‘ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস’ একজন ছাত্রনেতার জবানে ইতিহাসের আলেখ্য। ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধিৎসা, লেখকের নিজস্ব সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াস থেকে লেখক বইটি লিখতে ব্রতী হয়েছেন। বইটির সামগ্রিক পঠন পাঠককে অনুধাবন করাবে এসবের বাইরেও ইতিহাসের দিকে দৃকপাতের আলাদা কারণ রয়েছে ছাত্ররাজনীতির তরুণ এই সংগঠকের, সেটি হল লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতা।
এক যুগের বেশি সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে সাইফুর রহমান সোহাগ দেখেছেন, এখনকার ছাত্রসমাজ মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, পশ্চাৎপদতা, স্বাধীনতা বিরোধীদের যেসব অপপ্রয়াস মোকাবেলা করছে, শুধু রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই এদের পরাভূত করা সম্ভব নয়। এর সাথে সাথে প্রয়োজন জ্ঞানতাত্বিক লড়াইও। এই বইটি লেখকের সমাজ-প্রগতির আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয় বরং এর অপরিহার্য অংশ। বইটির নাম যেমন নির্দেশ করে ইতিহাস বিনির্মাণে ছাত্রলীগের স্বর্ণখচিত ভূমিকা, তেমনি এটি শুধু একটি সংগঠন মাত্রেরই ইতিহাস নয়, বরং লেখকের লেন্সে ধরা পরেছে সমগ্রের ইতিহাস, ঘটনার অলি-গলি-ঘুপচিও যা থেকে বাদ পড়েনি।
৪৮ থেকে ৭০ বাংলাদেশ ছিল ঝঞ্জামুখর, রক্তরঞ্জিত রাজপথে প্রকম্পিত হয়েছে মহাকালের স্লোগান। বাংলাদেশের যুবারা এ সময়টিতে শুধু তাদের হাজার বছরের বিপ্লবী পথে চরণ রেখে ইতিহাসের গতিধারাই বহন করে চলেনি, দুই দশকের কিছু বেশি সময়ের এই পর্ব ছিল ইতিহাস ভাঙার, ইতিহাস সৃজনেরও। আলোচ্য বইটি ১২ পর্বে বিভক্ত।
IMG0
‘সময়ের প্রয়োজনে ছাত্রলীগ’ শিরোনামের মাধ্যমে ছাত্রলীগের উত্থানের প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে। এতে রয়েছে পাকিস্তান নামের কৃত্রিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তরুণ-যুবাদের স্বপ্নভঙ্গের গল্প, ভাষা-সংস্কৃতির উপর পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিপতিদের পরিকল্পিত আঘাত, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের নামে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ জায়েজ করার অপপ্রয়াস। এবং অবশ্যই রয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি, চেতনায় শিকড়ের অনুরণন।
আর এসবের পেছনে রয়েছে এক মহান পুরুষ বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণা, তাঁর দিকদর্শন, দূরদর্শিতা, কর্মতৎপরতা, অপরিসীম ত্যাগ আর ভালোবাসা। সত্যিই ঘটনার বিবরণ পড়েই মনে হবে ১৯৭১ সালে ধ্বংসস্তূপের ভিতের উপর নতুন যে রাষ্ট্রের সৃজন হল, লাল-সবুজের সূর্যোদয় হল, বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন-সাধ বাস্তবে রূপায়িত হল; এসবের বীজ হিসেবে কাজ করেছে সেদিনের তরুণ মুজিবের ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছড়িয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে। লেখকের তুলির আঁচড়ে জীবন্ত হয়ে ধরা পড়েছে এ পটভূমি, আখ্যান আর উত্থানের গল্প। দ্বিতীয় পর্বে তাই রয়েছে বঙ্গবন্ধু এবং ছাত্রলীগের যুগলবন্দী পথ চলার প্রেক্ষাপট। তাঁদের সে যাত্রা লেখকের বয়ানে যার ফলাফল হল স্বাধীন বাংলাদেশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আওয়ামী লীগ, যুক্তফ্রন্ট এসব প্রতিষ্ঠান বাঙালি জাতির আশার বাতিঘর হয়ে দেখা দিয়েছে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে। লেখক ছাত্রলীগের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করেছেন ইতিহাসের দিক নির্ধারণকারী এসব প্রতিষ্ঠানের। আকর্ষণীয় ঢঙের বিবরণে প্রকাশ পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ছাত্রলীগের মিথস্ক্রিয়া, আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগের অচ্ছেদ্য ধারাবাহিক লড়াই সংগ্রাম, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কবর রচনাকারী যুক্তফ্রন্টকে জনগণের নিজস্ব ফ্রন্ট হিসেবে রূপায়ণে ছাত্রলীগের নেপথ্য ভূমিকা। ঘটনার পেছনের ঘটনাও ইতিহাসের অজস্র সরণি থেকে তুলে এনেছেন সাইফুর রহমান সোহাগ যা গ্রন্থটিকে গবেষণা ধর্মী পদবাচ্যে উত্তরণ ঘটিয়েছে। লেখক যৌক্তিকভাবেই আলাদা ভাবে বর্ণনা করেছেন ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর। পঞ্চম অধ্যায়ের শিরোনামে তাই রয়েছে ‘বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ে ছাত্রলীগ’। প্রাঞ্জল বর্ণনা, প্রামাণ্য তথ্যের সন্নিবেশ, আন্দোলনের পরিণতি-ফলাফল-প্রভাবের উপর আলোকপাত এ অধ্যায়টিকে সমৃদ্ধ করেছে। ভাষা আন্দোলনই যে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার, এ পর্ব পড়ে পাঠক সহজেই তা অনুধাবন করবেন। লেখকের ভাষায়, ‘রাজপথের আন্দোলন ঝিমিয়ে এলেও ২১ ফেব্রুয়ারির পর থেকে বাঙালি সমাজে দেখা যায় আর এক অদ্ভুত পরিবর্তন। আন্দোলনের ধরন ছিল অনেকটাই মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মত। ভাষা আন্দোলনের বাঙ্গালির সামনের সব বাধা ভেঙ্গে ফেলার শক্তি-সাহস যোগান দিল। এই ভাষা আন্দোলন পরিণত হল সামাজিক আন্দোলনে। ২১ ফেব্রুয়ারির আগের বাঙালি আর পরের বাঙালি যেন আলাদা হয়ে প্রকাশ পেল।’
ছাত্র সংগঠন হিসেবে পথ চলতে গিয়ে ছাত্রলীগ যেমন আদর্শে অবিচল, নিষ্ঠায় সুদৃঢ়, লক্ষে অদম্য ছিল বরাবর, সময়ের আঙ্গিকে নতুনত্বও এনেছে গড়নে। পূর্ব বাংলার অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তরের মাধ্যমে ছাত্রলীগ তাঁর প্রমাণ রেখেছে। লেখকের জবানে প্রমাণিত হয়েছে সময়ের কণ্ঠ কতবার ধ্বনিত হয়েছে ছাত্রলীগের সুরে সুরে। ১৯৫৩ সালে সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’ নামকরণের মাধ্যমে ছাত্রলীগের যে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ সেটিকে যথার্থ গুরুত্ব দিয়ে লেখক আলাদা পর্বে বিন্যস্ত করেছেন। এ ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই যে স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের দেখানো পথেই পরবর্তীতে নিজেদেরকে পরিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছিল। লেখক যৌক্তিকভাবেই চমৎকার পারদর্শিতায় এ যুগ-সন্ধিক্ষণের প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেছেন। ১৯৫৮ তে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে যখন সবাই দিকভ্রান্ত, কর্তব্য নির্ধারণে অপারগ ঠিক সে সময়ই বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণায় শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসনকে জবাব দিতে ইস্পাত দৃঢ় ঐক্যের শপথ নেয় ছাত্রসমাজ। ৬২ তে ঘটে তার বহিঃপ্রকাশ। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে বাঙ্গালির ম্যাগনাকার্টা ‘৬ দফা’ উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু। ৬ দফাই স্বাধীনতার পথে বাঙ্গালির চূড়ান্ত যাত্রা নিশ্চিত করে। এ আন্দোলনের গতিময়তা এমন ছিল যে গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনে ছাত্রসমাজ। ঘটনাপ্রবাহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, ছাত্রসমাজের প্রগতিশীল আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে, শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর ঐক্যের মাধ্যমে ছাত্রলীগ ১১ দফার আন্দোলন গড়ে তোলে। ৬ দফা ও ১১ দফা সুনিশ্চিত করে ৭০ এ আওয়ামী লীগ তথা পূর্ব বাংলার আপামর নিপীড়িত-বঞ্চিত জনতার বিজয়। লেখকের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় পাঠক শিহরণ অনুভব করবেন, ঘটনার সাথে একাত্ম হবেন, হয়তো নিজেকেও আবিষ্কার করবেন সে সময়ের ফ্রেমে, ইতিহাসের রাজপথে, যা থেকে তিনি অনুপ্রেরণা পাবেন আগামী দিনে তার লক্ষ্য নির্ধারণে, অনুভব করবেন মানবিক সংগ্রামে তার অংশীদারিত্ব। ‘যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ছাত্রলীগে’র মাধ্যমে লেখক আলোকপাত করেছেন ইতিহাসের এ কম আলোচিত পর্বে যার রয়েছে সীমাহীন প্রভাব বাঙালি জাতির গতিপথ নির্ধারণে।
বইটির বিশেষ সংযোজন হল ‘স্মৃতির পাতায় ছাত্রলীগ’। ২১১-২৪৬ পৃষ্ঠার ছবিগুলো ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলে ধরেছে। অনেক ঐতিহাসিক এসব ছবি নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।
চীনা প্রবাদ আছে, একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। ঐতিহাসিক এসব ছবির সংযোজনের মাধ্যমে ইতিহাসের প্রামাণ্য সময়ের এ গ্রন্থ পূর্ণাঙ্গতা পেয়েছে। বইয়ের শেষে লেখক বলেছেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগের ইতিহাসকে বাঙ্গালির ইতিহাস বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা গৌরবোজ্জ্বল এ সংগঠনের ইতিহাসকে অভিহিত করেছেন ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ হিসেবে। তাই অবধারিতভাবেই বলা চলে বাংলাদেশের ইতিহাস জানতে হলে ছাত্রলীগের ইতিহাসও জানতে হবে।’
বস্তুত: এ কথাগুলোর দ্যোতনা রয়েছে পুরো বই জুড়েই। জ্ঞানভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি বিনির্মাণের প্রয়াস হিসেবে লেখকের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে হয়। ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদেরই শুধু নয়, বাংলাদেশের ইতিহাস জানতে আগ্রহী সকলের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য। বইটির প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান শব্দশৈলী। প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। মূল্য ধরা হয়েছে ৪৭০ টাকা।
লেখক : আরিফুর রহমান লিমন, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
ইত্তেফাক/বারেক-কায়সার/রাফাত
