মুক্তিসংগ্রাম ও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৭, ০৮:৩১
 
বাংলাদেশে আজ মুক্তিসংগ্রামের জোয়ার জেগেছে। শোষণ, অত্যাচার ও বঞ্চনার অচলায়তনকে নিশ্চিহ্ন করে অর্থনৈতিক; রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি লাভ করার দৃপ্ত শপথে এ দেশের আকাশ বাতাস প্রকম্পিত। জনতার বিপ্লবী চেতনার অগ্নিশিখা দাবানলের মতো রাজপথে, জনপথে শহর-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। জনতার দুর্বার গতিপথে যেখানেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে সেখানেই সংগ্রামী আত্মবিসর্জনের বিস্ফোরণ হচ্ছে, চুরমার করে দিচ্ছে বাধাবিঘ্নের সমস্ত পাহাড়কে।
 
প্রাণ দেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, প্রাণ নেওয়ার শপথ বজ্রকঠিন হয়েছে। জাগ্রত ছাত্রশ্রমিক জনতা, সরল কৃষক মাঝিমাল্লা, অবুঝ শিশু-কিশোর-কিশোরীরা, অন্তপুরের মহিলারা, শহুরে সরকারি কর্মচারী, বুদ্ধিজীবীরা, সঙ্গীত চলচ্চিত্রের বিক্ষুব্ধ শিল্পীরা এবং অগণিত মুটে মজুর মেহনতি মানুষেরা এ মুক্তি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঝঁঞ্ঝার মতো, প্রলয়ের মতো, ঝাঁপিয়ে পড়েছে বীরের মতো। কণ্ঠে তাদের অগ্নুত্পাতের মতো জ্বালাময় রোষ, লাল টকটকে অক্ষি গোলকে সূর্যের মতো বিক্ষোভ, বদ্ধ মুষ্ঠিতে পাথরের মতো অটল শপথ।
 
জনতার মিছিল, অস্ত্রের মিছিল, লাঠির মিছিল, নৌকার মিছিল, ট্রাকের মিছিল, লালটুপির মিছিল, গণমুক্তি বাহিনীর পতাকার মিছিল, প্রাক্তন সৈনিকের মিছিল, এক কথায় সারা দেশে আজ মিছিল যেন। মুক্তিপাগল জনতা আজ মুক্তি চায়। সাগর তরঙ্গের মতো জনতার মিছিল আজ বাংলাদেশের বঞ্চিত বুকে উদ্দাম কলরোলে তরঙ্গিত হয়েছে। বাংলার মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক অগ্রগতির শুভসূচনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক পালাবদলের ক্রান্তিলগ্নে সম্মুখীন। মুক্তি সংগ্রামের এহেন বিপ্লবী পরিস্থিতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কী হতে পারে? তাদের কি জনতার থেকে পৃথক কোনো ভূমিকা থাকতে পারে?
 
বুদ্ধিজীবীরা ব্যাপক জনগণের একটি অবিচ্ছিন্ন অংশ। এ সত্যটি তাদের উপলব্ধি করা উচিত। যে কোনো জাতীয় সংগ্রামে জনগণের যে ভূমিকা তাদেরও সে ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত। জনগণের মুরব্বি সেজে নিরাপদ অবস্থান থেকে আদেশ উপদেশ ও নির্দেশ দেওয়ার কোনো অধিকার তাদের নেই। শ্রমিক যদি কলকারখানার কাজে নিযুক্ত থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে পারে, কৃষক যদি উত্পাদন কর্মে রত থেকে সংগ্রামের অংশীদার হতে পারে, ছাত্ররা যদি অধ্যয়নে নিবিষ্ট থেকেও আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করতে পারে, তবে বুদ্ধিজীবীরা কেন আদেশ উপদেশ নির্দেশ ও দাবি জানিয়ে আহ্বান দিয়েই তাদের কর্তব্য সমাপন করেন। যারা মনে করেন কবিতা লিখে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা কবির কাজ, গল্প উপন্যাস লিখে আন্দোলনের ছবি তুলে ধরাই কথাসাহিত্যিকের কাজ কিংবা প্রবন্ধ লিখে উপদেশ দিয়েই প্রাবন্ধিকের কাজ সমাপ্ত। তাদের সঙ্গে আমরা একমত নই।
 
গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধে আন্দোলনের কথা বলা, সংগ্রামের ছবি আঁকা বিপ্লবের প্রেরণা দেওয়া তাদের পেশাগত কাজ। আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিপ্লব কারো পেশাগত কাজ নয়। এটা জাতীয় কাজ, ব্যাপক জনগণের মুক্তি সাধনার কাজ, কোনো দলগত বা গোষ্ঠীগত কাজ নয়। এ কথা যদি সত্য হয় তবে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে বুদ্ধিজীবী বা শিল্পী সাহিত্যিকের আলাদা কোনো ভূমিকা নেই। থাকতে পারে না, থাকা উচিত নয়। (সংক্ষেপিত)
 
‘মুক্তিসংগ্রাম ও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা’ লেখাটি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ রাতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে, আজিমপুরে, চীনা বিল্ডিংয়ের ১০ নম্বর ফ্ল্যাটে, পঁচিশে মার্চের এক রাত আগে। ১৯৮১ সালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা ‘সরসী’তে লেখাটি প্রথম আলোর মুখ দেখে।
 
লেখক: ভাষাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ