সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রয়াণ, একটি অধ্যায়ের অবসান

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৯:১৫

বর্ষিয়ান রাজনীতিক, দক্ষ পার্লা-মেন্টারিয়ান, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং আইন, বিচার ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি আর নেই। হাজারো ভক্ত, অনুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। গতকাল রবিবার ভোর চারটা ২৯ মিনিটে রাজধানীর ল্যাব এইড কার্ডিয়াক হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সকাল নয়টায় তার মরদেহ ঢাকার বাসভবন জিগাতলায় নেওয়া হয়। দুপুর ১২টায় মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। বেলা তিনটায় মরদেহ সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের পাশাপাশি এই তিন স্থানেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে শেষবারের মতো দেখতে ও শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গত শুক্রবার অসুস্থ অবস্থায় ল্যাব এইড কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁর ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ে। তিনি হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বরেণ চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে চিকিত্সাধীন ছিলেন। শনিবার রাত ৯টায় তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গতকাল ভোর পৌনে চারটার দিকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়। ডা. বরেন চক্রবর্তী জানান, লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শনিবার রাত ১০ টার দিকে ১৫ মিনিটের জন্য তার হার্টবিট ছিল না। চিকিত্সকদের চেষ্টায় পুনরায় হার্টবিট ফিরে আসলেও তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তাকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের আগ্রহ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকায় দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। প্রসঙ্গত, গত বছর মে মাসে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সুরঞ্জিত। পরে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালেও চিকিত্সা নেন তিনি।

শেষকৃত্য আজ:সুরঞ্জিতের মরদেহ রাতে ল্যাব এইডের হিমঘরে রাখা হয়। আজ সোমবার সকালে হেলিকপ্টারে করে মরদেহ নেওয়া হবে সিলেটে।  সেখানে সকাল দশটায় শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বেলা সাড়ে এগারোটায় মরদেহ নেয়া হবে সুনামগঞ্জে। সেখান থেকে মরদেহ শাল্লা নেয়া হবে দুপুর দেড়টায়। সবশেষ বেলা তিনটায় মরদেহ পৌঁছাবে দিরাই উপজেলার আনোয়ারাপুর নিজ গ্রামে। সেখানেই তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের খালাতো ভাই জয়ন্ত সেন বলেন, আওয়ামী লীগের এই বর্ষীয়ান নেতার শেষ ইচ্ছা ছিল চন্দন কাঠের চিতায় যেন তাকে দাহ করা হয়। জানা গেছে, নিজের হাতে রোপণ করা চন্দন গাছের কাঠ দিয়েই দাহ করা হবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে। ইতিমধ্যেই চন্দন গাছটি কাটা হয়েছে এবং কাঠ আকারে বানানো হয়েছে।

জাতীয় সংসদ চত্বরে শ্রদ্ধা: সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং বিকাল ৩টা ৪২ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় পতাকায় মোড়ানো সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পুস্পস্তবক অর্পণের পর তাঁরা সেখানে কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সুরঞ্জিতের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানের শ্রদ্ধা জানানোর আগে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সুরঞ্জিতের প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। পরে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

এছাড়া ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও প্রয়াত এই সংসদ সদস্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ ধ্রুবেষানন্দ মহারাজ এ সময় বিশেষ প্রার্থনা করেন। শ্রদ্ধা জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে সুরঞ্জিতের জীবনী পড়ে শোনান সংসদের প্রধান হুইপ আ স ম ফিরোজ। পরে সুরঞ্জিতের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখন অভিভাবকহীন। তবে আমি নিজেকে অভিভাবকহীন ভাবছি না। আমাদের পরিবারের সঙ্গে সব সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আছেন। আমাদের এই ক্রাইসিস টাইমে তিনি আমাদের পাশে থাকবেন আশা করি।’ সৌমেন আরো বলেন, ‘আমার বাবা সারা জীবন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেছেন। সবসময় মানুষের উপকার করেছেন। কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে তার কাছ থেকে খালি হাতে ফিরতেন না।’

জাতীয় পার্টি (জাপা), জাতীয় পার্টি (জেপি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, কৃষক, শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী শ্রদ্ধা জানান। দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার শ্রদ্ধা নিবেদনকালে অন্যান্যের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। চিফ হুইপ এএসএম ফিরোজ, অন্যান্য হুইপগণ, ১৪ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষেও মরহুমের কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ১৪ দলের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত্ হোসেন প্রমুখ। অনুষ্ঠান শেষে রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানানোর পর প্রধানমন্ত্রী কয়েক মিনিট মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের সান্তনা দেন। পরে বিভিন্ন সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষ প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে জেপি’র নেতাকর্মীরা বিকালে সংসদ ভবন চত্বরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেপি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক এম সালাহ উদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম প্রচার সম্পাদক মঞ্জুর হাবিব মঞ্জু, যুগ্ম ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সাব্বির আহমেদ করিম, যুব সংহতির সহ-সভাপতি জেট সেলিম প্রমুখ।

ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা: এর আগে দুপুরে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। অন্যান্যের মধ্যে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাইদ খোকন, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য মুকুল বোস, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন সিকদার, ঐক্য ন্যাপের আহ্বায়ক পংকজ ভট্টাচার্য, পূজা উদযাপন পরিষদের জয়ন্ত সেন দীপু, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এটিএম সামসুজ্জামান, সংসদ সদস্য হাজি মো. সেলিম, বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুর রহমান সেলিম, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার আদশ সাইকি, পলিটিক্যাল সেক্রেটারি রাজেশ উইকি প্রমুখ শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে সুরঞ্জিত সেনের মরদেহে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক:সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করে গতকাল পৃথক বাণী দিয়েছেন। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শুধু একজন রাজনীতিকই ছিলেন না, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নেও তিনি অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। সংসদীয় রাজনীতিতে তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় বলেন, ‘তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো। দেশ এক নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদকে হারালো আর আওয়ামী লীগ হারালো দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতাকে।’ তিনি আরো বলেন, সুরঞ্জিত দেশের প্রথম সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যকে হারালো।

অন্যদের শোক :জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ এক শোক বার্তায় বলেন, ‘সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে জাতি আজ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হারালো যা সহজে পূরণ হবার নয়।’

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এক শোকবার্তায় বলেন, ‘বহুমাত্রিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও সামাজিক অগ্রগতির পক্ষে তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা জাতি কোনো দিন ভুলবে না।’ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও পৃথকভাবে শোক জানিয়েছেন।

এছাড়া জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে শোকবার্তায় বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে দেশ একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠককে হারালো। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান এবং সংসদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জেপি নেতৃদ্বয় তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

এছাড়া শোক প্রকাশ করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, পরিকল্পনা মন্ত্রী  আ হ ম মুস্তফা কামাল, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসনুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম, পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, শ্রম ও কর্শসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাকের পার্টির চেয়ারম্যান পীরজাদা খাজা মোস্তফা আমীর ফয়সল মুজাদ্দেদীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন।

ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা এক শোকবার্তায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে খ্যাতিমান, মর্যাদাসম্পন্ন ও বিচক্ষণ নেতা হিসেবে উল্লেখ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে বলেন,‘ বাংলাদেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুরঞ্জিতের সঙ্গে বেশ কিছু অনুষ্ঠানে আমার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হলো।’

‘একটি অধ?্যায় হারালাম’:সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন রাজনীতিবিদরা। তার মৃত্যুর খবরে ছড়িয়ে পড়লে সকালে হাসপাতালে ছুটে আসেন আত্মীয় স্বজনসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সাবেক এই মন্ত্রীর মরদেহ সকাল ৯টার দিকে হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয় তার জিগাতলার বাসায়। অনেকেই সেখানে ছুটে আসেন প্রয়াত এই রাজনীতিবিদকে শেষবার দেখতে। প্রয়াত এ নেতার বাসায় যান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, প্রবাসী কল?্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী প্রমুখ।

এ সময় অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পার্লামেন্ট হ্যাজ লস্ট এ গ্রেট পার্লামেন্টারিয়ান। এ গ্রেট লস। সে আপাদমস্তক পলিটিশিয়ান ছিল। সংসদে দাঁড়ালেই হত।’ গত ২৯ জানুয়ারি সর্বশেষ জাতীয় সংসদে বক্তৃতা দেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস?্য সুরঞ্জিত। সুরঞ্জিতকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সংসদ সদস্য হিসেবে তার বয়স ও বাংলাদেশের পার্লামেন্টের বয়স একই। তার সময়ের শুধু তোফায়েল ও হামিদ সাহেব এখনও আছেন।’

সুরঞ্জিতের শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পর প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘একজন ব?্যতিক্রমধর্মী প্রখর যুক্তিবোধ ও হাস?্যরসে পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অধ?্যায়কে আমরা হারালাম।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘সংবিধান প্রণয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বে কেউ যদি আঘাত করার চেষ্টা করত, তাহলে উনি মন্ত্রী থাকা অবস্থাতেও তার প্রতিবাদ করতেন।’

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, স্থানীয় এমপি ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগ নেতা হাসান মাহমুদ, খালিদ মাহমুদ চৌধুরীও জিগাতলায় এসেছিলেন প্রয়াত এই সংসদ সদস্যকে শেষবার দেখতে।

এদিকে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, ‘আইনের বিষয়ে কোনও জটিলতা তৈরি হলে সবাই তাঁর কাছে যেতেন। তিনি চলে যাওয়ায় তারমতো আস্থাভাজন লোক পেতে হয়তো আমাদের অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।’

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘উনাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যায় না। সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে উনি সামনের কাতারের সৈনিক ছিলেন।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘তার মতো অভিজ্ঞ, সত্ ও নিষ্ঠাবান নেতা বিরল। রাজনৈতিক সঙ্কটে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখতেন।’

ষাট দশকের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘বহুমাত্রিক গুণের ব্যক্তি ছিলেন সুরঞ্জিত।’ অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান বলেন, ‘তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ।’ জাসদ (একাংশ) সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন যাবত্ তার অনুপস্থিতি অনুভব করবে।’

সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যুতে বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এটা সহজে পূরণ হবে এটা মনে করার কারণ নেই।’

ঝিগাতলায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাসায় তার মরদেহ দেখতে গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমসুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘তার মতো আর একজনও পার্লামেন্টারিয়ান নেই।’