উত্তর কোরিয়া

মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার ঘটছে

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৯:৫৫
 
আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে উত্তর কোরিয়া। রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের আবাসিক ভবনগুলো কয়েক বছর আগেও ছিল বিবর্ণ। কিন্তু এখন স্থানভেদে সবুজ, কমলা ও লাল রঙে রাঙানো। সুপারমার্কেটগুলোয় জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। বিলাসসামগ্রীও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সানরাইজ কাফে এন্ড বেকারি নামক দোকানে এক কাপ লিপটন চায়ের দাম পাঁচ মার্কিন ডলার আর একটি ইতালিয়ান কাপুসিনো বিক্রি হয় আট মার্কিন ডলারে। উত্তর কোরিয়ায় নিযুক্ত বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লুএফপি) উপ-পরিচালক লিও ভ্যান ডের ভেলডেন অতিসম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, ‘অন্তত পিয়ংইয়ংয়ে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এটি সহজেই বোঝা যায়। আমি এবং আমার কোরিয়ান সতীর্থদের সঙ্গে ডিপিআরকে সরকারের সঙ্গে চমত্কার সম্পর্ক। সত্যি বলতে অনেক দেশের সরকারের চেয়ে উত্তর কোরিয়ার সরকারের সঙ্গে ডব্লুএফপি’র সম্পর্ক ভাল।
 
প্রথাগতভাবে উত্তর কোরিয়ানরা সাপ্তাহিক বন্ধের দিন রবিবারে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, যেমন রাস্তা ও ফুটপাত ঝাড়ু দেয়া, ফুল ও ফলের গাছ লাগানো ইত্যাদি। ইদানীং এ ধরনের কাজে অংশ নেয়া লোকের সংখ্যা কমে এসেছে। সম্মিলিতভাবে শ্রম দেয়ার পরিবর্তে অনেকেই ছুটির দিনটিতে বিনোদন বেছে নিচ্ছে। রবিবার রাস্তার পাশে ও পার্কে খাবারের দোকান সাজিয়ে বসে কিছু লোক। গ্রাহকদের বসা ও খাওয়ার সুবিধার্তে তারা প্লাস্টিকের টেবিল-চেয়ার সাজিয়ে রাখে। গান-বাজনার আয়োজন করলে উর্দি পরিহিতরা আর বাধা দেয় না। অর্থাত্ বন্ধের দিনে কাজের বদলে আরাম-আয়েশকে এখন আর অনুত্সাহিত করা হয় না; বিষয়টি ছেড়ে দেয়া হয়েছে মর্জির উপর।
 
উত্তর কোরিয়ার গড়পড়তা পরিবারগুলো খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য পাওয়ার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত বাজারের আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল। ১৯৯০’র দশকের দুর্ভিক্ষের সময় থেকে এসব বিতরণের সরকারি ব্যবস্থা ভেঙে পড়াতেই এমন হয়েছে। অনেক উত্তর কোরিয়ানই জীবিকা নির্বাহ করে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। সম্পদ অর্জন সমাজের উঁচু স্তরে ওঠার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম এটি। যাদের অনেক আছে এবং যাদের কিছুই নেই তাদের মধ্যে ব্যবধান বাড়াচ্ছেও এ ব্যাপারটি। ২০০৫ সাল থেকে বাজারের বিস্তৃতি ও জনগণের সম্পদকে সীমিত রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল তার আসল উদ্দেশ্য ছিল অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু পাওয়া যায়নি এর প্রত্যাশিত ফলাফল। যারা দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি বাজারের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তারা কিছুতেই আর তাদের নিরাপত্তাবেষ্টনি পরিত্যাগ করতে চায় না।
 
কিম জং টু’র আমলের শেষদিকে সরকারের মুদ্রা ‘সংস্কার’ আতঙ্ক ছড়ানোয় সরকার ও সমাজের সম্পর্কের মাঝখানে গড়ে তুলেছিল অবিশ্বাসের দেয়াল। এর কয়েক মাস পরেই উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল এবং সমস্যা সৃষ্টির জন্য দু’জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। সিউলস্থ কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক আন্দ্রে লেনকভ জানিয়েছেন, বেসরকারি অর্থনীতির কাছ থেকে মুক্তি পেতে এবং পুরনো    লেলিনীয় অর্থনৈতিক মডেলে ফিরে যেতে সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বেশ কিছু উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়াতে ২০১০ সালের পর সরকার উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে একা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত  নেয়। বিস্তৃত পরিসরে বলতে গেলে উত্তর কোরিয়ায় এখন বাজার-ভিত্তিক অর্থনীতি চালু রয়েছে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃষ্টি ও এর বিস্তার ঘটাতে সাহায্য করছে। সমালোচনা রয়েছে যে, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য সামাজিক ব্যবধান বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি এটিও স্বীকার করতে হবে যে, নিশ্চিত করেছে কম ভাগ্যবানদের বেঁচে থাকাটা।
 
দেশটির রাজধানী পিয়ংইয়ংসহ বড় শহরগুলোয় পশ্চিমা সামগ্রীর স্রোত বইছে এখন। নির্মাণ করা হচ্ছে ওয়াটার পার্ক, রিসোর্ট, জাঁকজমকপূর্ণ রেস্টুরেন্ট ও থ্রিডি সিনেমা হল।     
 
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির আনুগত্য ধরে রাখতে এবং পিয়ংইয়ংকে বিদেশিদের জন্য আকর্ষণীয় বানাতেই কিম জং উন অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করছেন। সে সুযোগে   শহরগুলো দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার যে বিষয়টি খেয়াল করছে না, সেটি হল শহর ও গ্রাম উভয় স্থানেই ধনী-গরীবের ব্যবধান বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য পিতার সঙ্গে পুত্রের তেমন একটা পার্থক্য নেই।