সুলতানা বিবি ১৪ ভাই বোনের অভাবের সংসারে জন্মগ্রহণ করার কারণে তিনি খুব অল্প বয়স থেকেই চুড়ি বিক্রি করা শুরু করেন। তিনি দীর্ঘ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে রাস্তায় রাস্তায় চুড়ি বিক্রি করে চলেছেন। তার স্বামীর রিকশা চালানো টাকা আর তার চুড়ি বিক্রি করার টাকা দিয়েই তাদের সংসার চালান এবং তার ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা করান। চুড়ি বিক্রি করা অনেক বড় নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এখন চুড়ি বিক্রি করার মাঝেই মজা খুঁজে বেড়ান। অন্য কোনো কাজে গেলে মন বসে না তার। এভাবেই রাস্তায় রাস্তায় চুড়ি বিক্রি করে আসছেন সুলতানা বিবি।
সকাল ১০টার সময় শাহবাগের রাস্তার ধারে এসে বসি। রাত ১০টা পর্যন্ত বিক্রি করি। আমরা নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় বসে চুড়ি বিক্রি করতে পারি না। পুলিশ এসে উঠিয়ে দিলে অন্য কোনো জায়গায় গিয়ে আবার বসি। এভাবেই সারাদিন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গাতে উঠার কারণে ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারি না। আমাদের বিকাল থেকে ভালো বিক্রি হওয়া শুরু হয় কিন্তু ওই মুহূর্তে পুলিশ এসে আমাদের উঠিয়ে দেওয়ার কারণে বিক্রি কমে যায়। আমাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা যদি থাকতো তাহলে আমরা ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারতাম। এছাড়া সব চুড়ি সব সময় বিক্রি হয় না। যেগুলো বিক্রি হয় না সেগুলো আমাদের ফেলে দিতে হয়। এ কারণে আমাদের অনেক কষ্ট করে ব্যবসা করতে হয়।
আমি প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে পনেরশত টাকার চুড়ি বিক্রি করি। এখান থেকে আমার তিন থেকে চারশত টাকা লাভ হয়। এই টাকা থেকে সংসার ও ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ বের করতে হয়। চক বাজার থেকে ইন্ডিয়ান চুড়ি পাইকারি ভাবে কিনে নিয়ে আসি। ইন্ডিয়ান চুড়ির কদর অনেক বেশি। কারণ এগুলোর সহজে রঙ উঠে না। আমার এখানে ত্রিশ টাকা থেকে একশত টাকা দামের পর্যন্ত চুড়ি রয়েছে। এখানে সবচেয়ে বেশি রেশমি চুড়ি বিক্রি হয়। কারণ রেশমি চুড়ি হাতে দিলে দেখতে অনেক সুন্দর লাগে। অল্প বয়সের তরুণীরা সবচেয়ে বেশি চুড়ি কিনে। তারা বন্ধু-বান্ধবীরা প্রায় একসাথে আসে চুড়ি কিনতে। এছাড়া ভালোবাসার মানুষের এই রেশমি চুড়ির প্রতি টান অনেক বেশি দেখা যায়। তাছাড়া বিশেষ বিশেষ দিনে আমাদের বিক্রি বেশি হয়। যেমন ধরেন, পহেলা বৈশাখ, ১৪ ফেব্রুয়ারি, পহেলা ফাল্গুন, ২১ ফেব্রুয়ারি এবং বই মেলায় পুরো মাসটি ভালো বিক্রি হয়।
আমি অনেক বড় স্বপ্ন দেখি, আমার ছেলে মেয়েরা ভালোভাবে লেখাপড়া করে মানুষের মত মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক। তারা যেন আমার মতো এভাবে রাস্তায় রাস্তায় কষ্ট না করে বেড়ায়। তারা তাদের জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে পারে। আমি আমার ছেলে মেয়েদেরকে নিয়ে চিন্তায় থাকি। আমার সন্তানেরা যেন কোনো প্রকার নেশার সাথে জড়িয়ে না পড়ে। কারণ আমি বাইরে বাইরে থাকি টাকা উপার্জনের জন্য। কিন্তু আমার ছেলে মেয়েরা একা একা বাড়িতে থাকে। সেখান থেকে যদি কোনো খারাপ পথে চলে যায়, এজন্য আমি সবসময় তাদের বুঝিয়ে রাখি। আমার তাদের কাছে আশা তারা যেন শেষ বয়সে আমার এবং স্বামীকে দুটো ডাল ভাত খেতে দেয়। তাদের যদি সামর্থ্য থাকে তাহলে গরিবদেরকে যেন সাহায্য করে।
