যাবজ্জীবন সাজা মানে আমৃত্যু কারাবাস মর্মে আদেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একটি হত্যা মামলার আপিল খারিজের রায়ে দুই আসামির ফাঁসির দণ্ড কমিয়ে এই সাজা দিয়েছে আদালত। আপিল বিভাগ বলেছে, যাবজ্জীবন মানে (ন্যাচারাল লাইফ) আমৃত্যু কারাদণ্ড।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এই আদেশ দেন। রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, আপিল বিভাগ আদেশে বলেছেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ ৩০ বছর নয়, বরং আমৃত্যু দণ্ড। স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে জেলে থাকতে হবে।
তবে এ সিদ্ধান্ত অন্য মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ে কি বলে, সে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আসামি পক্ষের অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস-এই ব্যাখ্যা আপিল বিভাগ যদি রায়ে উল্লেখ করে দেন তাহলে এটি সকল আসামির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
এদিকে গতকাল ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে যাবজ্জীবন দণ্ডের মেয়াদ নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, লাইফ ইমপ্রিজনমেন্ট মানেই হচ্ছে আমৃত্যু কারাদণ্ড। ‘লাইফ ইমপ্রিজনমেন্ট বলতে আগে কিছু ছিল না, ছিল ট্রানসপোর্টেশন ফর লাইফ। এর মানে হলো-দীপান্তর করা। দীপান্তরের প্রশ্ন উঠে গেলে এরপর করা হলো ইমপ্রিজনমেন্ট ফর লাইফ। এটা হলো আমৃত্যু। কিন্তু সময় বিবেচনার জন্য এখন ৩০ বছর হিসেবে গণ্য করা হয়।’
তিনি বলেন, ৩০ বছর জেল খাটার পর ভালো আচরণের কারণে ছাড়া পাওয়ার যোগ্য হলে সেই বিবেচনায় ছেড়ে দেওয়া হয়। সে জন্যই সেটাকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ৩০ বছর। সেই ৩০ বছরও ৩০ বছর নয়।
২০০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জামান ইয়াসিনকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ওই হত্যার ঘটনায় জামানের পিতা মো. সিরাজুল ইসলাম সাভার থানায় পরদিন একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, চারবাগ মাদ্রাসার সামনে জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার লাশ ওই মাদ্রাসার তিন রাস্তার মোড়ে অলিউল্লাহর দোকানের পূর্বপার্শ্বের পাকা রাস্তার ওপর পড়ে ছিল। আসামি আনোয়ার, আতাউর মৃধা ও কামরুল তাদের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে পূর্ব পরিকল্পনামাফিক এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।
এ ঘটনার তদন্ত করে ২০০২ সালের ২৭ জুলাই তিন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। পরে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ২০০৩ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক মো. জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে রায় দেন।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামি আতাউর ও আনোয়ার। পলাতক থাকায় আপিল করার সুযোগ পাননি কামরুল। একইসঙ্গে মামলাটি ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে আসে। ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল হক ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর ডিভিশন বেঞ্চ আপিল খারিজ করে দিয়ে তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আতাউর ও আনোয়ার। আপিলে ফাঁসির দণ্ড মওকুফ চাওয়া হয়। গতকাল ওই আপিলের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও মনসুরুল হক চৌধুরী এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ শুনানি করেন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আসামিদের আবেদন খারিজ করে দেয়। একইসঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আসামিদের যাবজ্জীবন সাজা দেয়। আদালত বলে, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্য কারাদণ্ড।
এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, সাভারের একটি হত্যা মামলায় আসামিরা শুধু সাজা কমাতে আপিল করে। আদালত মৃত্যুদণ্ড থেকে তাদের সাজা যাবজ্জীবন করেছে। আদালত আদেশে বলেছে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ ৩০ বছর নয়, বরং আমৃত্যু। আসামিপক্ষ এ সময় বলেছেন, দণ্ডবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন অর্থ ৩০ বছর। তখন প্রধান বিচারপতি বলেছেন, রায়ে এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হবে। এখন থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এখনই এটা বলা যাবে না। এখানে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আইনে ৩০ বছর আছে বলে উল্লেখ করেছেন। তখন প্রধান বিচারপতি বলেছেন, আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে দেখাবেন ৩০ বছর নয়।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, একটি হত্যা মামলায় আপিল বিভাগ তিনজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু (ন্যাচারাল লাইফ) কারাবাস। তখন আমি বলেছি দণ্ডবিধির ৫৭ ধারায় যাবজ্জীবন দণ্ড অর্থ সর্বোচ্চ ৩০ বছর। আইনের বিধান যখন ৩০ বছর আছে তখন আমৃত্যু কারাবাস দেওয়া উচিত হবে না। আমৃত্যু কারাবাস যদি দেওয়া হয় তাহলে জেলখানায় কয়েদিরা বিভিন্ন রেয়াত পান তখন তা অকার্যকর হয়ে যাবে। এ রেয়াতেরই কি হবে? আমি আশা করছি মূল রায়ে এ ধরনের কোনো মন্তব্য থাকবে না।
ইত্তেফাক/নূহু
