রাজনৈতিক আধিপত্য নিরঙ্কুশ করতেই লিটনকে হত্যা

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১০:০৬
 
এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের জাতীয় পার্টির (এরশাদ) সাবেক এমপি লে. কর্নেল (অব.) ডা. আব্দুল কাদের খান। এজন্য তিনি সাত লাখ টাকায় তিন খুনিকে ভাড়া করেন। আধিপত্য নিরঙ্কুশ করতেই এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী যাতে না থাকে সে জন্যই এ হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
 
এমপি লিটন হত্যা মামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে গ্রেফতার ডা. আব্দুল কাদের খান গতকাল শনিবার ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দিতে এসব স্বীকার করেছেন। গাইবান্ধা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক জয়নুল ?আবেদিন এই জবানবন্দি গ্রহণ করছেন।
 
এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যার পর তিনি টার্গেট করেছিলেন ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারিকে। এই দুইজনকে সরিয়ে দিতে পারলে ভবিষ্যতে আর রাজনীতির পথে কোন বাধাই থাকবে না। তবে তার আগেই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন আব্দুর কাদের খান।
 
লিটনকে হত্যার জন্য কাদের খান ৭ লাখ টাকায় তিন খুনি ভাড়া করেন। এই খুনিরা আবার তার সহযোগী। এদের মধ্যে মেহেদী ও শাহীন গ্রেফতার হয়েছে। গত মঙ্গলবার এরা দু’জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। আরেক খুনি রানা পলাতক ছিল। গত বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানীর ভাটারা থেকে গাইবান্ধার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। ওই দিনই সে আদালতে লিটন হত্যায় নিজেকে জড়িয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। 
 
স্বীকারোক্তিতে তারা খুনের আদ্যোপান্ত বর্ণনা করেছে। এমনকি সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শামীমকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কেও বর্ণনা দিয়েছে খুনিরা। এই খুনিদের সহযোগিতা করেন কাদের খানের গাড়িচালক আবদুল হান্নান।
 
তদন্তকারীরা বলছেন, খুনিদের সঙ্গে কাদের খানের টেলিফোনে কথোপোকথনের অডিও রেকর্ডও আছে পুলিশের হাতে। এছাড়া মোবাইল ফোনের কললিষ্টসহ বিভিন্ন ধরনের আলামতও আছে। পুলিশ খুনিদের ব্যবহার করা অস্ত্র, গুলি ও মটরসাইকেল উদ্ধার করেছে। এই হত্যাকান্ডে আব্দুল কাদের খানের সম্পৃক্ততার পুরো আলামত এখন পুলিশের হাতে। হত্যা পরিকল্পনার সব কিছুই আদালতে স্বীকার করেছেন ডা. কাদের খান। 
 
আদালতে কাদের খান জানিয়েছেন, নানা কারণেই লিটনের উপর বিরক্ত ছিলেন তিনি। ২০০৮ সালে মহাজোট থেকে নির্বাচন করে এমপি হয়েছিলেন কাদের খান। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন লিটন। তিনি নির্বাচিত হয়েই কাদের খানের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেন। এ নিয়ে তিনি এমপি লিটনের উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন।
 
গাইবান্ধা প্রতিনিধি তাজুল ইসলাম রেজা জানান, সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান জানান, ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডে থাকা কর্নেল (অব:) কাদের খান পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় এমপি লিটন হত্যাকান্ডের ঘটনা স্বীকার করে তার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে ঘটনায় নিজেকে জড়িয়ে আদ্যোপান্ত বিবরণ প্রদান করেছেন। এছাড়া আদালতে ১৬৪ ধারায় ওই হত্যা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করতে সম্মত হন। তিন খুনির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ডা. কাদের খানের নাম আসায় গত ২১ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার বাসা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরদিন এই হত্যাকান্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডা. কাদের খানের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
 
তিনি আরো জানান, এদিকে গত বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে কাদের খাঁনের সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ছাপরহাটি (খাঁনবাড়ী) গ্রামের বাড়ি উঠানে মাটি খুড়ে ৬টি গুলিভর্তি ম্যাগাজিনসহ একটি পিস্তল ও একটি ফাকা ম্যাগাজিন উদ্ধার ঘটনায় শনিবার থানায় অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমপি লিটন হত্যা ঘটনার মামলার বাদী পরিদর্শক আবু হায়দার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বাদী হয়ে সুন্দরগঞ্জ থানায় এ মামলা দায়ের করেন।
 
প্রসঙ্গত, গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সুন্দরগঞ্জের নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে আশংকাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে রাত সাড়ে ৭টায় চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় লিটনের বোন তাহমিদা বুলবুল বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৪-৫ জনকে আসামি করে ১ ডিসেম্বর সুন্দরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
 
নব্য জেএমবি নামে প্রতিমা ভাঙ্গচুরের তদন্ত শুরু :
 
সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান জানান, সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় গত বছরের অক্টোবরে নব্য জেএমবির নামে একাধিক মন্দির পুড়ে দেওয়া ও প্রতিমা ভাঙ্গচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা কাদের খানের নির্দেশ এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সংঘটিত হয়েছে কীনা তাও তদন্ত করা হচ্ছে।
 
তিনি আরো জানান, সর্বশেষ ৯ অক্টোবর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুরের কামারপাড়া সড়ক সংলগ্ন কালিমন্দিরে রতি কালি প্রতিমা ভাঙ্গচুর করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ এ অভিযোগে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটি ইউনিয়নের মন্ডলেরহাট থেকে সেসময় কথিত চার নব্য জেএমবি সদস্যকে গ্রেফতার করে।
 
সুন্দরগঞ্জ জেএমবি প্রভাবিত এলাকা তা প্রমাণ করতেই কাদের খান সুপরিকল্পিতভাবে তার নিজের ভাতিজা ফয়সাল খান ফাগুনসহ নিজস্ব কাজের লোকদের ব্যবহার করে বলে প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে। মন্দিরের ভাঙ্গচুরের সম্পৃক্ততার সঙ্গে গ্রেফতারকৃত আসামিরা বর্তমানে জামিনে আছেন এবং ইতোমধ্যে ওই মামলাগুলোর চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।