নিম্ন আদালতের বিচারক নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি সংক্রান্ত সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদ কেন অসাংবিধানিক নয়- এই মর্মে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, স্পিকার ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর ডিভিশন বেঞ্চ রবিবার এই আদেশ দেন।
প্রসঙ্গত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার বিষয়ে বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ রয়েছে, “বিচার কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।”
১১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “বিচার বিভাগীয় পদে বা বিচার বিভাগীয় দায়িত্বপালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক উক্ত উদ্দেশে প্রণীত বিধিসূমহ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিয়োগদান করিবেন।” সংবিধানের এই দুটি অনুচ্ছেদসহ ৫টি অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে গত ৩ নভেম্বর রিট করেন ইউনূস আলী আকন্দ। আবেদনের পক্ষে আবেদনকারী নিজেই এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস শুনানি করেন।
শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট বিচার বিভাগের দ্বৈত শাসন সংক্রান্ত ওই দুটি অনুচ্ছেদসহ ৯৫(২)(খ) ও ৯৮ অনুচ্ছেদ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে। এছাড়া রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সকল কাজেই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের বিধান সংক্রান্ত সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রশ্নে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। রুলে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক ও অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ কেন সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন: তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোন পরামর্শদান করিয়াছেন কিনা এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।”
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়। প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যই এ রিট করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান চালিয়ে নেওয়াটাই বড় কথা। বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তাতে বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত আছে বলে মনে করি। তিনি বলেন, আইন তৈরি করার ক্ষমতা শুধুমাত্র জাতীয় সংসদের। অন্য কেউ আইন করতে পারে না। তবে আইন যদি সংবিধান পরিপন্থী হয় তবে আদালত তা বাতিল করতে পারেন।
ইউনুস আলী আকন্দ বলেন, এই ধারাগুলো বাহাত্তরের সংবিধানে এভাবে ছিল না। পরে দুই দফায় সংশোধন করে বর্তমান ধারাগুলো যুক্ত করা হয়েছে যা, সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, দেড় মাস ধরে শুনানির পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখতে আদালত রুল জারি করেছে।
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৩১ অক্টোবর এক বাণীতে প্রধান বিচারপতি ১১৬ অনুচ্ছেদকে বিচার বিভাগের ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। ওই বাণীতে প্রধান বিচারপতি বলেন, “দ্বৈত শাসনের ফলে বহু জেলায় শূন্য পদে সময়মত বিচারক নিয়োগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বিচার কাজে বিঘ্ন ঘটে এবং বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি বেড়ে যায়। উল্লেখিত প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদটি পুন:প্রবর্তন হওয়া সময়ের দাবি। যাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কমস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরীসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত থাকবে। উক্ত বিধানটি পুন:প্রবর্তন করলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরো সমুন্নত ও সংহত হবে এবং বিচার বিভাগের সার্বিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হবে। প্রধান বিচারপতির এই বাণী রিট আবেদনেও যুক্ত করা হয়।
রিটে বলা হয়, বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল সুপ্রিম কোর্টের হাতে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীতে সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে ওই ক্ষমতা দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতির কাছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইত্তেফাক/রাফাত/মাহমুুদুল
