কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে নবগঠিত নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন মত আছে। নতুন ইসিকে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের মিত্ররা স্বাগত জানালেও সংসদের বাইরে থাকা দলগুলো সমালোচনার নানা তথ্য-উপাত্ত হাজির করছে। দলগুলোর বাইরে বিশিষ্ট নাগরিকদের অনেকেও বহুমত দিচ্ছেন। বহুমুখী এই বিতর্ক সম্পর্কে কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের অভিমত, নির্বাচন কমিশন আসলে মূল সমস্যা নয়, প্রধান সংকট আস্থায়। আর এই আস্থা ফেরাতে হলে প্রথমেই দরকার দলগুলোর নিজেদের মানোন্নয়ন, এরসঙ্গে প্রশাসন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দলনিরপেক্ষ ভূমিকাও অপরিহার্য। এই দুটো বিষয় ঠিক করা গেলে ইসির উপর যেমন আস্থা ফিরবে, তেমনি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনও সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক গতকাল বুধবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এই আস্থার সংকট হঠাত্ করে হয়নি। যুগ যুগ ধরে আমরা এই সংকটের মধ্য দিয়েই চলছি। আস্থার এই সংকট কাটাতে হলে আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মান উন্নত করতে হবে, তাদেরকে উন্নত চরিত্রের হতে হবে। কারণ দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র না থাকলে এবং তাদের চরিত্র উন্নত মানের না হলে ইসির একার পক্ষে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। আস্থা ফেরানোর মূল দায়িত্বটি সরকারের। এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর অনেক দেশে সরকারপ্রধান দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য কমিশনারদের খুঁজতে গঠিত সার্চ কমিটির সঙ্গে দুই দফায় যে ১৬ বিশিষ্ট নাগরিক মতবিনিময়ে অংশ নিয়েছিলেন-তাদের মধ্যে অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকও ছিলেন। নতুন ইসি কীভাবে আস্থা ফেরাতে পারে, সে ব্যাপারে তিনি বলেন- ইসি কী করতে পারে! তারা বড়জোর দলগুলোকে ডেকে তাদের কথা বা ওজর-আপত্তি শুনতে পারে, আইন অনুযায়ী কোথাও কিছু করার থাকলে তা করতে পারে, এর বাইরে ইসির তেমন কিছু করার নেই। আমাদের এখানে যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে, সেখানে যদি পরিবর্তন না আসে তাহলে কেবল ভোটাভুটি দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে না। কারণ ভোটাভুটি গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদন, আবার ভোটাভুটি সম্পূর্ণ গণতন্ত্র-বিরোধীও হতে পারে। যেমন হিটলার প্রচ্ল জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু গণতন্ত্র না থাকায় তিনি ইতিহাসে সমালোচিত। তার মতে, ইসির একার পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। ডিসি, এসপি, ওসি, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রিসাইডিং অফিসার-অর্থাত্ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ ভূমিকা না রাখে তাহলে কখনও ভালো নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। আসলে প্রশাসনের উপর যে আস্থার সমস্যা, সেখান থেকেই আমরা এখনও মুক্ত হতে পারিনি।
আস্থার সংকটের দীর্ঘনের সমস্যা রাতারাতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বলে মত দিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ-টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও। তিনি গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন, কারও হাতে এমন কোনো ম্যাজিক নেই যে-হঠাত্ করে আস্থা ফিরে আসবে। এবার যে নতুন কমিশন হলো তা নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন দিক থেকে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। তবে আমার মনে হয়, কমিশনটা আরও ভালো হতে পারতো। এমনও আমরা শুনছি যে, সার্চ কমিটি যাদের নাম সুপারিশ করেছিল-তাদের মধ্যে বরং অধিকতর যোগ্যরাই কমিশনে স্থান পাননি।
ইফতেখারুজ্জামানের মতে, বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও এই কমিশনের পক্ষে ভালো কিছু করা সম্ভব। তারা যদি সবার সঙ্গে সমান আচরণ করেন তাহলে ভালো নির্বাচন উপহার দেওয়া একেবারে অসম্ভব নয়। কিন্তু এটা আশা করা খুব কঠিন। কারণ এই অবিশ্বাস আমাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। দ্বন্দ্বের রাজনীতি ও অসহিষ্ণুতা আস্থা সংকটের অন্যতম কারণ। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গণ যেন বহুধা বিভাজিত, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোও নড়বড়ে।
অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের মত প্রশাসনের নিরপেক্ষতার উপর জোর দেন ড. ইফতেখারও। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকার বিষয়ে ইফতেখার বলেন, আস্থার সংকটের অন্যতম কারণ প্রশাসন। আমরা যদি একেবারে স্বপ্নের এবং বিতর্কমুক্ত, উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনও পাই-কিন্তু প্রশাসন যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয় তাহলে কোনদিনই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। এখানে একথা পরিস্কার যে, ইসির একার পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। আমরা সাধারণ নাগরিকরা শুধু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আশাই করতে পারি, কিন্তু সেটার বাস্তবায়ন করতে হবে ক্ষমতাসীনদেরই।
সার্চ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময়ে অংশ নেওয়া ‘জানিপপ’ চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্যাহও আস্থার সংকটের জন্য প্রধানত রাজনৈতিক দলগুলোকেই দুষছেন। তিনিও ইত্তেফাককে বলেন, এই আস্থার সংকট আসলে দলগুলো নিজেরাই তৈরি করেছে। দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার অভাব। শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর বহু দেশেই এমন পরিস্থিতি বিরাজমান। তবে বাংলাদেশে এই সংকটের অন্যতম কারণ হচ্ছে বারবার সেনাশাসন। সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় এসে রাজনীতির যে নীতি গ্রহণ করেছিল, মূলত সেটাই এই সন্দেহের দেয়াল তৈরি করে সেটি দিনেদিনে উঁচু করেছে। দলগুলোর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সেটিরই প্রভাব পড়েছে নির্বাচন কমিশনের উপর।
ড. কলিমউল্যাহ বলেন, আমরা যেই নির্বাচন কমিশনই গঠন করি না কেন, মাইক্রোস্কোপের নিচে ফেলে তার দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করা সম্ভব। চাকরিজীবনে বা অতীতে কে কি করেছেন, সেটি ধর্তব্য নয়। মূলকথাটি হলো- তারা অর্পিত দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করছেন কিনা। আস্থার সংকট কাটাতে হলে কমিশনকে অবশ্যই দফায় দফায় দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়েও সংলাপ করতে হবে। একইসঙ্গে গণমাধ্যমকে আস্থায় নিয়ে ইসিকে সামনে এগোতে হবে। রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিক সবাই মিলে চেষ্টা করলে দীর্ঘদিনের এই আস্থা সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে না।
