সাতবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মোট ২৮ বছর ছিলেন জাতীয় সংসদে। সুনামগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে চলতি দশম সংসদেরও সদস্য ছিলেন তিনি। উপমহাদেশের বিখ্যাত এই পার্লামেন্টারিয়ান সংসদে শেষ বক্তব্য রাখেন গত ২৯ জানুয়ারি রবিবার। ওইদিন সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটি এবং জাতিসংঘসহ কূটনীতিকদের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ নিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। গতকাল রবিবার সংসদে তার উপর আলোচনার সময় সেই শেষ বক্তব্যের কথা স্মরণ করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়াসহ অনেকেই।
সংসদে সেইদিনের বক্তব্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন, ‘নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি যে সার্চ কমিটি গঠন করেছেন তা গোটা জাতির কাছে গ্রহনযোগ্য হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘসহ পৃথিবীর কোনো দেশ কোনো স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে পারে না। জাতিসংঘ যদি আমাদের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে চায় তাহলে জাতি হিসেবে আমরা খুব বিব্রত হব। বিএনপির এখন আর কোনো কথা থাকলে সার্চ কমিটির কাছে তা তুলে ধরতে পারে। নতুন ইসি গঠন ও সার্চ কমিটি নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা কথা চলছে। এ ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আমরা যে যতবড় নেতাই হই না কেন, আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির অবস্থান নিয়ে কোনো কথা বলতে পারব না। একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য ইসি গঠনে বিএনপির যদি ভালো কোনো প্রস্তাব থাকে, তাহলে আমরাও সেটিতে শতভাগ একমত। বরং আমরা এখন যেই চর্চা করছি সেটি আমাদের সাংবিধানিক অজ্ঞতা ও সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী। কারণ সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের ঊর্ধ্বে, তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আমাদের কারও নেই। সুতরাং আমি মনে করি ইসি গঠন নিয়ে যেই সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে সেখানে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই আমাদের সামনে এগোতে হবে। জাতিসংঘের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল, তাদের কোনো বক্তব্য থাকলে তারা আমাদের সংবিধানের ভেতরে থেকে বলতে পারে, এর বাইরে বলে আমাদের বিব্রত করা তাদের উচিত হবে না। তাদের কোনো বক্তব্য থাকলে তারা সেটি কূটনৈতিক চ্যানেলে বলতে পারেন, তা না করে কোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ঢোকা একেবারেই অনৈতিক হবে।’
শেষ বক্তব্যে সুরঞ্জিত আরও বলেছিলেন ‘সুযোগ এখনও চলে যায়নি। বিএনপি বলছে তারা নাকি ঘর পোড়ানো ও গরু মারা বাদ দিয়ে সাংবিধানিক রাজনীতিতে ফিরেছে। ফিরতে হলে সংবিধানের প্রতি তাদেরকে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত বিচক্ষণার সঙ্গে যেই ধরনের সার্চ কমিটি করেছেন-এমন সুন্দর সিদ্ধান্ত আমি অতীতে আর দেখিনি। সুতরাং এনিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার না করে সাংবিধানিক উপায়ে বিএনপি কথা বলতে পারে। আমরাও আমাদের কথা রাষ্ট্রপতিকে বলে এসেছি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেই সেদিন বলেছেন-সংবিধানের মধ্যে থেকেই ক্ষমতার প্রয়োগ করতে হবে। এর বাইরে কিছু করার ক্ষমতা রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সার্চ কমিটি গঠন করেছেন। কমিটিতে বিচার বিভাগের দু’জনকে রেখেছেন, যারা আগে থেকেই সাংবিধানিক শপথপ্রাপ্ত। মহাহিসাবরক্ষকও শপথপ্রাপ্ত। পিএসসি’র চেয়ারম্যানও সাংবিধানিক পদ। এর বাইরে দু’জন শিক্ষক রয়েছেন যাদের প্রতি মানুষের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। কমিটি গঠনের পর দেখলাম-বিএনপি এনিয়ে প্রশ্ন তুলতে চেয়েছে। রাষ্ট্রপতির এই কমিটি গঠন নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কারও নেই। বিএনপিকে সাংবিধানিক রাজনীতি করতে হলে সংবিধান পড়ে-জেনেই কথা বলতে হবে। কমিটি গঠন নিয়েও বিএনপির দুই নেতার দুই মত। মওদুদ আহমদ বললেন-ভালো কিছু প্রত্যাশা করছি, দলের মহাসচিব (মির্জা ফখরুল) বললেন- এই কমিটি গ্রহণ বা বর্জন কোনটিই নয়।’
সুরঞ্জিতের সেই বক্তব্য স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ওইদিন এমপিদের অধিকার নিয়ে তিনি কথাগুলো বলে গেছেন। স্পিকার শিরীন শারমিন বলেন, সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের উপর ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য রেখেছেন তিনি। ডেপুটি স্পিকার বলেন, আমার সৌভাগ্য আমি তখন সংসদে সভাপতিত্ব করছিলাম।
