রাজধানীর পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক পণ্যের গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে খোদ বাসা-বাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ২০০ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এদিকে পুরান ঢাকার চার শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম উচ্ছেদের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ এই উচ্ছেদ অভিযানে একযোগে মাঠে নামবে ৫টি সংস্থা। অভিযান শুরু হবে আগামী ১ মার্চ।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক ভবনের নিচতলার পার্কিং স্পেস ব্যবহূত হচ্ছে রাসায়নিক গুদাম হিসেবে। কিছু বাড়িতে রাসায়নিক পণ্যের কারখানাও আছে। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক গুদামের অগ্নিকাণ্ডে ১২৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এছাড়া দগ্ধ হয়েছে আরো শতাধিক মানুষ। এ ঘটনার পর নিমতলী থেকে কিছু গুদাম ও কারখানা সরানো হলেও পুরান ঢাকার অন্য এলাকা থেকে খুব বেশি সরেনি।
পুরান ঢাকার এসব গুদামে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইলসহ ভয়ংকর রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ। এসব রাসায়নিক সামান্য আগুনের স্পর্শ পেলেই ঘটতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ফলে পুরান ঢাকার মানুষ মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন। গত কয়েক বছরে রাসায়নিক সংশ্লিষ্ট কারণে রাজধানীতে যতগুলো অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তার সব কটিই ঘটেছে পুরান ঢাকায়। সর্বশেষ গত শনিবার রাজধানীর ইসলামবাগে একটি প্লাস্টিকের গুদামে অগ্নিকাণ্ডে তিনজন পুড়ে মারা গেছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, নিমতলীর অগ্নিকাণ্ড স্মরণকালের ভয়াবহতম ঘটনা। এই ঘটনার পরেও পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডজনিত প্রাণহানির ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিদিন সেখানকার কোন না কোন রাসায়নিক কারখানা ও গুদামে কর্মরত শ্রমিকরা দগ্ধ হয়ে বান ইউনিটে আসেন। এদের মধ্যে প্রতিদিন একাধিক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, নিরাপদ নগরী গড়ে তুলতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এ লক্ষেই পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা বিপজ্জনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। নিমতলীর ঘটনার পর সরকার এসব গুদাম সরিয়ে ফেলার নিদের্শ দিলেও বেশিরভাগ ব্যবসায়ীই তা মানেনি। এবার অপসারণ অভিযানে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মৃধা বেনু বলেন, আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়ার দাবি আমাদের দীর্ঘদিনের। আমরা চাই দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এবারের উদ্যোগ সফল হোক।
পুরান ঢাকার নিমতলী, বংশাল, আগা সাদেক লেন, আলাউদ্দিন রোড, চকবাজার, লালবাগসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বহুতল ভবনের গাড়ি পার্কিং স্পেস বা নিচতলায় রাসায়নিক গুদাম রয়েছে। এসব ভবনের অন্যান্য ফ্লোরে পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকছেন মধ্যবিত্তরা। এদের অনেকেই ছোট চাকরি অথবা ব্যবসা করেন। এছাড়া ছোট-বড় কোম্পানির অফিস হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে কিছু ফ্লোর। একাধিক ভবনে উপরের বিভিন্ন ফ্লোরে প্লাস্টিকের কারখানা দেখা গেছে।
জানা গেছে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা পুরান ঢাকার আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, ইসলামপুরসহ আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে আবাসিক ভবনে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ চার শতাধিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত করেছে। এসব গুদাম ও কারখানার অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই।
গত ১৯ জানুয়ারি থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২৪ জন সদস্য ৪টি ইউনিটে ভাগ হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অনুসন্ধান করে এ তালিকা তৈরি করেছে।
আগা সাদেক রোডের বাসিন্দা শরিফুল আনোয়ার বলেন, লাইসেন্স না থাকলেও কেমিক্যাল গোডাউনের মালিকরা ব্যবসা করছে। আতঙ্ক নিয়ে আমরা দিন কাটাই। এটা থেকে আমরা মুক্তি চাই। মেয়র সাহেব আমাদের আতঙ্ক থেকে মুক্তি দেবেন- এই আশাই করছি।
ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ডিডি-অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, কেমিক্যাল গোডাউনের ৯৮ ভাগই অবৈধ। মাত্র দুই ভাগ গোডাউনের অনুমোদন রয়েছে। সেসব গোডাউন রয়েছে বুড়িগঙ্গার ওপারে। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস চাইলেও এসব গোডাউন উচ্ছেদ করতে পারে না। উচ্ছেদ করতে হলে পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও বিস্ফোরক পরিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহায়তা প্রয়োজন।
বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে পুরান ঢাকায় নতুন করে কোনো কেমিক্যাল গোডাউনের লাইন্সেস দেওয়া হচ্ছে না। পুরনো লাইন্সেসও নবায়ন করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, অনেক কেমিক্যাল ব্যবসায়ী কেরানীগঞ্জের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় গোডাউন তৈরি করেছেন। বাকি যেসব ব্যবসায়ী এখনও পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় আছেন, তাদের সরিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ইত্তেফাক/নূহু
