১৯৯৩ সাল। রাজবাড়ির গোয়ালন্দের নিকটস্থ খানখানাপুর ইউনিয়নের আহলাদিপুর গ্রামে একটি পাটের প্লট দেখতে পান পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) তিন বিজ্ঞানী। প্লটটি ছিল কাটাবিহীন মেস্তার একটি স্থানীয় জাত। গাছের উচ্চতা ৪ থেকে সাড়ে ৪ ফুট। প্রজননের দিক থেকে মূল্যবান কাটাবিহীন মেস্তার জাত অনুসন্ধান করছিলেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা উক্ত প্লট থেকে কয়েকটি গাছ সংগ্রহ করে কাটিং এর মাধ্যমে বীজ উত্পাদনের ব্যবস্থা নেন। পরবর্তীতে বীজ বর্ধন করে গবেষণা শুরু করেন। এভাবে ১৯৯৪ থেকে ২০১৪ দীর্ঘ ২০ বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে উদ্ভাবন করেন নতুন জাত।
উঁচু, মাঝারি উঁচু, খরা পীড়িত চরাঞ্চলের পতিত বেলে জমি এবং শুষ্ক অঞ্চলের প্রান্তিক জমিতে আবাদের জন্য এ নতুন জাত উপযোগী। প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা চন্দন কুমার সাহা জানিয়েছেন, মসৃণ মেস্তার এ জাতটি আগের জাত থেকে কৃষকদের নিকট অধিক পছন্দীয় হবে। এ জাতের শিকড় মাটির গভীরে যায় বলে এটি খরা সহিষ্ণু। জাতটির প্রস্তাবিত নাম বিজেআরআই মসৃণ মেস্তা-৩।
জাতের ফলন বিষয়ে কৃষি বিজ্ঞানী আল মামুন বলেন, অনুকূল আবহাওয়া ও উপযুক্ত পরিচর্যায় এ জাতের শুকনো আঁশের সর্বোচ্চ ফলন প্রতি হেক্টরে সাড়ে ৩ টন। আর কৃষকদের জমিতে হেক্টর প্রতি গড় ফলন আড়াই থেকে ৩ টন। কৃষক পর্যায়ে এইচএস-২৪ জাতের চেয়ে এসএএমইউ-৩ এর ফলন শতকরা ৫ ভাগ বেশি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (কৃষি) ড. রহিমা খাতুন বলেন, মাঠ পর্যায়ের কাজ শেষ। মূল্যায়ন ভালো। এখন টেকনিক্যাল কমিটিতে অনুমোদনের জন্য যাবে। সেখানে অনুমোদন পাওয়া গেলে এটি জাতীয় বীজ বোর্ডে যাবে। সেখানে জাতটি অনুমোদন পাবে এমনটিই আশা প্রকাশ করছেন তিনি। তিনি আরো বলেন, এ জাতটি ছাড়াও এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি আরো দুটি নতুন জাত উদ্ভাবন করছে। যার প্রস্তাবিত নাম বিজেআরআই দেশি পাট-৯। অন্যটি বিজেআরআই তোষা পাট-৭। এ তিনটি জাত কৃষকরা আবাদ করলে বর্তমানের চেয়ে ৫ ভাগ ফলন বাড়বে। গত মৌসুমে ৯০ লাখ বেল পাট উত্পাদিত হয় বলে তিনি জানান।
প্রস্তাবিত বিজেআরআই দেশি পাট-৯ : নাবী বপনযোগ্য দেশি জাত সিভিএল-১ এর সঙ্গে ধবধবে আঁশ এবং নীলাভ বীজের দেশি পাটের জার্মপ্লাজম এর সংকরায়নের মাধ্যমে এ জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।
প্রচলিত জাতের তুলনায় এ জাতের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বল্প মেয়াদি জাত। কাণ্ড সবুজ, পাতার বোটার উপরিভাগ হালকা লাল রং, পাতা বল্লমাকৃতি এবং মাকড়ের আক্রমণ সহিষ্ণু। তিন চার ফসলি শস্যক্রমে ব্যবহার উপযোগী অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এ জাতটি।
প্রস্তাবিত বিজেআরআই তোষা পাট-৭ : এই জাতটি দ্রুত বর্ধনশীল ও অধিক ফলনশীল। এই জাতটি উগান্ডা থেকে সংগৃহিত জার্মপ্লাজম থেকে বিশুদ্ধ সারি নির্বাচনের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ জাতটি বাংলাদেশের ভূমি ও আবহাওয়ায় উপযোগী। এর আঁশের অংশ উজ্জ্বল সোনালি এবং প্রচলিত জাতের চেয়ে উন্নত। এটির ছালের পুরুত্ব বেশি এবং পাট কাঠি তুলনামূলক শক্ত। এ জাতটি অন্যান্য জাতের তুলনায় নেমাটোড প্রতিরোধী।
তথ্য অনুযায়ী, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী এ পর্যন্ত পাট এবং পাট জাতীয় ফসলের ৪৫টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। যার মধ্যে দেশি পাট ২৪টি, তোষা পাট ১৫টি, কেনাফ ৪টি। উক্ত ৪৫টি জাতের মধ্যে বর্তমানে দেশি পাটের ৯টি, তোষা পাটের ৬টি, কেনাফের ৩টি এবং মেস্তার ২টি জাতসহ ২০টি জাত কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদ হচ্ছে। এছাড়া পারমাণবিক কৌশল ব্যবহার করে বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ২টি পাট এবং ১টি পাটশাকের জাত উদ্ভাবন করেছে।
ইত্তেফাক/নূহু
