হাজারীবাগে থাকতে পারবে না কোন ট্যানারি কারখানা

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৭, ১১:৩৫
 
হাজারীবাগে আর কোন ট্যানারি কারখানা থাকতে পারছে না। ট্যানারিগুলোর কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেয়া আদেশ বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে ট্যানারি কারখানা গুলোর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্নের আদেশও বহাল রেখেছে আদালত।
 
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের তিন বিচারপতির বেঞ্চ আজ রবিবার এ আদেশ দেন।
 
গত ৬ মার্চ হাইকোর্ট ট্যানারিগুলো বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে আবেদন করে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন ফিনিশড লেদার গুডস অ্যান্ড এক্সপোর্টার এসোসিয়েশন। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস।
 
এর আগে হাইকোর্টের দেয়া এক রায়ে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরে ব্যর্থ হওয়া সকল ট্যানারির কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়। একইসঙ্গে বিচ্ছিন্ন করতে বলা হয় ট্যানারিগুলোর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। আদালতের এই আদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৪(৩)ও ৪(ক) ধারা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয়া হয়। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদফতরকে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দেয় আদালত।
 
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. সেলিমের ডিভিশন বেঞ্চ ৫ মার্চ সোমবার এই আদেশ দেন। আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী ৬ এপ্রিল হাইকোর্টে দাখিল করতে বলা হয়েছে। আদালত বলেছে, সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই প্রেক্ষিতে গত ৩১ জানুয়ারির পর হাজারীবাগে কাচা চামড়া ঢুকতে না দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে শিল্প মন্ত্রণালয়। এই সিদ্ধান্ত নেয়া এবং হাইকোর্টের ইতঃপূর্বের দেয়া রায়ের আলোকে হাজারীবাগে দূষণকারী ট্যানারি পরিচালনার কোন সুযোগ নেই।
 
আদেশ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) মো. আলমগীর ইত্তেফাককে বলেন, হাইকোর্টের আদেশের অনুলিপি পাওয়ার পরই ট্যানারি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
 
বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৬ সালে ৯০৩টি শিল্প কারখানাকে পরিবেশ দূষণকারী হিসাবে চিহ্নিত করে। এর মধ্যে হাজারীবাগের চামড়া শিল্পগুলো ছিল অন্যতম। শিল্প কারখানার পরিবেশ দূষণরোধে নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে ১৯৯৪ সালে রিট করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০০১ সালে ‘লাল’ শ্রেণীভুক্ত সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানকে এক বছরের মধ্যে পরিবেশ দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেয়। আদালতের এ আদেশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় বেলা প্রয়োজনীয় নির্দেশ চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন দাখিল করে।
 
বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি মো: মমতাজ উদ্দিন আহমেদের ডিভিশন ২০০৯ সালের ২৩ জুন এক আদেশ দেন। ওই আদেশে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে হাজারীবাগে অবস্থিত সকল ট্যানারি স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি স্থানান্তরে ব্যর্থ হলে পরিবেশ অধিদপ্তরকে ট্যানারি কারখানাগুলো বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের জন্য দফায় দফায় আদালতে সময়সীমা বৃদ্ধির আবেদন করেন। ২০১০ সালের ৩০ অক্টোবর ছয় মাসের জন্য হাইকোর্ট সময় বর্ধিত করে। পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রণালয় আরো ২ বার অর্থাৎ গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের নির্মাণ সময় বাড়ানোর আবেদন করলেও আদালত সময় বাড়ানোর কোন নির্দেশ দেয়নি।
 
সর্বশেষ শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব একতরফা ভাবে আদালতের অনুমতি ছাড়া হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের সময়সীমা চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ৩ জানুয়ারি হাইকোর্টে আবেদন করে বেলা। ওই আবেদনে শিল্প সচিবের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণার পাশাপাশি হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৪(৩) ও ৪(ক) ধারা অনুসরণ করে পরিবেশ অধিদপ্তরকে হাজারীবাগের ট্যানারি বন্ধের নির্দেশনা প্রদানের আবেদন জানানো হয়। গতকাল ওই আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
 
শুনানিতে বেলার পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল বলেন, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরে ২০১০ সালের অক্টোবরে ছয় মাস সময় বৃদ্ধি করেছিলো হাইকোর্ট। এরপর আর কোন সময় বাড়ায়নি আদালত। কিন্তু এরপরেও বারবার আদালতের রায় লঙ্ঘন করে হাজারীবাগে ট্যানারিগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তিনি বলেন, ৪৩টি ট্যানারি ইতোমধ্যে সাভারে গিয়েছে। এসব ট্যানারি যদি সেখানে যেতে পারে তাহলে বাকিগুলো কেন যেতে পারবে না? এ পর্যায়ে আদালত বলেন, সময় এসেছে এ ব্যাপারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণের।
 
শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষে অ্যাডভোকেট রইস উদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার সাভারে ট্যানারি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। গত ৩১ জানুয়ারির পর কোন কাচা চামড়া হাজারীবাগে যাতে ঢুকতে দেয়া না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এর পরেও হাজারীবাগে ট্যানারি শিল্প কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে ৪৩টি ট্যানারি স্থানান্তরিত হয়েছে। এখনো ১১২ টি ট্যানারি সাভারে যায়নি। সকল ট্যানারি না যাওয়ার কারণে পর্যাপ্ত বর্জ্য না হওয়ার কারণে এটি চালু করা যাচ্ছে না। কিন্তু এই শোধনাগার চালু করতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব ট্যানারি সাভারে যায়নি তারা আদালতের আদেশে দৈনিক দশ হাজার টাকা করে জরিমানা গুনছে। আদালত বলেন, ট্যানারি কারণে বুড়িগঙ্গার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। শুনানি শেষে হাইকোর্ট উপরোক্ত আদেশ দেয়। আদেশে হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া প্রবেশ বন্ধে সরকারের বিভিন্ন অধিদপ্তরের কাছ থেকে কেমন সহযোগিতা পাচ্ছে, সে বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়কে আরেকটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
 
আদেশের পর বেলার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, অবিলম্বে অর্থাৎ একদিনও কালক্ষেপণ না করে ট্যানারি কারখানা বন্ধের পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরাতে আদালত একটা সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার আদালতের অনুমতি ছাড়া নিজেই সময়সীমা বাড়িয়েছে। সরকারের এই সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আইন বহির্ভূত। কারণ আদালত যেখানে একটা সময়সীমা বলে দেন, সেখানে সরকার একতরফাভাবে সময়সীমা বাড়াতে পারে না।