২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পালনের দাবি করেছেন বিশিষ্ট জনেরা। পাশাপাশি তারা ১ ডিসেম্বরকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালন করারও দাবি জানান। গতকাল বুধবার বিকালে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ৯৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রমনাস্থ ইঞ্জিনিয়ার্স ইস্টিটিউশন সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের গণহত্যার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা ও আলোচনা সভায় বক্তারা এ দাবি করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে পর্যালোচনা এবং সে সময় সংঘটিত গণহত্যা ও নির্যাতন নিয়ে ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তারা।
বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানীর সভাপতিত্বে এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী শহিদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে শমী কায়সারের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। এছাড়া আলোচক হিসেবে বক্তৃতা করেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপ্রাপ্ত বৃটিশ সমাজকর্মী জুলিয়ান ফ্রান্সিস, ১৯৭১: গণহত্যা—নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, নর্থ আমেরিকান জুরিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের কানাডা চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি অ্যাটর্নি উইলিয়াম স্লোন এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আজকের জঙ্গি তত্পরতা, সন্ত্রাসী হামলা ও হলিআর্টিজানের মতো ঘটনা ঘটানোসহ সবকিছুর মূলে জিয়াউর রহমান। তোফায়েল আহমেদ বলেন, দেশে হাত ধোয়া দিবস পর্যন্ত আছে অথচ গণহত্যা দিবস নেই। বিষয়টি দুঃখজনক। তিনি বলেন, ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করে আন্তর্জাতিকভাবে এই স্বীকৃতি আদায় করতে হবে।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ হয়েছে। আরো কাজ হবে; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন যে গণহত্যা হয়েছে তা নিয়ে কাজ হয়নি। দেশের মানুষকে জানতে হবে ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাস কি ধরনের গণহত্যা ও নির্যাতন হয়েছিল। তিনি বলেন, গণহত্যা ও নির্যাতনকে সামনে আনার জন্য ইতিহাস জানতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনাতে ‘গণহত্যা ও নির্যাতন আর্কাইভ এবং জাদুঘর’ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ৭১-এর গণহত্যা সম্পর্কে শাহরিয়ার কবির সম্পাদিত ‘অন রিকগনিশন অব বাংলাদেশ জেনোসাইড’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী স্মারক বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এবং সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিসের পরিচালক মফিদুল হক বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ গণহত্যা হয়েছে। নয় মাসজুড়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা এই গণহত্যা চালিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর মামলায় আসামিপক্ষও এই গণহত্যা অস্বীকার করেনি।
বৃটিশ সমাজকর্মী জুলিয়ান ফ্রান্সিস বলেন, ‘১৯৭১ সালে শরণার্থীদের সংকট আমি নিজে দেখেছি। মনোরোগ চিকিত্সা দেওয়ার চেষ্টা করেছি তাদের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেমন গণহত্যা হয়েছে, বাংলাদেশেও যে ১৯৭১ সালে সেটা হয়েছে, তার অনেক সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে। তাই এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।’
নর্থ আমেরিকান জুরিস্ট অ্যাসোসিয়েশন কানাডা চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি আইনজীবী উইলিয়াম স্লোন বলেন, গণহত্যা, ধর্ষণ- এগুলো সবই আন্তর্জাতিক অপরাধ। কাজেই ১৯৭১ সালের গণহত্যাকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা উচিত। শহীদ সন্তান মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, ‘আমরা নিজেদের পরিবার থেকেই ১৯৭১-এর গণহত্যার কথা জানি। পরবর্তী সময়ে লেখাপড়া করতে এসেও সেটি দেখেছি। এই গণহত্যার স্বীকৃতি জরুরি।’
ইত্তেফাক/কাউছার
