বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস যে মানুষটি ছাড়া অনেকাংশে অপূর্ণ তিনি ঋত্বিক ঘটক। যে সময়ে বাংলা চলচ্চিত্র আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া থেকে অনেকটাই দূরে ছিল সেসময় তার নির্মিত চলচ্চিত্র পুরোবিশ্বে তাক লাগিয়ে দেওয়া মতো।
চলচ্চিত্রের এই গুণী মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান আজকের এই দিনে ১৯৭৬ সালে। তখনো তার চলচ্চিত্র দণ্ডিত অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকতো সিনে ফেস্টিভ্যালের দরোজার বাইরে। ঋত্বিক নিজেই নিজের সংজ্ঞায়ন করে গেছেন তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’-তে। যা মুক্তি পায় তার মৃত্যুর পর ১৯৭৭ সালে।
সেখানেই তিনি নিজের সম্বন্ধে ব্যবহার করেছিলেন ‘ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল’ শব্দ-যুগল। অথচ তিনিই বাংলা চলচ্চিত্রে একমাত্র, যিনি যুগপৎ সংগ্রহ করেছেন ইতিহাসের উপকরণ এবং পুনর্বিন্যাস করেছেন মৃত্তিকার অধিকারে। তার চলচ্চিত্রে মানুষের আত্মার বিবরণী নথিভুক্ত হয়েছে স্ব-জাতির রাজনৈতিক মনীষার আলোকে। তার সমসাময়িক সত্যজিৎ রায় ঋত্বিককে দেখেছেন স্ব-জাতির ইতিহাসের প্রতি নিষ্ঠাবান এক শিল্পী হিসেবে। বস্তুত এর বাইরেও ঋত্বিক আসলে নির্মাণ করেছিলেন একটি প্রতি-প্রস্তাব, যা তৎকালীন বা বর্তমানেও চলচ্চিত্রের চিরায়ত পথকে অনুমোদন করে না। ‘সিনেমায় গল্পের যুগ শেষ’, কী অসামান্যভাবেই না এই উচ্চারণে তিনি গল্প কেন্দ্রিকতা বাদ দিয়ে ওষ্ঠলগ্ন হয়েছিলেন চিন্তার।
আজ যখন তার মাত্র ৮টি চলচ্চিত্রের সামনে নিবিড়ভাবে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করি পশ্চিমের তারাকোভস্কির মতো পূর্ব দেশে এই ৮টি কাহিনীচিত্রের সূত্রেই ঋত্বিক হয়ে উঠেছেন আমাদের চলচ্চিত্রের আধুনিকতার নির্বিকল্প অংশ। ঋত্বিকের অবিশ্বাস্য আনুগত্য ছিল বাংলার মাতৃমুখে। তবুও আজ বাংলা চলচ্চিত্রের নানা আড্ডায় যতটা সসম্ভ্রমে উচ্চারিত হয় বুনুয়েল বা বার্গম্যান ততোটা সহজেই যেন ভুলে যাওয়া যায় ঋত্বিককে।
ইতিহাসনিষ্ঠ এই দাশু জীবনের শেষদিনটি পর্যন্ত স্ব-জাতির প্রতি গভীর মমতা নিয়ে দৃঢ় উচ্চারণ করেছেন, ‘ভাবনার জগতে একদিনও বেঈমানি করিনি।’ অথচ এই শিল্পী আজো আমাদের কাছে এক অচর্চিত বর্ণমালাই রয়ে গেল!
ইত্তেফাক/এমএআর
