অনেকদিন বৃষ্টি হয় না। পাতা ঝরানো বাতাসেও গতি নেই। রাজধানী ঢাকার প্রাকৃতিক দৃশ্যপট এখন ধূসর-বিবর্ণ। সড়কদ্বীপ, ডিভাইডার, রাস্তার গা ঘেঁষে এবং এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে গাছপালা বৃক্ষ লতাগুল্ম আছে; তারা এখন আর সবুজ নেই। পাতায় পাতায় জমেছে ধুলার পুরু আস্তরণ। ধুলা-দূষণে বদলে গেছে রঙ। আসাদ অ্যাভিনিউর সড়কদ্বীপে রঙ্গন গাছের ফুলগুলোও কালচে হয়ে গেছে। সড়ক-অলিগলিতে যানবাহন চলছে ধুলা উড়িয়ে। যাত্রাবাড়ির ট্রাফিক পুলিশের ছাতার রঙও পাল্টে গেছে। রাস্তায় বেরুলেই নাকে-মুখে ঢুকছে ধুলা। সাবধানী পথচারী মুখে রুমাল- মাস্ক (মুখবন্ধনী ) বেধে চলাফেরা করছেন। ধুলারা বাতাসে ভেসে ভেসে ঘর-দুয়ারও মলিন করে দিচ্ছে। অনেকটা কবিগুরুর ’জুতা আবিষ্কার’ কবিতায় উত্কীর্ন দৃশ্যপট যেন, ‘ধুলায় কেহ মেলিতে নারে চোখ, ধুলার মেঘে পড়িল ঢাকা সূর্য। ধুলার বেগে কাশিয়া মরে লোক, ধুলার মাঝে নগর হল উহ্য।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার বাতাসে ভাসছে ক্ষতিকর ধুলা-বালি। বিষিয়ে উঠছে পরিবেশ। এলার্জি ও শ্বাসকষ্টসহ রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন নগরবাসী। দূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনক। বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ, রাস্তা সংস্কার কিংবা গ্যাস, পানি, পয়োনিষ্কাশন ইত্যাদি পরিষেবার ভূগর্ভস্থ সংযোগ মেরামতের জন্য সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে উন্মুক্তভাবে। নিয়ম অনুযায়ী নির্মাণ এলাকা ঘেরাও করে কাজ করার কথা থাকলেও তা না করে মাটি, বালি, পাথর ইত্যাদি রাস্তার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হচ্ছে দিনের পর দিন। ফলে গাড়ির চাকায় সেগুলো পিষ্ট হয়ে ধুলা ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। ধুলার রাজত্বে অসহায় হয়ে পড়েছেন রাজধানীবাসী। ধুলার কারণে একদিকে বেড়েছে ভোগান্তি, অন্যদিকে রোগবালাই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বাতাসে ধুলার দূষণ অতীতের সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানীবাসী। বিশেষ করে নির্মাণ এলাকার বাসিন্দা ও পথচারীদের দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্যান্সার, শ্বাসকষ্টসহ জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিশুরা রয়েছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বছরের অন্য সময়ের (এপ্রিল-অক্টোবর) চেয়ে শীতে (নভেম্বর-মার্চ) সূক্ষ্ম বস্তুকণার কারণে বায়ুদূষণের মাত্রা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। এ সময়ে বাতাসে সবচেয়ে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম বস্তুকণা বা পিএম ২.৫ অস্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। শীতকালে অপেক্ষাকৃত স্থূল বস্তুকণার মাত্রাও অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) এক গবেষণায় দূষিত বাতাসে ৯৭০টি সিনথেটিক কেমিক্যাল নিরূপণ করা সম্ভব হয়েছে- যেগুলোর মধ্যে ৪৬৪টি’র কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এগুলো বেশির ভাগই পানির সঙ্গে মেশে না। যার ফলে এগুলো ধুলার সঙ্গে বাতাসে উড়তে থাকে। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে গিয়ে ধীরে ধীরে ফুসফুসে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। ধুলাযুক্ত বাতাস গ্রহণের ফলে প্রাথমিকভাবে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি হবে অনেক বেশি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর মগবাজার, মালিবাগ,শান্তিনগর,পল্টন,খিলগাঁও,বাসাবো,বাড্ডা,বনশ্রী,রামপুরা,মেরাদিয়া,নতুন বাজার,সায়েদাবাদ,যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী,গুলিস্তান,বাবুবাজার,রায়েরবাজার,ধানমন্ডি,কাকরাইল,কাওরান বাজারসহ অন্যান্য এলাকা ধুলায় আচ্ছাদিত। এতে করে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রতিদিন ঘরবাড়ির ধুলা পরিষ্কার করতে গিয়েও গলদঘর্ম হচ্ছেন অনেকে। এমনকি পাঁচ-ছয় তলার ওপরে ঘরের আসবাবপত্রের ওপর ধুলার পুরু আস্তরণ পড়ছে। জামাকাপড় ও ঘরদোর পরিষ্কার রাখতে গিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে গৃহিনীদের।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, ঢাকার পাশে ইটভাটা, বৃষ্টিহীনতা, নির্মাণকাজ এবং প্রতিদিন রাস্তায় জমা ধুলা-বালু ঠিকমতো অপসারণ না করাই রাজধানীতে ধুলা দূষণের মাত্রা বৃদ্ধির কারণ। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক বরকত উল্লাহ বলেন, অতিরিক্ত ধুলা মানুষের শরীরে নানা জটিল রোগ যেমন- চুলকানি, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সার, হাঁপানি ও যক্ষ্মাজনিত রোগ সৃষ্টি করতে পারে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ধুলাদূষণের ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা।
ধুলা দূষণে রাজধানী ঢাকায় অস্বাভাবিকভাবে রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে কিছুদিন আগে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস এন্ড ডেভেলপমেন্ট’র (বিসিএইচআরডি) যৌথ উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয় । সেখানে বক্তারা বলেন, ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে ধুলা দূষণের কারণে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৪ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। তাই এই সর্বগ্রাসী ধুলা দূষণ বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সংগঠন দু’টির পক্ষ থেকে ধুলা দূষণ প্রতিরোধে নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার করা, রাস্তা খননে সৃষ্ট মাটি সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলা, দালানকোঠা বা অন্যকোন অবকাঠামো তৈরির সময় নির্মাণ সামগ্রী রাস্তার উপর বা রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় না রাখা, যেসব সামগ্রী থেকে ধুলার সৃষ্টি হতে পারে সেসব বহনের সময় সঠিক আচ্ছাদন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া, ড্রেন থেকে তোলা আবর্জনা রাস্তার পাশে জমিয়ে না রাখা, সকল আবর্জনা যথাযথ স্থানে ফেলা, সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা সংগ্রহ ও পরিবহণের সময় যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা, ফুটপাতসমূহ নিয়মিত পরিষ্কার করা, ধুলা দূষণ ও এর ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে নাগরিক সচেতনতা তৈরির জন্য সরকারি, বেসরকারি সংগঠন ও সচেতন মহলের যথাযথ দায়িত্ব পালন করার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর এই ধুলা সমস্যা নিয়ে দুই সিটি করপোরেশনের কোনো মাথাব্যথা নেই। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কয়েকটি এলাকায় দিনে একবার বা দুইবার করে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা থাকলেও উত্তর সিটি করপোরেশনে এসবের বালাই নেই। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ফ্লাইওভার এলাকায় সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি দিয়ে ফ্লাইওভার কর্তৃপক্ষ দিনে দুবার পানি ছিটাচ্ছে। তবে সিটি কর্পোরেশন ধুলাদূষণ রোধে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে শহরের বেশির ভাগ সড়কে সকালে ঝাড়ু দেয়া হয়। ঢাকা শহরে মানুষ বেশি হওয়ায় ও গাড়ি চলাচল বেশি হওয়ায় দিনে একবারের বেশি ঝাড়ু দেয়া ও পানি ছিটানো সম্ভব হয় না। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সড়কে পানি ছিটানোর কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা।
ইত্তেফাক/নূহু
