও নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুভাষ মজুমদার ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, ‘এমআরআই মেশিন অল্পদিনের মধ্যে চলে আসবে। সিটি স্ক্যান এখনো কেনা হয়নি। উন্নতমানের একটি এক্স-রে মেশিন কেনার টেন্ডার হয়েছে। ব্রেস্ট ক্যান্সার পরীক্ষার জন্য একটি মেমোগ্রাফি মেশিন অতি প্রয়োজন। ওয়ার্ডে দক্ষ চিকিত্সক ও টেকনিশিয়ানের চরম শূন্যতা রয়েছে। কোনো মহিলা টেকনিশিয়ান নেই।’
 
রেডিওলজি ও ইমেজিং ওয়ার্ডে প্রতিদিন শত শত রোগী ভিড় জমাচ্ছে, চাহিদা অনুপাতে সেবা পাচ্ছে না। অধিকাংশ রোগী মেডিক্যালের আশপাশে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবে যেতে বাধ্য হচ্ছে। চিকিত্সক সংকটে যথাসময়ে রিপোর্ট ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে কর্মরত চিকিত্সক জানান। এই ওয়ার্ডে ৬ জন চিকিৎসকের স্থলে ২জন চিকিত্সক কর্মরত। একজন চিকিৎসককে সমস্ত রিপোর্ট দেখতে হচ্ছে। টেকনিশিয়ানের সংকট রয়েছে। কোনো মহিলা টেকনিশিয়ান না থাকায় মহিলা রোগীদের পরীক্ষা করতে বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
 
মুমূর্ষু রোগীদের জন্য হাসপাতালে চতুর্থ তলায় রয়েছে আইসিইউ ইউনিট। ভেন্টিলেটরযুক্ত ১৪টি আইসিইউ বেড রয়েছে। এদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত্ ২টি বেড নষ্ট। বাকি ১২টি বেডের মধ্যে ২টি বিশেষ সেবার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। ফলে সাধারণ রোগীরা ১০টি ভেন্টিলেটর যুক্ত বেডের সেবা পেয়ে থাকে। গত এক সপ্তাহ যাবত্ হঠাত্ করে ৫টি ভেন্টিলেটর যুক্ত বেড অচল। এসব আইসিইউ বেডের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চিকিত্সা সেবা বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন মুমূর্ষু রোগী বেড না পেয়ে ফেরত্ যাচ্ছে।
 
যে বিদেশি কোম্পানি এসব আইসিইউ বেড সরবরাহ করেছিল তাদের বাংলাদেশে পরিবেশক ইতোমধ্যে পরিবর্তন হয়েছে। নতুন পরিবেশক অচল আইসিইউ বেডের দায়িত্ব নিচ্ছে না। হাসপাতালের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, নষ্ট হওয়া আইসিইউ বেডের মেরামতের জন্য ওয়ার্ক অর্ডার হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এলসি করেছে। তবে এগুলো আনতে কমপক্ষে ৩/৪ মাস লাগবে। আইসিইউ ওয়ার্ডের চিকিত্সকরা জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রামে সরকারিভাবে একমাত্র চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ১০টি আইসিইউ বেড রয়েছে। কিন্তু রোগীর এতো চাপ সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে মুমূর্ষু রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত কোনো ভেন্টিলেটর নেই। ওয়ার্ডের জেনারেটরটি নষ্ট। কোনো পরিচ্ছন্ন কর্মী নেই। সূত্র জানায়, ভেন্টিলেটর যুক্ত একটি নতুন আইসিইউ বেড স্থাপনে প্রায় ৫০ লাখ টাকার প্রয়োজন হয়। এই ওয়ার্ডে আইসিইউ কনসালট্যান্ট রয়েছে মাত্র ৩ জন। অথচ সার্বক্ষণিক সেবা প্রদানের জন্য কমপক্ষে আরো ৭/৮ জন কনসালট্যান্ট  চিকিৎসক প্রয়োজন।
 
জটিল ক্যান্সারের বিকীরণ চিকিত্সার অতি প্রয়োজন কোবাল্ট মেশিন। চট্টগ্রাম মেডিক্যালে গত এক বছর যাবত্ মেশিনটি নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। এতে চিকিত্সা নিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত রোগী চিকিত্সা না পেয়ে রেডিওথেরাপি বিভাগের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছে। বিভাগে দক্ষ চিকিত্সক ও জনবল থাকলেও তারা অলস সময় কাটাচ্ছেন। চিকিৎসকরা জানান, একটি কোবাল্ট মেশিন হলে দৈনিক প্রায় ২০০ রোগীকে বিকীরণ দেওয়া সম্ভব। চট্টগ্রামে বেসরকারি পর্যায়েও বিকিরণ চিকিত্সার ব্যবস্থা না থাকায় জটিল ক্যান্সার রোগীরা ধুঁকে মরতে বসেছে।